মার্কিনিদের সংকটের নাম একাকিত্ব

যুক্তরাষ্ট্রে দেখা দিয়েছে এক নতুন ‘মহামারী’। আর তা হলো একাকিত্ব। ইউএস টুডে এবং দ্য আটলান্টিক অবলম্বনে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

‘মা আজ মারা গেছেন, হয়তো গতকালই; ঠিক ধরতে পারছি না।’ নোবেলজয়ী লেখক আলবেয়ার কামুর উপন্যাস ‘দ্য আউটসাইডার’ শুরু হয়েছিল এভাবে। এ বাক্যে যে উদাসীনতা, বিষন্নতা-পশ্চিমের ব্যক্তি চরিত্রেরই যেন অনুরূপ। মায়ের মৃত্যুতে এ উপন্যাসের মূল চরিত্র মাসরোর যে নির্লিপ্ততা, তা পশ্চিমের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। একা থাকাও তাদের স্বভাব। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি এ সংকট বেড়েছে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ভেবে থাকেন যে, তিনি স্বাধীন এবং নিজের মতো করে বাঁচবেন। তারা নিজের চাকরি, ব্যবসাজীবন শুরু করেন। এরপর একা থাকার সিদ্ধান্ত নেন। আবার কেউ কেউ মনস্তাত্ত্বিক একাকিত্ব অনুভব করতে পারে। তারা মনে করে না যে, তাদের বিশ্বাস করার মতো কেউ আছে। লিঙ্গ, জাতি বা শারীরিক অক্ষমতার কারণে তারা নিজেকে একা ভাবতে পারে।

বাড়ছে প্রবণতা

দ্য আটলান্টিক ডটকমে লেখক ফেইথ হিল জানাচ্ছেন, গত শতকের তুলনায় মার্কিনিদের একাকী জীবনযাপনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৪০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় আট শতাংশ পরিবারে একজন ব্যক্তি ছিল, যারা একা থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। আর ২০২০ সালে এ সংখ্যা প্রায় ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়। এই প্রবণতা তরুণদের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৫০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত একা বসবাসকারী ১৮-৩৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা দশগুণ বেড়েছে। যে সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার তা পাঁচ মিলিয়ন হয়েছে। অবশ্য ২০১০-এর তুলনায় ২০২০ সালে এ ঝোঁক কিছুটা কমেছে।

ফেইথ হিল জানাচ্ছেন, তিনি এ বিষয়ে বিভিন্ন গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেন। তাকে গবেষকরা বলেন, একা থাকার পরও মার্কিনিরা বিয়ে করছে। বর্তমানে মার্কিন নারীদের প্রথম বিয়ের গড় বয়স প্রায় ২৯ আর পুরুষের ক্ষেত্রে এটি ৩০। অর্থাৎ ১৮ বছরে পা রাখার এক দশকেরও বেশি সময় পর তারা বিয়ে করছে। সমাজবিজ্ঞানী এরিক ক্লিনেনবার্গ তার ‘গোয়িং স্লো’ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, শহর এলাকার তরুণরা একাকী জীবনযাপনকে সাফল্যের জন্য অপরিহার্য হিসেবে দেখছে।

এ বিষয়ে ইউএস টুডেকে সার্জন জেনারেল ডা. বিবেক মূর্তি বলেন, আমাদের সম্প্রদায়ে যে সমস্যাটি দেখা দিয়েছে, তা হলো একাকিত্ব। একাকিত্ব আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর অনেক বেশি প্রভাব ফেলে।

ফেইথ হিল বলেছেন, কিছু মার্কিনি তাদের জীবন জুড়ে একা থাকে। তারা একে কৃতিত্ব হিসেবে দেখে। তারা মনে করে, এর মাধ্যমে স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। তাদের কাছে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া মানে একা থাকা।

ইতিহাস

তবে ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নারীর জন্য একা থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক ছিল। অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন মিন্টজ বলেন, একটা সময় মার্কিন নারীরা বিয়ে করা ছাড়া সত্যি বেঁচে থাকতে পারত না। ১৯ শতকের শেষ দিকে যারা অবিবাহিত ছিল, তারা ভরণপোষণের জন্য অন্য কোনো পরিবারের সঙ্গে (পেয়িং গেস্ট) বা বোর্ডিং হাউজে থাকত। আর পুরুষদের জন্য ছিল টিকে থাকার লড়াই। এমনকি ২০ শতকেও নিজেকে প্রতিষ্ঠার চাপে পুরুষ মা-বাবা বা স্ত্রীর সঙ্গে খুব কম সময় কাটাতে পারত।

