৩ গ্রাম হেরোইনের মামলা ২২ বছর

২০০২ সালের ২০ মে রাজধানীর হাজারীবাগের ৫ নম্বর মনেশ্বর রোডের প্রথম লেন এলাকায় ৩ গ্রাম হেরোইনসহ রেহেনা বেগমকে (তখন তার বয়স ২৫) গ্রেপ্তার করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা হয়। তদন্ত শেষে ওই বছরের ২৯ জুন অভিযোগপত্র দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

২০০৪ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ পঞ্চম আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয়। ১৬ বছরের বেশি সময়ে অভিযোগপত্রভুক্ত পাঁচজন সাক্ষীর মধ্যে তদন্ত কর্মকর্তাসহ সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনজন। এখন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০-এ মামলাটি চলমান রয়েছে। সাক্ষী গরহাজির থাকায় ২০২২ সালের ১৭ আগস্ট থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না। অনিষ্পন্ন এ মামলার বয়স এখন প্রায় ২২ বছর (২১ বছর ৮ মাস)। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে জামিনে থাকা এক আসামি ৯ বছর ধরে পলাতক। মামলার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

এমন অনেক মাদক-মামলার বিচারকাজ চলছে বছরের পর বছর। মাদকের বিস্তার রোধ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটি রহিত করে ২০১৮ সালের অক্টোবরে একই নামে আইন করে সরকার। কিন্তু বিচারে গতি আসেনি, মাদকের বিস্তারও রোধ করা যায়নি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে বিচারাধীন মাদকের মামলা ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী (গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত), বিভিন্ন আদালতে ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৮ মাদক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। ৩ বছর ৯ মাসে মামলা বেড়েছে ২ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬৮টি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে, বিচারাধীন (গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) মামলা ৮২ হাজার ৫০৭টি। দুর্বল তদন্ত, সাক্ষীর গরহাজির কিংবা অসংগতিপূর্ণ সাক্ষ্যে আসামিদের বড় অংশ খালাস পেয়ে যায়। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এ পরিস্থিতিকে উদ্বেকজনক বলেছেন। মাদকের বিস্তারে একটা প্রজন্ম ক্রমে ধ্বংস হচ্ছে। আর বিচারে বিলম্বে হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

আইনে যা আছে

২০১৮ সালের আইনে মাদক মামলার বিচারের জন্য প্রতি জেলায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিধান রাখা হয়। তবে ট্রাইব্যুনাল না হওয়া পর্যন্ত জেলা দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতকে বিচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিচারক ও এজলাস সংকটের কারণ দেখিয়ে পরে ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায় সরকার।

২০২০ সালের নভেম্বরে আইনটিতে সংশোধনী আনা হয়। জেলা দায়রা জজ ও অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতসহ (ক্ষেত্রবিশেষে মহানগর দায়রা আদালত ও মহানগর অতিরিক্ত দায়রা আদালত) মাদকের পরিমাণ সাপেক্ষে এখতিয়ারসম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতেও বিচারের বিধান রাখা হয়। এ আইন অনুযায়ী ৫ বছরের (ক্ষেত্রবিশেষে ৭ বছর) নিচে সাজা দিতে পারেন মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট। দায়রা আদালত ও অতিরিক্ত দায়রা আদালত মৃত্যুদ- ও যাবজ্জীবন সাজা দিতে পারে। অভিযোগপত্র গঠনের সময় থেকে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। এ সময় সম্ভব না হলে আরও ৩০ কার্যদিবস, না হলে আরও ১৫ কার্যদিবস (সুপ্রিম কোর্টকে অবহিত করে) সময় নেওয়া যাবে। আবশ্যিকভাবে এই বিধান প্রতিপালনের কথা বলা হলেও নির্দিষ্ট সময়ে বিচার শেষ না হলে কী হবে তা বলা নেই।

আইনজীবীদের বক্তব্য, মাদকের মতো স্পর্শকাতর মামলার বিচারে স্বতন্ত্র আদালত থাকাই সমীচীন।

এক সাক্ষীতেই ১৩ বছর পার

দেশে মাদকের বিস্তার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচারে ধীরগতি ও সাক্ষীর গরহাজিরাও বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ-১৪ নম্বর আদালতে একটি মামলার নথি পর্যালোচনা করে সাক্ষীর গরহাজিরার হতাশাজনক চিত্র পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর রাজধানীর বাড্ডা থানার উত্তর বাড্ডা থেকে ৫ বোতল ফেনসিডিলসহ এক আসামিকে (ঘটনার সময় বয়স ২৮ বছর) গ্রেপ্তার করেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

