চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালে প্রতিদিন অগ্নিদগ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিতে আসে গড়ে ৬০ জনেরও বেশি। ২০২২ সালে সীতাকু-ে একটি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকা-ের ভয়াবহতা এখনো নাড়িয়ে দেয় প্রতিটি নাগরিককে। অথচ চট্টগ্রামে নেই কেন্দ্রীয় বার্ন ইউনিট।
পোড়া রোগীদের চিকিৎসার এ সংকট মেটাতে চীনের অনুদানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিট হচ্ছে। এতে ব্যয় হবে ৩০৫ কোটি টাকা, এর প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থই অনুদান দেবে চীন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সম্প্রতি ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব চায়না এইড ১৫০ বেডেড বার্ন ইউনিট অ্যাট চট্টগ্রাম মেডিকেল হসপিটাল’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায় পরিকল্পনা কমিশনে। এ প্রকল্পের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা (পিইসি) হয়েছে গত ২১ জানুয়ারি। এ প্রকল্পের ৩০৫ কোটির মধ্যে ১৮১ কোটি টাকা অর্থাৎ ৬০ শতাংশ চীনের অনুদান, ১২৩ কোটি বা ৪০ শতাংশ অর্থায়ন বাংলাদেশ সরকারের।
প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম ও তার আশপাশ জেলাগুলোর প্রায় চার কোটি মানুষের পোড়া ও বিকৃত রোগের সাশ্রয়ী মূল্যের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এ বার্ন ইউনিট তৈরি হলে প্রায় ১ হাজার ৬৫ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে জানানো হয়েছে ডিপিপিতে। এ ছাড়া পোড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি করা এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০ জন অগ্নিদগ্ধ মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জায়গার অভাবে, ব্যবস্থাপনার অভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। এজন্য এই মেডিকেলে একটি বার্ন ইউনিট হওয়া খুবই জরুরি।’
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বার্ন ইউনিটের অবকাঠামো ছয়তলা ভবনটি সাততলা ভিত্তির ওপর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি চট্টগ্রাম মেডিকেলের নিজস্ব জমির ওপর হবে। এ বার্ন ইউনিটে ৩টি অপারেশন থিয়েটার, ১০টি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) ও ২৫টি হাইডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভাসূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের বেশ কিছু ব্যয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। বিশেষ করে বাজারদর কমিটির কোনো পর্যালোচনা ছাড়াই কয়েকটি খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে। এসব খাতের ব্যয় বাজারদর কমিটির পর্যালোচনার আলোকে ধরার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) দেখা যায়, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুধু শুল্ক (কাস্টমস ডিউটি) বাবদই খরচ হবে ৮০ কোটি টাকা, সিকিউরিটি সেবায় খরচ ১ কোটি ৫০ লাখ, ব্যক্তিগত আয়কর ১ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বার্ন ইউনিট করার আগে চীনা বিশেষজ্ঞ টিমের মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভ্যাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। এর জরিপের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। এসব ব্যয় কীসের ভিত্তিতে ধরা হয়েছে তার কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এসব খাতের ব্যয়ের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য বলেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়ের খাতে দেখা যায়, ৩০৫ কোটি টাকার প্রকল্পে ১১২ কোটি টাকাই ব্যয় হবে রোগীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে। আর রোগীদের জন্য যে অনাবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে সেটিতে ব্যয় হবে ১৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, সরকারি অর্থায়নের অংশে এমএসআর খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৮৯ লাখ, শুধু স্টেশনারি কেনা হবে ২ কোটি টাকার, কেমিক্যাল খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ লাখ টাকা। এসব নন-শিডিউল খাতে বাজারদর কমিটির সুপারিশ ছাড়াই ব্যয় ধরা হয়েছে।
বার্ন ইউনিটের জন্য বিভিন্ন সরঞ্জামাদি কেনা হবে। এতে ব্যয় হবে ২৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। বিভিন্ন কমিশন বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা, বিভিন্ন রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
গত শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে আইসিইউ উদ্বোধন করতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) ১৫০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের কাজ শিগগির শুরু হবে।
তিনি জানান, বার্ন ইউনিট গড়ে তোলার বিষয়টি প্রি-একনেক মিটিংয়ে তোলা হবে। ডিপিপি পাস হলেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। সবাই সাহায্য করলে দ্রুত বার্ন ইউনিটের কাজ শুরু হবে। পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট হলে চট্টগ্রামে আগুনে পোড়া রোগীরা উন্নত চিকিৎসা পাবে। এ বার্ন ইউনিটে অত্যাধুনিক আইসিইউ, এইচডিইউ ও ওটি সুবিধা থাকবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, চট্টগ্রামে দেশের বেশিরভাগ ভারী ও শিল্প, গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, শিপব্রেকিং ইয়ার্ড এবং কেমিক্যাল ডিপো অবস্থিত। সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর অবস্থিত হওয়ায় স্থানটিকে দুর্ঘটনাপ্রবণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় চার কোটি জনগোষ্ঠীর জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে সেবা গ্রহণ করা কঠিন।
অধিদপ্তরের ভাষ্য, বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে চীন সরকার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বার্ন ইউনিটের স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে ২০১৫ সালের ২৯ নভেম্বর সম্মতি জানায়। ২০১৬ সালে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সমাপ্তির পর বার্ন ইউনিট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দুই সরকারের মধ্যে ২০১৬ সালের অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীকালে প্রকল্পের লেটার অব এক্সচেঞ্জ ২০১৮ সালের ২৬ জুলাই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে স্বাক্ষরিত হয়। এ ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চীনা অনুদান সহায়তায় আলোচ্য প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিপিপিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় বার্ন ইউনিটের জন্য ৯ হাজার বর্গমিটারের একটি নতুন ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র সংগ্রহ করা হবে। চীনা কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন, নির্মাণ যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ও উপকরণ সরবরাহ, নির্মাণ সমন্বয়ের জন্য প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ প্রেরণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র সরবরাহ এবং প্রকল্প সমাপ্তির পর এক বছরের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে।
এ প্রকল্পে চুক্তি অনুযায়ী চীন সরকার শুধু অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তিতে নির্ধারিত খাত থেকে অনুদান সহায়তা দেবে। আর বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পের ডিজাইনের জন্য মৌলিক তথ্য সরবরাহ ও বিস্তারিত নকশা পরীক্ষা, জমি প্রদান, পরিবেশের প্রভাব মূল্যায়ন, প্রকল্প এলাকার স্থল ও ভূগর্ভস্থ বাধা অপসারণ, প্রকল্প শুরুর আগে সংযোগ সড়ক নির্মাণ, পানি সরবরাহ ও ড্রেনেজ পাইপলাইন, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ লাইনসহ বালি ও পাথর স্টকইয়ার্ড নির্মাণ, মাটি অপসারণের স্থান প্রদান, প্রকল্প সম্পর্কিত শুল্ক ও অন্যান্য কর প্রদান এবং প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয় বহন করবে।
প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে, গত বছর ২৫ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ‘প্রকল্প যাচাই কমিটি’র সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ডিপিপি প্রস্তাব করেছে।