বেড়েছে সংখ্যা বাড়েনি মান

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের কয়েকশ গজের মধ্যে আবাসিক হোটেল স্বপ্ন বিলাস, হোটেল রোজ হ্যাভেন, হোটেল পান্থপথ, এএসটিসি গেস্ট হাউজ, শাহজালাল গেস্ট হাউজসহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। অথচ পাঁচ বছর আগেও এসব ছিল না।

গ্রিন রোডের একটি ভবনেই রয়েছে হোটেল গ্রিন ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল গ্র্যান্ড সেলিম ও হোটেল মুনা ইন্টারন্যাশনাল। এগুলো আবাসিক হোটেল। ঢাকার পান্থপথ ও গ্রিন রোডে এ ধরনের শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে।

আবাসিক হোটেলের নাম শুনলেই মানুষের মাথায় আসে সাগরের পাড়ে বা পাহাড়ের চূড়ায় কোনো আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউজের কথা। পর্যটন এলাকার কথা নাহয় বাদই থাক। নানান কাজে রাজধানী ঢাকায় ও বিভিন্ন শহরে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। তাদের অনেকেই রাত্রিযাপন করে হোটেলে বা গেস্ট হাউজে।

ঢাকায়, বিশেষ করে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, হাসপাতাল এলাকার সড়কে, অলিগলিতে হাঁটলে চোখে পড়ে বিভিন্ন নামের আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউজ। যদিও এসব হোটেলের বেশিরভাগের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবে অনেক ভালো মানের আবাসিক হোটেলও রয়েছে। 

ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকায় আবাসিক হোটেল বেড়েছে। তবে বেশিরভাগই নিয়ম মেনে করা হয়নি। একটি ফ্লোর বা কয়েকটি রুম ভাড়া নিয়েও অনেক হোটেল পরিচালিত হচ্ছে। আর যারা নিয়ম মেনে হোটেল ব্যবসা করছেন, তারা বিপাকে পড়ছেন। মানুষ প্রয়োজনেই আবাসিক হোটেলগুলোতে রাত কাটায়। যারা নিম্ন আয়ের তারা খোঁজে সস্তা হোটেল, আর যারা অবস্থাপন্ন তারা একটু ভালো হোটেলে থাকার চেষ্টা করে। আবাসিক হোটেলে নিয়ম মানার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য মিশ্র।

বাংলাদেশ হোটেল ও গেস্ট হাউজ ওনার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জেমস বাবু হাজরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশেই নতুন নতুন হোটেল বা গেস্ট হাউজ হচ্ছে। আবার অনেকে ছেড়েও দিচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন বেড়েছে, মানুষ ঘুরতে ভালোবাসে। ফলে বিভিন্ন জায়গায় হোটেল ও গেস্ট হাউজ বাড়ছে।’

তিনি বলেন, ‘হোটেল ও গেস্ট হাউজের মালিকরা বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত। তাই সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া কঠিন। তাদের অ্যাসোসিয়েশনে প্রায় ৯০০ সদস্য রয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। সারা দেশে থাকার উপযোগী হোটেল ও গেস্ট হাউজের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি হবে। অলিগলির হোটেল বা গেস্ট হাউজ ধরলে এ সংখ্যা ২০-৩০ হাজার হতে পারে।’ জেমস বাবু বলেন, ‘সঠিক মনিটরিং নেই বলে মানহীন হোটেলের সংখ্যা বাড়ছে। সরকার যদি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ছাড়া বা কাগজপত্র ছাড়া অনুমোদন না দিত, তাহলে এত মানহীন হোটেল হতো না। বিভিন্ন সময়ে সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করলেও ফল শূন্যই।’ 

বাংলাদেশে কতগুলো আবাসিক হোটেল বা গেস্ট হাউজ রয়েছে এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ব্যবসায়ীরাও সঠিক সংখ্যা জানাতে পারেননি। ব্যবসায়ী ও সংগঠনের লোকজন বলছেন, সাধারণ মানের অথবা এক বা দুই তারকা হোটেলের অনুমোদন নিতে হয় সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে এবং ৩, ৪ ও ৫ তারকা হোটেলের অনুমোদন নিতে হয় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় থেকে।

মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮টি পাঁচ তারকা হোটেল আছে। এসবের ৮টি ঢাকায়। চার তারকা মানের হোটেল রয়েছে ৬টি, ঢাকায় একটি। তিন তারকা মানের হোটেল রয়েছে ২২টি, ঢাকায় ৯টি।

ঢাকা জেলা প্রশাসকের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৫টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালে নিবন্ধিত আবাসিক হোটেলের সংখ্যা ১৮৮। ২০২৩ সালে ২৪টি বেড়ে নিবন্ধিত আবাসিক হোটেলের সংখ্যা ২১২। নিবন্ধনের মেয়াদ ২ বছর। এই সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নিতে হয়। আর লাইসেন্সের মেয়াদ তিন বছর। প্রতি বছর তা নবায়ন করতে হয়। ২০২২ সালে লাইসেন্স করা আবাসিক হোটেলের সংখ্যা ১৪১। ২০২৩ সালে ৫টি বেড়ে এ সংখ্যা হয়েছে ১৪৬।