মামলার তদন্ত শেষে ওই বছরের ৬ ডিসেম্বর ছয়জনকে সাক্ষী করে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর ২০১১ সালের ২৮ মার্চ বিচার শুরুর আদেশ হয়। আসামি কিছুদিন কারাগারে থেকে জামিনে মুক্তি পান। অভিযোগ গঠনের পর প্রায় ১৩ বছর পার হয়েছে। ১৪ জানুয়ারি প্রথম সাক্ষী (মামলার বাদী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা) সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রকাশ রঞ্জন বিশ^াস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথম সাক্ষীতেই ১৩ বছর পার হলে মামলায় অনেক কিছুই ঘটতে পারে। বাদী জেরার সময় আলামত জব্দের তথ্য দিতে পারেননি। উদ্ধার করা ফেনসিডিলের খালি বোতল কোথায় রেখেছেন তাও জানাতে পারেননি। বিচারে দেরি হলে আসামিপক্ষ অসংগতি খুঁজবে, এটাই স্বাভাবিক।’

একই আদালতে বিবিধ মামলার বিচার

সম্প্রতি ঢাকার আদালতপাড়ায় মাদকের মামলার বিচার চলে, এমন ৬টি আদালতের এজলাস ঘুরে বিচারকাজ প্রত্যক্ষ করেছেন এই প্রতিবেদক। দেখা গেছে, এক কর্মদিবসের কয়েক ঘণ্টায় একই আদালতের বিচারক বিশেষ আদালত ও দায়রা আদালত নামে হত্যা, অস্ত্র, দুর্নীতি, অপহরণ ও মাদকের মতো স্পর্শকাতর মামলার বিচারকাজ করেন। আবার কোনো আদালত চলে এজলাস ভাগাভাগি করে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টায় একটা ছেড়ে আরেকটা মামলার শুনানি করতে গিয়ে লম্বা সময়ের তারিখ পড়ে। দ্রুত বিচার ও ন্যায়বিচার জটিল পরিস্থিতিতে পড়ে। এ কারণে লঘু-গুরু যেকোনো ফৌজদারি মামলা পাঁচ বছরের আগে নিষ্পত্তি হতে দেখা যায় না।

প্রতিবেদনের শুরুতে উল্লিখিত মামলার রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আজাদ রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক ঘণ্টার কর্মসময়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারে সংগত কারণেই বিচারক ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। গুরুতর মামলার প্রায় সবই পুরনো। সাক্ষী হাজির করা একটা সমস্যা। বারবার সমনেও সাক্ষী আসে না।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলার জট ও প্রসিডিংসের কারণে বিচারকদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা চাইলেও মামলা নিষ্পত্তির জন্য কঠোর হতে পারেন না। মামলা করার সময় পুলিশ বা বাদীপক্ষ যতটা উৎসাহী থাকে সাক্ষী হাজিরের ব্যাপারে তারা ততটাই নিরুৎসাহী থাকেন। তারিখের পর তারিখে অনেকেই হয়রান হন।’

জামিনে বেরিয়েই ফের অবৈধ কারবারে

১৭ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকা থেকে চিহ্নিত মাদক কারবারি সুরুজ মিয়াকে (৩০ বছর) গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও থানা-পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, সুরুজ মিয়া ৩১ মাদকের মামলায় প্রায় ৫০ বার গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে বা পলাতক থেকে অবৈধ কারবার চালান। আইনজীবীরা বলেন, এমন উদাহরণ অনেক।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, জামিন পাওয়া আসামির ন্যায়সংগত অধিকার হলেও অপরাধের গুরুত্ব ও গভীরতা বিবেচনায় তারা জামিনের বিরোধিতা করে থাকেন। অভিযোগপত্রে বিলম্ব কিংবা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ আসামিরা জামিনে থেকে কাজে লাগায়। ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছোটখাটো মামলায় অনেক সময় জামিন হয়। মাদকের পরিমাণ বেশি হলে সচরাচর জামিন হয় না। অভিযোগপত্রে বিলম্ব কিংবা দীর্ঘদিন সাক্ষী না আসার যুক্তিসাপেক্ষে জামিন হলেও তা কম। রাষ্ট্রপক্ষ এ বিষয়ে তৎপর।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ডিএলআরের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদক নিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি চলছে। আবার বিচার নিশ্চিতে বিলম্বে হচ্ছে। বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত না হলে, অপরাধীর সাজা নিশ্চিত না হলে মাদকের বিস্তার কমবে না।’

তিনি বলেন, ‘এমনিতেই সাক্ষী আসে না। আবার শুনানি মুলতবির মাধ্যমে অযথা কালক্ষেপণ হয়। এটি বেশি ঘটে আসামিপক্ষ থেকে। মুলতবির বিষয়টির অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ দরকার।’ চলমান বাস্তবতায় মাদকের মামলার বিচারে স্বতন্ত্র আদালত বা ট্রাইব্যুনাল গঠন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।’