তবে ধীরে ধীরে একা থাকা মার্কিনিদের জীবনযাপন স্বাভাবিক হতে শুরু করে। শিল্পায়ন, চাকরিরর সুযোগ বৃদ্ধি, বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হয়ে ওঠা, শিক্ষা ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নের ফলে দেশটিতে সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটে। একান্নবর্তী থেকে একক পরিবার ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে থাকে তারা। আধুনিক পরিবারগুলোতেও পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যেমন তারা সন্তানদের জন্য আলাদা বেডরুমের ব্যবস্থা করে। মনোবিজ্ঞানী ভার্জিনিয়া থমাস জানান, তিনি যখন তার ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করেন, কী তাদের প্রাপ্তবয়স্ক করে তোলে? এর উত্তরে সবসময় তারা জানিয়েছে আর্থিক স্বাধীনতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতা। তারা প্রাপ্তবয়স্কতায় যেতে চায়। একা বসবাস করার মাধ্যমে যা তারা সম্পূর্ণভাবে পেতে পারে।

তখন তারা নিজেদের সমস্যা নিজেরা সমাধানের জন্য উদ্যোগী হয়। পরনির্ভরশীলতা কমে আসে। পারিবারিক সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে সংকট, নানা টানাপড়েন থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারে।

 সুবিধা

অনেক তরুণ একা একা সব সামাল দিয়ে সন্তুষ্ট থাকে। তারা বাসা ভাড়া, ইউটিলিটি খরচ, বিদ্যুৎ বা পানির সমস্যা নিজে থেকে সামাল দিতে পারে। যা তাদের মনোতুষ্টি এবং মনোবল বাড়ায়। মনোবিজ্ঞানী জেফ্রি জেনসেন আর্নেট বলেন, একা থাকা মানে স্বায়ত্তশাসন ও মানসিক পরিপক্বতার দিকে যাওয়া। একা থাকার ফলে কেবল দক্ষতাই বিকিশতি হয় না বরং আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। অনেক কিছু শেখা যায়। নিজের মতো করে আরামদায়ক সময় কাটানো যায়।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, তরুণরা যারা একা থাকে তারা সাধারণত দেয়ালে বন্দি থাকে না। তারা বাইরের বিশ্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকে।

ফেইথ হিল বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রাপ্তবয়স্করা ‘দূরত্বের অন্তরঙ্গতা’কে মূল্য দেয়। তারা প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকতে চায় না, আবার সঙ্গেও থাকতে চায় না।

আবার দীর্ঘ সময় একা থাকার পর কেউ কেউ আছেন পরিবারে ফিরে যান। তাদের জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন ফেইথ হিল। তিনি বলেছেন, এ অবস্থায় পরিবারে ফিরে গেলে নমনীয় থাকতে হবে। অন্যদের সঙ্গে কাজ করার মানসিকতার দরকার হবে। পরিবারে নিজের পছন্দমতো সব পাওয়া যাবে না। একটি বাড়িতে অনেক কিছু ভাগাভাগি করে নিতে হবে। এখানে খেয়াল রাখতে হবে, যেন কোনোভাবে শান্তি বিনষ্ট না হয়।

সংকট

তবে সবার জীবনে একাকিত্ব সমানভাবে আসে না। কারও জন্য তা তীব্র মানসিক সংকট হিসেবে দেখা দেয়। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকরা।

ইউএস টুডে তাদের প্রতিবেদনে জানায়, একাকিত্ব মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে হৃদরোগ, ডিমেনশিয়া, স্ট্রোক এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। দেশটির জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ ‘মহামারী’ মোকাবিলায় একটি জনস্বাস্থ্য কাঠামো তৈরির জন্য এক হয়েছেন। ড. জেরেমি নোবেল বলেন, বিশ্বে একাকিত্ব বাড়ছে। যা খুব উদ্বেগজনক পরিণতি পেয়েছে। তিনি বলেন, একাকিত্ব ব্যক্তিকে শুধু দুঃখী করে তোলে না, মেরেও ফেলে। সে কারণেই এটি একটি সংকট।

