বিএনপি যদি তাদের রাজনীতি চাঙ্গা করতে চায়, তাহলে তাদের নেতৃত্ব বদল করতে হবে। না হলে আগামী পাঁচ বছরও বিএনপিকে শিকলবাঁধা থাকতে হবে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর বিএনপিতে নেতৃত্ব বদলানোর মিশন নিয়ে যাত্রা শুরু করে আওয়ামী লীগ। এই লক্ষ্য পুরো সফল হয়নি ক্ষমতাসীনরা। নেতৃত্ব বদলিয়ে বিএনপি যদি শক্তিশালী দল হতে চায় তাহলে পাশে থাকবে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীনদের অন্দরমহল থেকেই এমন কথা শোনা যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাদের আগামী এক বছরের পরিকল্পনা হলো বিএনপির নেতৃত্বে বদল ঘটানো। এর উপযুক্ত সময় এখনই। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এই মতের সঙ্গে একমত না হলে আগামী পাঁচ বছরে দলটিকে মাঠে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না।’
তারা দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘তারেক জিয়ার নেতৃত্ব থেকে বিএনপিকে বের হতে হবে। তাদের তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে নেতৃত্ব বদলানোর দাবি উঠেছে।
তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরাই তাদের শক্তি। যেহেতু বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দলটির নেতৃত্বের সমালোচনা শুরু হয়েছে, তাই তাদের নেতৃত্ব বদলানোর সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে। আওয়ামী লীগ নতুন নেতৃত্বের বিএনপি চায়।’ আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মহলও তারেকের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে চায় না। ফলে নানা সুবিধা পাচ্ছে আওয়ামী লীগ। তারেকপ্রশ্নে বিদেশিদের অবস্থান আর আওয়ামী লীগের কৌশল তারেকের নেতৃত্বাধীন বিএনপিকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিলেও খুব একটা সমালোচিত হবেন না আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, সমালোচিত হবে না দল এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার।’
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা বলেন, ‘বিএনপিবিহীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারায় বিএনপির নেতৃত্ব বদলের পরিকল্পনা আরও পোক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে তারেকের হাত থেকে বিএনপিকে বের করে আনার সম্ভাবনা রয়েছে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির তৃণমূলের নেতারা রাজনীতির ব্যর্থতার জন্য শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়ী করা শুরু করেছেন। এটা নেতৃত্ব বদলেরই আওয়াজ। আমি মনে করি, বিএনপি নেতা তারেক রহমান ব্যর্থতার দায় নিয়ে দল থেকে সরে দাঁড়াবেন।’ মায়া বলেন, ‘বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতা অবশ্যই নেতৃত্বের ব্যর্থতা।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া দুজনই দণ্ডপ্রাপ্ত। জনগণ তাদের ওপর আস্থা হারিয়েছে অনেক আগেই। এখন বিএনপি নেতাকর্মীরাও আস্থা হারাতে বসেছে।’ তিনি বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা মনে করেন নির্বাচনে যাওয়া উচিত ছিল। তারেক জিয়া তাদের ইচ্ছার গুরুত্ব না দিয়ে নির্বাচন বর্জন ও ঠেকানোর চক্রান্ত করেছেন। ফলে নেতাকর্মীরা বর্তমান নেতৃত্বে অনাস্থা প্রকাশ করছেন। বিএনপির ভেতর থেকেই দাবি উঠবে নেতৃত্ব বদলানোর। বিএনপিতে অনেক বিচক্ষণ নেতা রয়েছেন, তারা নেতৃত্ব বদলানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে দলকে বাঁচাবেন।
নাম প্রকাশ না করে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর বিএনপির রাজনীতি আওয়ামী লীগের জন্য, দেশ ও জনগণের জন্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব থেকে দলটিকে বের করার চেষ্টা করা হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর সে সুযোগ এলেও রাতারাতি সফল হওয়া যায়নি। তবে অনেক দূর এগিয়েছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ১৫ বছরের চেষ্টায় বিএনপিকে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব থেকে বের করা হয়েছে। অসুস্থতা ও দুর্নীতির মামলায় দ-িত হয়ে শুধু নেতৃত্ব নয়, রাজনীতি থেকেই তাকে দূরে চলে যেতে হয়েছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বিএনপির নেতৃত্ব থেকে তারেকের চলে যাওয়ার পথ সহজ করেছে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, তারেক জিয়ার নেতৃত্ব থেকে বিএনপিকে বের করাই আওয়ামী লীগের অন্যতম লক্ষ্য। ক্ষমতার চলতি মেয়াদের প্রথম বছরেই আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে বিএনপির শীর্ষপর্যায়ে বিভিন্নভাবে বার্তা দেওয়া হবে তারেক জিয়ার নেতৃত্ব থেকে দলটিকে বের করার। দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে বলা হবে, রাজনীতিতে টিকতে হলে, রাজনীতি করতে হলে নেতৃত্ব বদল করতে হবে। না হলে তাদের বিলুপ্তির পথে হাঁটতে হবে। মনে রাখতে হবে, অনেক জনপ্রিয় দল বিলীন হয়ে গেছে। এটাই হবে ফাইনাল ওয়ার্নিং।
তারা বলেন, নির্বাচনের পরে বিএনপির তৃণমূলের নেতারা দলের ব্যর্থতার জন্য কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে দায়ী করে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। ধীরে ধীরে বিএনপির তৃণমূল শীর্ষ নেতাদের দোষত্রুটির ব্যাপারে সরব হবে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের ওপর হতাশা ভর করবে। নেতৃত্ব বদলের দাবি তখনই জমে উঠবে। তখন সুযোগ আসবে আওয়ামী লীগের হাতে। মাঠের রাজনীতিতে আরও দুর্বল করে কর্মীনির্ভর এই দলের কর্মীদের আরও হতাশ করার। আগামী পাঁচ বছরে আওয়ামী লীগ মাঠের রাজনীতিতে বিএনপিকে আরও দুর্বল করার কৌশলে চলবে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা এ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন হয় নিষ্ক্রিয় হবেন, না হয় দল ছেড়ে বিভিন্ন দলে যাবেন। তাদের দল না ছেড়ে নেতৃত্ব বদলানোর জন্য শীর্ষ নেতাদের চাপ দেওয়ার বার্তা দেওয়া হবে। নেতৃত্ব বদল করে বিএনপিতেই থেকে যাওয়ার কথা বলা হবে। এ ব্যাপারে সার্বিক সহায়তা জোগাবে আওয়ামী লীগ। তারেক জিয়াকে নেতৃত্বে রেখে রাজনীতিতে সফল হওয়ার সুযোগ নেই বিএনপির, এ বার্তা আরও স্পষ্ট করে তোলা হবে।