ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের ধকল সামলাতে পারছে না পুঁজিবাজার। গত সপ্তাহে অধিকাংশ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের পর কৃত্রিমভাবে সাপোর্ট দেওয়ার পরও সূচকের পতন ঠেকানো যায়নি। মার্জিন ঋণে কেনা শেয়ার ফোর্সড সেল (বাধ্যতামূলক বিক্রি) হওয়ায় চলতি বাজারে পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। গতকাল রবিবার প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৯৩ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের মধ্যে ৩১১টিরই দরপতন হয়েছে। এতে করে ডিএসইর প্রধান সূচকটি হারিয়েছে ৭৭ পয়েন্ট। এ নিয়ে সর্বশেষ তিন কার্যদিবসে প্রায় ২০০ পয়েন্ট হারাল সূচকটি।
টানা তিন কার্যদিবসে বড় পতনে ডিএসই প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমে এসেছে ৬০৭৯ পয়েন্টে, যা গত ১৮ মাসে সর্বনিম্ন। এর আগে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই সূচকটি ৫৯৮০ পয়েন্টে নেমেছিল। গতকাল ডিএসইর সবগুলো খাত বাজার মূলধন হারিয়েছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বড় কিছু বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ারের বিক্রির চাপ ছিল। এর মধ্যে স্কয়ার ফার্মা, ব্র্যাক ব্যাংক, জিপিএইচ ইস্পাত, আইএফআইসি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক ও সীপার্লের মতো অনেক শেয়ার ছিল, যেগুলো সূচকে বড় প্রভাব ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে সূচকের ক্রমাগত পতনের সময়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও আরও পতনের শঙ্কায় শেয়ার বিক্রি করেন। এতে পতন আরও ত্বরান্বিত হয়। তবে পরিস্থিতি আরও নাজুক করেছে, মার্জিন ঋণের কেনা শেয়ারগুলো ফোর্স সেল করায়। ক্রমাগত দরপতনে গ্রাহকদের থেকে নতুন করে মার্জিন না পাওয়ায় কিছু ব্রোকারেজ হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংক শেয়ার বিক্রি করেছে।
দিনের লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেনদেনের প্রথম দুই ঘণ্টা পর্যন্ত মিশ্র ধারায় চলছিল লেনদেন। বাড়তি কিছু পয়েন্ট নিয়ে সূচকও ছিল ঊর্ধ্বমুখী। সকাল ১০টায় লেনদেন শুরুর ২০ মিনিটে আগের দিনের থেকে ৩৬ পয়েন্ট বেড়ে ৬১৯২ পয়েন্টে ওঠে। কিছুটা ওঠানামা শেষে দুপুর ১২টায় ছিল ৬১৬৬ পয়েন্টে। এর পর হঠাৎ বিক্রির চাপে ছন্দপতন হয়। ফোর্সড সেল ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার চাপে ক্রমাগত দরপতনে পতন হয় সূচকের। দুপুর ১টায় বেশিরভাগ শেয়ার দর হারানোয় সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ৩৫ পয়েন্ট হারিয়ে নেমে আসে ৬১২১ পয়েন্টে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূচকের পতনও বাড়তে থাকে। দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের চেয়ে ৭৭ পয়েন্ট হারিয়ে ৬০৭৯ পয়েন্টে নামে, যা গত ১৮ মাসে সূচকের সর্বনিম্ন অবস্থান।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল ১০৭ কোম্পানির শেয়ারদর ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধশত কোম্পানির শেয়ার টানা দর হারাচ্ছে। জিএসপি ফাইন্যান্স এবং বিডি ফাইন্যান্সের শেয়ার টানা ষষ্ঠ দিনেও সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হয়েছে। জিএসপি ফাইন্যান্সের শেয়ারদর এর প্রত্যাহারকৃত ফ্লোর প্রাইস ৩০ টাকা ৩০ পয়সা থেকে কমে ১৬ টাকা ২০ পয়সায় এবং বিডি ফাইন্যান্সের দর ফ্লোর প্রাইস ৪৪ টাকা ১০ পয়সা থেকে কমে ২৩ টাকা ৬০ পয়সায় নেমেছে।
শীর্ষস্থানীয় একটি ব্রোকারেজ হাউজের একজন কর্মকর্তা বলেন, গত সপ্তাহের প্রথম তিনদিন বাজার ভালো আচরণ করলেও এর পর থেকে অনেক শেয়ার ক্রমাগত দর হারাচ্ছে। অনেক বিনিয়োগকারী আতঙ্কে শেয়ার বিক্রি করছেন। কিছু শেয়ারের দর অর্ধেক হয়েও ক্রেতা মিলছে না। এমনটি দেখে কিছু প্রতিষ্ঠান হয়তো অন্য যেসব শেয়ারে ক্রেতা রয়েছে, সেগুলো ফোর্সড সেল করছে।
সার্বিক লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সিরামিক খাতে সবচেয়ে বেশি দরপতন হয়েছে। এ খাতের পাঁচ কোম্পানির সবগুলোর বাজার মূলধন গড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ কমেছে। গতকাল প্রকৌশল খাতের বাজার মূলধন কমেছে ৫ দশমিক ২৮ শতাংশ। এ খাতের লেনদেন হওয়া ৪১ কোম্পানির মধ্যে ৩৩টির দর কমেছে। প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ বাজার মূলধন হারিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বস্ত্র খাত। গ্যাস স্বল্পতায় পুরোপুরি উৎপাদনে যেতে না পারা খাতটির ৫৩ কোম্পানি গতকাল দর হারিয়েছে। বিপরীতে বেড়েছে মাত্র ৩টির দর। ৪ দশমিক ২২ শতাংশ দরপতন নিয়ে ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত ছিল খাতওয়ারি দরপতনে চতুর্থ অবস্থানে। এ খাতের লেনদেন হওয়া ২২ কোম্পানির ২১টিরই দরপতন হয়েছে। অধিকাংশ শেয়ারের ক্রেতা ছিল না। এখনো ফ্লোর প্রাইস কার্যকর থাকা আইডিএলসিও ক্রেতাশূন্য ছিল। এছাড়া সেবা ও নির্মাণ, পাট, ভ্রমণ ও অবকাশ এবং বিবিধ খাতের ৩ থেকে পৌনে ৪ শতাংশ দরপতন হয়েছে।