দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হচ্ছে অজুহাতের দেশ। কত রকম অজুহাত যে শুনতে পাওয়া যায় তার ইয়ত্তা নেই। যুদ্ধ, শীত, মহামারী, ডলার সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানুষের আয় বেড়ে যাওয়া, ইউরোপের বাসিন্দা হওয়া, মানুষের খাওয়া বেড়ে যাওয়া, রমজান, ঈদ সব অজুহাত আছে। শুধু বলা যাবে না, কর্র্তৃপক্ষের ব্যর্থতা এবং মুনাফা শিকারিদের কথা। বাজারে কোন জিনিসের দাম কম, এটি একটি উত্তরবিহীন প্রশ্ন। তবে অনেকে সাহস করে উত্তরে বলেন, কেন মন্ত্রীদের কথার দাম আর মানুষের জীবনের দাম! নির্বাচন নিয়ে যত কথাই থাক সরকার বলছে, দ্রব্যমূল্য তাদের প্রধান বিবেচ্য। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব নেই। আটা-ময়দা, ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য উচ্চমূল্যে স্থির হয়ে আছে। মাছ, মাংস ও ডিমের দামও বেশ চড়া। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২১০ টাকায়। সোনালি মুরগির কেজি ৩১০-৩৩০ টাকা। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৬৫০-৭০০ টাকা কেজি। ডিমের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় ডজনে ৫ টাকা বেড়েছে। ফার্মের মুরগির বাদামি রঙের ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৩৫ টাকায়। চাষের তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ২২০-২৫০ টাকায়। চাষের রুই মাছের কেজি পড়ছে ৩০০-৪০০ টাকা। মাছের আকার যত বড়, দাম হাঁকছে তত বেশি।
চালের বাজারে সারা বছর তো অস্থিরতা ছিলই, এই মৌসুমেও তা কমছে না। চাল বাংলাদেশের জনগণের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্য। চালের দাম বাড়লে মানুষের জীবনে বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়। চালের দামের ঊর্ধ্বগতি একেবারেই অপ্রত্যাশিত, বিশেষ করে যখন আমন ধান চলে এসেছে। ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকারি খাদ্য মজুদ ছিল প্রায় ১৬ লাখ টন। তার মধ্যে চালের পরিমাণ প্রায় ১৩ লাখ টন। এই মজুদ যে কোনো বিবেচনায়ই তো সন্তোষজনক বলে ধরা হয়।
এ অর্থবছরে সরকারি ও বেসরকারি হিসাবে আমদানি করা চালের পরিমাণ সাড়ে ৫ লাখ টন এবং গমের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ টন। সব মিলিয়ে ১৪ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ডিসেম্বর পর্যন্ত আমন মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার ৯৭২ টন চাল এবং ১০ টন ধান আমদানি হয়েছে। চালের আকারে তা দাঁড়াবে ৩ হাজার ৯৭৮ টনের মতো। বলা হচ্ছে, বেসরকারি উদ্যোগে আনা আরও ৯১ হাজার ৩১০ টন চাল বন্দরে অপেক্ষমাণ। আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম প্রতি টন সিদ্ধ ৩৭৫ থেকে ৪৩৪ ডলার। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত ও পাকিস্তানকে বিবেচনায় নিয়ে এই দাম নির্ধারিত হয়। তাহলে মজুদ, আমদানি সম্ভাবনা এবং মার্চ নাগাদ বোরো উঠবে, এই বিবেচনায় চালের দাম বৃদ্ধি ও বাজার অস্থির থাকার কোনো যৌক্তিকতা আছে কি? যুক্তি না থাকলেও মুনাফার চক্কর আছে। কারণ চালের প্রক্রিয়াজাতকরণে আছে বড় বড় চালকল মালিক। গবেষণায় উঠে এসেছে, এই চালকল মালিকরা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ চাল নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন দেশে প্রয়োজন পড়ে ৮ কোটি কেজি চাল। এর মধ্যে বাজারে কেনাবেচা হয় কমপক্ষে ৫ কোটি কেজি। প্রতি কেজিতে ৫ টাকা কারসাজি হলে দৈনিক ২৫ কোটি, মাসে ৭৫০ কোটি আর বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা মুনাফার কারবার। বিষয়টি তাই ছোটও নয়, সহজও নয়।
শীতকালীন সবজি মাথার ঘাম ঝরিয়ে দিচ্ছে স্বল্প আয়ের বিপুল সংখ্যক মানুষের। ঢাকার শান্তিনগর, হাতিরপুল ও কারওয়ান বাজারে শিমের কেজি ৮০ থেকে ১০০, পাকা টমেটো ৮০ থেকে ১০০, বেগুন ৭০ থেকে ৮০, মুলা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত বছরের এ সময় প্রতি কেজি শিম ২০ থেকে ৫০, টমেটো ৪০ থেকে ৪৫ এবং বেগুন ২৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি ফুলকপি ২০ থেকে ২৫ এবং বাঁধাকপি ২৫ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ চার গুণ বেড়েছে শিমের দাম। বেগুনের ক্ষেত্রে বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি শিমের উৎপাদন খরচ ৬ টাকা ৮৮ পয়সা, টমেটো ৯ টাকা ৬৯ পয়সা, বেগুন ১০ টাকা ২৬ পয়সা এবং প্রতিটি ফুলকপি ও বাঁধাকপির উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ টাকা। শিমের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ ৭ টাকার সঙ্গে পরিবহন, রাস্তায় বিভিন্ন স্থানে চাঁদা, আড়তের কমিশনসহ কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা খরচ হয়। সর্বোচ্চ ৬ টাকা খরচ যোগ করলে কেজিতে মূল খরচ দাঁড়ায় ১৩ টাকা। সরকারের কি ভূমিকা নেই? নিশ্চয়ই আছে। ‘কৃষি বিপণন বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী, সব ধরনের শাকসবজি উৎপাদক পর্যায়ে ৪০ শতাংশ, পাইকারিতে ২৫ শতাংশ ও খুচরায় ৩০ শতাংশ লাভ করা যাবে। তিন স্তরে দামের ওপর এই হারে মুনাফা যোগ করলে খুচরা পর্যায়ে আসতে প্রতি কেজি শিমের সর্বোচ্চ দর হওয়ার কথা ২৯ টাকা ৫৭ পয়সা। কিন্তু এই যে তাদের ঘোষিত নীতি তার বাস্তবায়ন কোথায়, সেটা কি তারা দেখবে না?
ভরা মৌসুমে সবজির বাজারে এমন অগ্নিমূল্যে শুধু ক্রেতা নন, বিক্রেতারাও বিস্মিত। তাদের ভাষ্য, অন্য বছরগুলোর এ সময় পাইকারিতে শিমের কেজি ছিল ১৫ থেকে ১৬ টাকা। খরচ ও লাভ যোগ করে বিক্রি হতো ২০ থেকে ২৫ টাকায়। অথচ এখন পাইকারিতে কিনতে ২৫ টাকার বেশি খরচ পড়ে যায়। টমেটো পাইকারিতে কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা কিনে খুচরায় বিক্রি হতো ২৫ থেকে ৩০ টাকা। কারওয়ান বাজারের এক খুচরা সবজি বিক্রেতার ভাষ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার কথায়, ‘জীবনে কোনো দিনই শীত মৌসুমে শিমের কেজি ৮০-৯০ টাকায় বেচিনি। গত বছর এ সময় কেজি ছিল ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এমনও না যে, শিমের অভাব আছে। মাইনষেরে কী কমু আমার নিজেরও খারাপ লাগে দাম বলতে।’ খুচরা বিক্রেতার খারাপ লাগলেও বড়দের নিশ্চয়ই খারাপ লাগে না!
খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ওষুধের দাম। ওষুধ শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল আমদানিনির্ভর, ফলে ডলার সংকট একটা বড় অজুহাত। কিন্তু ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কতিপয় কাঁচামালের মূল্য কমলেও দাম কমেনি। গত বছর নানাভাবে ওষুধের দাম ১৩ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এটা তো সত্য যে, বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যয় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে বেশি, ফলে চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার প্রবণতাও বেশি।
খোদ স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে প্রতি বছর ৮৬ লাখ মানুষ আর্থিক সংকটে পড়ে। চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে ১৬ শতাংশ নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণেই বিরত থাকে। কয়েক বছর আগে বিশ^ব্যাংক ও বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, মাত্রাতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক হারে দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে, বর্তমানে এই হার আরও বেড়েছে। সরকারি নীতি সহায়তা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের মুনাফা অর্জন সহজ করায় দেশে ওষুধ শিল্পের ধারাবাহিক বিকাশ ঘটেছে। জীবনরক্ষাকারী দেড় হাজার ওষুধের ২৭ হাজার পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও রপ্তানির সাফল্য নিয়ে গর্ব করে সরকার। কিন্তু মাত্র ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের খুচরা মূল্য সরকার নির্ধারণ করে। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক দাম নির্ভর করে উৎপাদকের মুনাফার মানসিকতার ওপর। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার সদিচ্ছা বা সাহস কি কারও আছে?
অস্বাভাবিক মুনাফা ও অতি সামান্য শাস্তি মুনাফা শিকারি এবং বাজার অস্থিরতার জন্য দায়ীদের এক ধরনের প্রণোদনা দিয়ে থাকে। যেমন অস্বাভাবিকভাবে ডিমের মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ডায়মন্ড এগ লিমিটেডকে আড়াই কোটি টাকা এবং সিপি বাংলাদেশ কোম্পানি লিমিটেডকে এক কোটি টাকা আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এ বিষয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেছিল। মামলার শুনানি শেষে ২২ জানুয়ারি এই জরিমানার আদেশ দেয় কমিশন। রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে জরিমানার অর্থ বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সংশ্লিষ্ট খাতে জমা দিতে হবে। আদেশ পালনে ব্যর্থ হলে প্রতিদিন এক লাখ টাকা জরিমানা যোগ হবে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন এবং একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ‘১৫ দিনে ডিম ও মুরগির বাজার থেকে ৫১৮ কোটি টাকা লুট’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা কমিশন অনুসন্ধান করে অভিযোগের সত্যতা পায়। প্রতিযোগিতা আইন লঙ্ঘনের অপরাধে তাদের এই শাস্তি প্রদান করা হয়েছে। এখন কথা হলো, ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করে ৪ কোটি টাকা জরিমানা হলে এসব অসাধু (!) ব্যবসায়ীরা কি সাধু হয়ে যাবেন?
সংযমের মাস রমজান আসছে। বলা হয়েছে, রোজার সময় দাম বাড়ানো যাবে না তাই দাম বেড়ে গেছে দুই মাস আগেই। খোদ টিসিবির তথ্য বলছে, চিনির ২৪ শতাংশ, খেজুর ১২ শতাংশ, ছোলা ১২ শতাংশ, পাম অয়েল ৬ শতাংশ আর পেঁয়াজের ১৬১ শতাংশ দাম বেড়েছে। রাস্তায় দেখা যাচ্ছে, ট্রাকের পেছনে লাইন ক্রমাগত দীর্ঘ হচ্ছে। আগের মন্ত্রী বলেছিলেন সিন্ডিকেটকে ধরা যাবে না, তাহলে বাজার আরও অস্থির হবে। মানুষ ভেবেছিলেন, ঠিকই তো বাজার অস্থির হলে বিপদ আরও বাড়বে। প্রয়োজনে নিজেরা কম খেয়ে স্থির হয়ে থাকি তাতে যদি বাজারের রাগ একটু কমে। কিন্তু মুনাফার প্রবল আকর্ষণ, ব্যবসায়ীদের দারুণ প্রভাব, সরকারের ওপরে ওপরে হুঙ্কার আর তলে তলে প্রশ্রয় মিলে তৈরি হওয়া বাজারের উত্তাপ সাধারণ মানুষকে রেহাই দিচ্ছে না।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com