বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আনোয়ার হোসেনের কানাডা পালিয়ে যাওয়ার পেছনে বিমানের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশ পেয়েছে পুলিশ। কেনাকাটাসহ নানা ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ২৭টি অভিযোগ পড়েছিল বলাকা ভবনে। তদন্ত করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো অভিযোগ পেয়েছে, ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই আনোয়ার চালিয়ে গেছেন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে কর্মরত আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে এক বছরে কেলেঙ্কারির অভিযোগগুলো জমা পড়ে। তিনিই এসব কেলেঙ্কারির মূল হোতা। কর্তৃপক্ষ কমিটি করলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। কিছুদিন আগে বদলি করা হয়েছে।
দুর্নীতির দায় এড়াতে ওমরা হজের কথা বলে কিছুদিন আগে বিমানের একটি ফ্লাইটে করেই কানাডায় পালিয়ে যান আনোয়ার হোসেন। পালিয়ে যাওয়ার তথ্য ফাঁস হলে এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। এর মধ্যে আনোয়ার হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে বিমান। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, পালিয়ে যাওয়ার সময় আনোয়ার সংস্থাটির গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার, তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে গেছেন। আর ওই সব তথ্য পাচারের আশঙ্কাও রয়েছে। তাকে যেভাবেই হোক দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। আর না হয় বিমান বড় ধরনের সমস্যায় পড়বে।
সংশ্লিষ্ট বিমান কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত বছরের ৭ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বিমানের বিজি-৩০৫ ফ্লাইটে সহকারী ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন কানাডায় পালিয়ে যান। এরপর থেকে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে না থাকায় কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হলে খোঁজ নেওয়া হয় তার পরিবারের কাছে। পরে নিশ্চিত হয় আনোয়ার ওমরাহ হজের কথা বলে পালিয়ে যান। আনোয়ার হোসেনের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের নুনিয়ায়। তার বাবার নাম আব্দুল মান্নান।
বিমানের আরেক কর্মকর্তা সোহান আহমেদ বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার কথা বললেও তিনি দেশেই আছেন। তিনি একটি বেসরকারি এয়ারলাইনসে চাকরির চেষ্টা করছেন। তবে সোহান দাবি করেছেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও অব্যাহতি নিয়ে অন্য একটি সংস্থায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। আসার সময় বিমানের কোনো কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যাননি।
নাম প্রকাশ না করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানের ফ্লাইটে করে পালিয়ে যাওয়ায় আমাদের সন্দেহ হয়েছে বিমানের কোনো না কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই আনোয়ার দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বিষয়টি আমরা গভীরে গিয়ে তদন্ত করছি। প্রাথমিক তদন্তে কিছু কর্মকর্তার নাম পেয়েছি। তাদের কর্মকান্ড ও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আনোয়ারের বিরুদ্ধে এক বছরে যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, এর মধ্যে বেশিরভাগ অভিযোগই দুর্নীতির। তার বিরুদ্ধে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। আনোয়ারের কাছে বিমানের বিভিন্ন চুক্তিপত্র, আরআই পলিসি এবং সফটওয়্যারের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য পাচার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বড় ধরনের ক্ষতি ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বিমান। আনোয়ারকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে ওই কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেন।
এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে বিমানের ওই কর্মকর্তা বলেন, আনোয়ার কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার পর বিমানের বড় কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক বেড়েছে। তারা মনে করছেন, আনোয়ার তাদের নানা দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করে দিতে পারেন। এ কারণ ছাড়া আরও নানা কারণে জিডি করতে বাধ্য হয়েছেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিমানের করা জিডি তদন্ত করা হচ্ছে। দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিমান অভিযোগ করেছে। তাদের মধ্যে একজন কানাডায় চলে গেছেন। আরেকজন দেশেই আছেন। বিমানের কিছু অসাধু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগসাজশে আনোয়ার হোসেন কানাডায় গেছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। বিমানের ফ্লাইটে করে যাওয়ায় সন্দেহ বেশি হচ্ছে, বিমানের কেউ না কেউ বিষয়টি অবহিত ছিলেন।
পুলিশের ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আনোয়ারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব অভিযোগ কর্তৃপক্ষের কাছে পড়েছিল, সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত চলছে এখনো। এর মধ্যে তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে পালিয়ে যান। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিপদে পড়তে পারেন এই শঙ্কায় আনোয়ার পালিয়ে গেছেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। বিমান কর্মকর্তারাও একই আশঙ্কা করেছেন।
তিনি বলেন, আনোয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো এক দিনে করা হয়নি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু রাজশাহীতে বদলি করা হয়েছিল। তার কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধাও বন্ধ করেনি বিমান কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কয়েকটি প্রমাণিত হয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শফিউল আজিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনোয়ারকে কানাডা থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। অবশ্যই তাকে ফিরে আসতে হবে। পালিয়ে কানাডায় থাকার তার কোনো সুযোগ নেই। আনোয়ার জেলা অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলেন বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। বিষয়টি নিয়েও আমরা তদন্ত করছি।’