ঢাকার পান্থপথ, গ্রিন রোড, ফকিরাপুল, গাবতলী, কমলাপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের ওপরে ও অলিগলিতে আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে। কয়েকটি রুম নিয়ে অথবা একটি বা দুটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে চলছে আবাসিক হোটেল।  

বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মো. মহসিন হক হিমেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশেই আবাসিক হোটেলের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এসব হোটেলের কত শতাংশের সঠিক কাগজপত্র আছে এবং কতগুলো নিয়মকানুন মেনে চলছে, সে ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া দরকার। তারা সরকারের সব নিয়ম মেনে কাজ করেন। তাদের যে খরচ হয়, যারা মানে না তাদের খরচ তার চেয়ে অনেক কম। ফলে তাদের ক্ষতি হচ্ছে, আর সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘শুধু দেশের লোক নয়, অনেক বিদেশিও হোটেলে ওঠেন। তাদের নিরাপত্তার বিষয় রয়েছে। তাই যেসব হোটেল প্রপার ডকুমেন্টেশন বা লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত হচ্ছে, তাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট ধানম-ি ৩২ নম্বরে শোক দিবসের অনুষ্ঠানে হামলার পরিকল্পনা করে পান্থপথের ওলিও ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের একটি রুমে এক জঙ্গি অবস্থান নেয়। পুলিশ অভিযান চালালে আত্মঘাতী হয় সেই জঙ্গি। হোটেলটি এখনো রয়েছে, চুটিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে খবরে দেখা যায়, হোটেলে অনৈতিক কাজ করতে গিয়ে খুনোখুনি ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। এসব কারণেই নিরাপত্তার বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। 

হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের ম্যানেজার মো. হোসেন ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের এখানে জঙ্গি হামলার ঘটনার কথা তিনি শুনেছেন। এখন হোটেলটির মালিকানা বদল হয়েছে। এখন তাদের ১৪টি রুম রয়েছে। বোর্ডারদের বেশিরভাগ হাসপাতাল ও বাস কাউন্টারকেন্দ্রিক। অনেকে এসে এক রাতের জন্য থাকেন।

রাজধানীর পান্থপথ ও গ্রিন রোড এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালকেন্দ্রিক ছোট ছোট আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ গড়ে উঠেছে। সেখানে অন্তত ১০ জন হোটেল ব্যবসায়ী ও হোটেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা হয়। ম্যানেজাররা বলেন, তাদের ট্রেড লাইসেন্স ও টিন সার্টিফিকেট রয়েছে। অন্য কাগজ সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই।

পান্থপথের পশ্চিম রাজাবাজারের অ্যাকটিভ ফ্যামিলি গেস্ট হাউজের চেয়ারম্যান মো. আমির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালের রোগীর লোকজন বেশি হলেও অন্য লোকজনও আসে। এখানে রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তারা সরকারের অনুমতি নিয়ে চালাচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘ট্রেড লাইসেন্স, ডিসি অফিসের অনুমতি, হেল্থ সার্টিফিকেট, ফায়ার সার্ভিস সার্টিফিকেটসহ কিছু কাগজপত্র লাগে হোটেল চালু করার জন্য। এখন নিয়ম মেনে ব্যবসা করা অনেক কঠিন হয়ে গেছে, যে কারণে আমরা কম টাকায় রুম ভাড়া দিতে পারি না।’

অভিযোগের সুরে আমির বলেন, ‘এখানে বেশিরভাগ হোটেলের অনুমোদন নেই। অনেকে ১০-১২টা রুম নিয়ে হোটেল বলে ব্যবসা করছে। তারা ৫০০ টাকায় রুম ভাড়া দিলেও ক্ষতি নেই। কারণ তাদের খরচ অনেক কম।’ 

পশ্চিম পান্থপথের হোটেল ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল আবাসিকের ম্যানেজার স্বপন বণিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১০ বছর ধরে তারা হোটেল চালাচ্ছেন। তাদের ১১টা রুম। গ্রিন রোড ও পান্থপথে হাসপাতালকেন্দ্রিক আবাসিক হোটেল আছে শতাধিক।

তিন মাস ধরে উত্তর পান্থপথে ১০টি কক্ষ নিয়ে হোটেল রোজ হ্যাভেনের শুরু। এর ম্যানেজার মোহাম্মদ রানা বলেন, তাদের ট্রেড লাইসেন্স, টিন নম্বর রয়েছে। অন্য কাগজ সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেননি।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মো. মুনিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আবাসিক হোটেলের নিবন্ধন বা লাইসেন্সের বিষয়ে তারা মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলেছেন। সময় দিয়ে চিঠি ইস্যু করেছেন। শিগগির তারা অনুমোদনহীন আবাসিক হোটেলগুলোর বিষয়ে অভিযানে নামবেন।