গান আর অভাব তার চিরসঙ্গী

এত গান লিখেও সংসার চলছে না একসময় আক্ষেপ করেছিলেন বীরভূমের লোকশিল্পী রতন কাহার। সেই ‘সংসার চালাতে না পারা’ লোকগীতিকার ও গায়ক পেতে চলেছেন ভারত সরকার প্রদত্ত পদ্মশ্রী পুরস্কার। ‘বড়লোকের বিটি লো’ গানের স্রষ্টার এ সম্মানে খুব খুশি লালমাটির জেলার বীরভূমবাসী।

‘ভাদু গান’ (প্রাচীন লোকগান) গেয়ে যৌবনে গায়ক জীবন শুরু করেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার শান্তিনিকেতন থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে জেলার সদর শহর সিউড়ি পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নগরীপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা রতন কাহার। শুরু করেন গান বাঁধা আর জেলায় জেলায় ঘুরে গান শোনানো। প্রসার ভারতীতেও (রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ভারতীয় গণসম্প্রচারমাধ্যম) গান গেয়েছেন। কিন্তু নিয়মিত সুযোগ পাননি সেখানেও।

‘বড়লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল’ গানটি অনেকেরই পরিচিত। গানটির রচয়িতা রতন কাহার। ১৯৭২ সালে তিনি এই গানটি লিখেছিলেন এবং এই গানটি প্রথম গেয়েছিলেন সংগীতশিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তী।

লাল মাটির বুকে এখনো হেঁটে বেড়ান এই ‘পাগল সুরসাধক’, বৃদ্ধ হয়েছেন। মুখে-চোখে বয়সের ছাপ। শক্তিহীন শরীর তা-ও গান নিয়ে আজও বাঁচে। নিজের গান এত বিখ্যাত হলে কী হবে, অবস্থা তার বদলায়নি আজও। গান আর অভাব তার চিরসঙ্গী। জীবনে রয়েছে অনেক সমস্যা, অনেক প্রতিকূলতা। তবুও লোকসংগীতের ধারাকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। রতন কাহার একজন সাধক যার শরীর জুড়ে শুধু মাটিরই গন্ধ।

সম্মান যে পাননি, তা নয়। ছোট-বড় মিলিয়ে অনেক পুরস্কার। সিউড়ি শহরের এক চিলতে কুঁড়েঘরেই মানপত্র থেকে শুরু করে নানা পুরস্কার দেয়াল জুড়ে। পূর্বাঞ্চল সংস্কৃতি কেন্দ্র, তথ্য সংস্কৃতি বিভাগসহ বিভিন্ন পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে। লোকসংগীতের মানুষ ও তার বাইরের গুটিকয় ছাড়া বৃহত্তর অংশের ধরাছোঁয়ার বাইরে তিনি।

দিন কয়েক আগে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভাদু গানের শিল্পী রতন কাহারকে জানানো হয় আপনাকে দেশের অন্যতম পুরস্কার পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হচ্ছে। রতনবাবু এ খবর শুনে উচ্ছ্বসিত, আনন্দে দিশেহারা। ৯১ বছর বয়সে এসে এই সম্মান যেন তাকে আবার নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়েছে।

নিজ ভিটেতে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রতন কাহার বলেন, জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে পদ্মশ্রী পাওয়ার আনন্দের কথা। বলেন, ‘আমার জীবনপ্রদীপ নেভার সময়ে খুশির খবর। ভারত সরকার আমাকে পদ্মশ্রী সম্মান দিচ্ছে। পরিবারের সবাই ভীষণ আনন্দিত। “বড়লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল’ গানটি আমি লিখেছিলাম ১৯৭২ সালে। সেই সময়ই সংগীতশিল্পী স্বপ্না চক্রবর্তী রেডিওতে গান করতেন। ১৯৭৬ সালে প্রথম তিনি এই গানটি রেকর্ড করেন। তবে সেই সময় গানের স্রষ্টা হিসেবে রতন কাহারের নাম সামনে আনতে নিষেধ করেছিলেন স্বপ্না দেবী। সেটা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত জানা নেই। তবে সবাই জানতেন এটি রতন কাহারের লেখা গান।’

৯১ বছর বয়সী রতন কাহার আবেগপ্রবণ হয়ে আরও বলেন, ‘মুম্বাইয়ের বিখ্যাত গায়ক বাদশা আমার এই গানটি অ্যালবাম আকারে প্রকাশ করেছিলেন। তিনিও নিজের নামে চালিয়েছিলেন। প্রকৃত গানের মালিকের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করেননি। খুব স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতিবাদ করা হয়। এই সংগীতের রচয়িতা রতন কাহার। চুরি করাটা অপরাধ। চাপে পড়ে অবশ্য শিল্পী বাদশা নত শিকার করে যোগাযোগ করেন আমার সঙ্গে। ভিডিও কলে কথা হয়। বাদশা আমার বাড়িতে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।’

সে সময় ভারত জুড়ে করোনাভাইরাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় আসতে পারেননি বাদশা। তবে রতন কাহারকে পাঁচ লাখ টাকা সহযোগিতা করেছিলেন। এখন ভারত সরকার পদ্মশ্রী সম্মান দেবে। ভীষণ ভালো লাগছে বলে জানান তিনি।

‘বড়লোকের বিটি লো, লম্বা লম্বা চুল’ গানের একটা লাইন ভুল গেয়েছিলেন স্বপ্ন চক্রবর্তী। তা নিয়ে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল রতন কাহারের। রতন বাবু বলেন, ‘দেখেছিলাম স্বপনে, ওরে স্বপনে... ভালোবাসা দারিন ছিল মাথার সীতেনে’ এই লাইনটি ভুল গাওয়া হয়েছিল, যা আজও সংশোধন হয়নি। একই রকমভাবে ভুল করে ‘লাল ধুলোর সরানে ওরে সরানে ভালোবাসা দারিন ছিল মাথার সিঁথানে’। এভাবেই ভুল গায় শিল্পীরা আফসোস করেন রতন কাহার।