ইউএস সার্জন জেনারেলের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, একাকিত্ব অকালমৃত্যুর ঝুঁকি ২৬ এবং বিচ্ছিন্নতা ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি করে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অনুসারে, একাকী বোধ করা একজন ব্যক্তির হৃদরোগের ঝুঁকি ২৯ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি ৩২ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে জানা যায়, ৫০ থেকে ৮০ বছর বয়সীদের মধ্যে একাকিত্ব ২০১৮ সালের অক্টোবরে ২৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২০ সালের জুনে ৫৬ হয়েছে। করোনা মহামারীর সময়ে যা বেড়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে তা কিছুটা কমতে দেখা যায়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ তরুণ মহামারী করোনা শুরুর পর থেকে একাকিত্ব বৃদ্ধির কথা জানিয়েছে।

অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একাকিত্বকে ত্বরান্বিত করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব সাইট ব্যবহারকারীদের মধ্যে একাকিত্ব বাড়ায়। তারা ভার্চুয়ালি একজন ব্যক্তিকে ভালো অনুভব করতে পারে। সরাসরি প্রকৃত সংযোগ গড়ে তুলতে আগ্রহী হয় না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ২ জনের একজন প্রাপ্তবয়স্ক একাকিত্বে ভোগে। যা দেশটির ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় বেশি।

গবেষকরা বলছেন, একাকিত্ব স্ট্রেস হরমোনকে বাড়িয়ে দেয়। যা শারীরিক ক্রিয়াকলাপকে অনিয়ন্ত্রিত করে। একাকী বোধ করা মানুষের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস থাকে। যেমন খারাপ খাদ্য গ্রহণ, ধূমপান, অনিয়ন্ত্রিত মদ্যপান ইত্যাদি।

একাকিত্ব কাটানোর উপায় হিসেবে ইউএস টুডেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এমন কিছু জিনিস রয়েছে, যা অনুশীলন করলে একাকিত্ব রোধ করা যায়। যেমন পছন্দের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো। অন্যদের উপকার করা। মনোযোগ দিয়ে অন্যদের কথা শোনা এবং ডিভাইসগুলো দূরে রাখা।

গত বছরের শেষে ‘আওয়ার এপিডেমিক অব লোনলিনেস অ্যান্ড আইসোলেশন’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। যাতে এক বিশেষজ্ঞ বলেন, একাকিত্বে ভোগা দিনে ১৫টি সিগারেট খাওয়ার সমান। অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা থেকেও বেশি গুরুতর এই একাকিত্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এ বছর একাকিত্ব কমাতে একটি কমিটির গড়ার কথা বলে। তার নেতৃত্বে থাকছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্জেন জেনারেল বিবেক মূর্তি ও আফ্রিকান ইউনিয়ন ইউথ এনভয় চিডো এমপেমবা।

সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই কমিটি আগামী তিন বছরে এই সংক্রান্ত রূপরেখা তৈরি করবে। একাকিত্বের সঙ্গে কীভাবে লড়াই করা যায়, তার জন্য তৈরি হবে বিভিন্ন প্রকল্প। সমাজের মধ্যে আবার যোগাযোগ ফিরিয়ে আনতে কী করণীয়, তারই পরামর্শ দেবে এই বিশেষ কমিটি।

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, একাকিত্ব দূর করতে ভালো লাগে এমন কিছু করার মতো খুঁজে বের করুন। এমন কিছু করুন, যাতে খারাপ চিন্তা থেকে মনোযোগ সরে যায়। সেটা হতে পারে গান শোনা, বই পড়া অথবা বাগান করা। তবে তা যেন ক্ষতিকর ভালো লাগার কিছু না হয়। নিজের এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, সংগঠনে যোগ দিন। কিছুক্ষণের জন্য ভালো

থাকবেন। সেখানে নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হবে, বন্ধুত্ব বাড়বে। আত্মতুষ্টি বোধ করবে এমন কোনো দানশীল কাজে যোগ দিন। ইতিবাচক চিন্তা বাড়ানোর চেষ্টা করুন। কথা চেপে না রেখে কথা বলার চেষ্টা করুন, আপনার অনুভূতি সম্পর্কে বন্ধুবান্ধব, পরিবারের সঙ্গে কথা বলুন।