গাধার হাটবাজার

দেশে কোনো গাধা নেই, ছাগল বেড়েছে! গত ২৩ জানুয়ারি দৈনিক দেশ রূপান্তরের এই খবর প্রকাশিত হয়। খবরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয় চিড়িয়াখানা ছাড়া দেশে কোনো গাধা নেই। তবে প্রাণিসম্পদ বিভাগের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশে ভেড়া, গরু, ছাগল, মহিষসহ হাঁস-মুরগির সংখ্যা বাড়ছে।

এবার আসুন গাধা নিয়ে একটু খোঁজখবর চালানো যাক। বিবিসি ফিউচার জানাচ্ছে, মানব ইতিহাসে গাধার ভূমিকা খুঁজতে ৩৭টি গবেষণাগারের ৪৯ জন বিজ্ঞানীর একটি আন্তর্জাতিক দল জিনোম মডেলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা বিশ্বের ৩১টি প্রাচীন ও ২০৭টি আধুনিক গাধার জিনোম সিকোয়েন্স তৈরি করেছে। গাধাগুলো প্রথম বন্য গাধা থেকে গৃহপালিত হয়েছিল প্রায় ৭ হাজার বছর আগে কেনিয়া এবং হর্ন অব আফ্রিকায়, সম্ভবত যাজকদের মাধ্যমে। আধুনিক সব গাধাই এখান থেকেই উদ্ভূত হয়েছে। গবেষণা থেকে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ঘোড়ার আগে থেকেই গাধা মানুষের সঙ্গী ছিল। আধুনিক ঘোড়া, যা প্রায় ৪ হাজার ২০০ বছর আগে গৃহপালিত হয়েছিল, মানব ইতিহাসে বড় প্রভাব ফেলেছে। তবে গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, গাধা প্রভাব ফেলেছে আরও বেশি সময় ধরে।

ভার বহনে গাধার জুড়ি নেই। গাধার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো। যে পথ দিয়ে গাধা চলে, সেগুলো কখনো ভোলে না। পরিচিত একটি এলাকাকে গাধা প্রায় ২৫ বছর পর্যন্ত মনে রাখতে পারে। গরু, মহিষ ও ঘোড়াকে যতটা সহজে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা যায়, গাধাকে তা করা যায় না। যেমন সামনে কোথাও পানি আছে, গভীরতা না জেনেও ঘোড়া তার আরোহীর নির্দেশ মেনে পানিতে নেমে পড়বে। এই নির্দেশনা ঝুঁকিপূর্ণ কি না, ঘোড়া তা চিন্তাই করতে পারে না। কিন্তু গাধা পারে। গাধার জন্য বিপজ্জনক এমন কাজ করতে গাধাকে বাধ্য করা যায় না। গাধার পছন্দ-অপছন্দ খুব শক্ত। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে। যতই মারা হোক, এক চুলও সে নড়বে না। ধরা যাক ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে গাধার পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গাধা যদি এই ঝুঁকি টের পায়, আর কোনোভাবেই ওই ঢাল থেকে উঠবে না।

আবার পিঠে পছন্দের বা ক্ষমতার অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দিলে গাধা নড়বেও না। অন্ধভাবে অনুকরণ গাধার ধাতে নেই। নির্দেশ পালন করানোর জন্য গাধাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। গাধার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দারুণ। ঝুঁকি বুঝতে পারার ক্ষমতা তো আছেই। সঙ্গে আছে কৌতূহল। কোনো জায়গা বা দিকের প্রতি কৌতূহলী হয়ে উঠলে গাধা সেদিকেই যায়। কিছু দেখতে পেলে ঘুরেফিরে দেখতে আসে।

প্রাণীটির দীর্ঘস্থায়ী উপযোগিতা মানুষের যে পরিমাণ উপকারে এসেছে, সে হিসেবে ঘোড়া এবং কুকুরের তুলনায় এটি খুব কম মনোযোগই পেয়েছে। উপরন্তু, মানুষের রসিকতায় গাধা বেশ অসম্মানের শিকার। ষষ্ঠ শতাব্দীর প্রথম দিকে বিখ্যাত রোমান পণ্ডিত ডি সি ইসিডোর গাধাকে ‘অলস এবং বোকা’ বলেছেন। রোমান সময়ে যারা পড়তে ও লিখতে পারত না, তাদের গাধা হিসেবে উল্লেখ করা হতো। তারা বলত, ‘এই গাধা, তোমাকে কি শেখাব কীভাবে লিখতে-পড়তে হয়?’ রোমান সাম্রাজ্যের স্কুলে এই কথা খুব প্রচলিত ছিল। আসলে গাধা বোকা প্রাণী ধারণাটা এসেছে গাধার জেদ থেকে। গাধা খুব একরোখা। সহজে পোষ মানানো যায় না চারপেয়ে এই প্রাণীকে। গাধার কর্কশ স্বরে ডাকাডাকিও তার প্রতি মানুষের একরকম অবজ্ঞা তৈরি করে। তারপরও গাধাকে বোকা প্রাণী মনে করে মানুষ। কিন্তু ভালোমতো খেয়াল করলে গাধাকে বুদ্ধিমান প্রাণীই মনে হবে।

এই পর্যায়ে আমাদের খবরের শিরোনামটিকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও গাধার ঐতিহাসিক চরিত্রকে বিবেচনায় নিয়ে পাঠ করা যাক। দৃষ্টিভঙ্গিগত জায়গা থেকে মানুষ গাধাকে যে বোকামি, জেদ দিয়ে এবং কেবল ভারবাহী প্রাণী হিসেবে চিত্রায়িত করছে- তা কি মানুষের নিজের বেলাতেই খাটে না? ফলে দেশে প্রাণী হিসেবে গাধার সংখ্যা কমলেও মানুষের দৃষ্টিতে গাধা স্বভাবের মানুষের সংখ্যাই বাড়ছে কিনা সেটা একটা প্রশ্ন হতে পারে। দেশের মানুষগুলো দিন দিন গাধায় পরিণত হচ্ছে, অথবা গাধাকে মানুষ যেমন ভাবতে পছন্দ করে, গাধা তেমন না হলেও মানুষ তেমন রূপ বা স্বভাব অর্জন করছে। কিংবা মানুষগুলোকে তেমন হতে থাকতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমাদের মানুষগুলোর সামাজিক, রাজনৈতিক, মানসিক, চারিত্রিক উন্নয়ন ঘটছে না। বরং দিন দিন অবনতি ঘটছে। কোন কাজ করা যাবে, কোনটি করা যাবে না তা আমরা ভাবছি না। তাই তো আমরা গাধা।

ডিশের তারের বাধায় ২৩ জানুয়ারি মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ১৫ মিনিটের জন্য। এর আগে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের ফানুস মেট্রো রেলের লাইনে পড়ার কারণে প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে রেল চলাচল। তারও আগে মেট্রোর বৈদ্যুতিক লাইনে ঘুড়ি আটকে গেছে, বাড়ির ছাদের কাপড় উড়ে এসে পড়েছে মেট্রোর বৈদ্যুতিক তারে। আবার কেউ ঢিল ছুড়ে মেট্রোর কাচও ফাটিয়ে দিয়েছে। এ ঘটনাগুলো আমাদের জন্য উদ্বেগের। এতে ঘটতে পারত দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা মানে অনেক প্রাণের মৃত্যু। গাধা কিন্তু প্রাণী হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বা পথ মারাবে না। কিন্তু মেট্রো নিয়ে যারা বা যিনি এ কাজটি করেছেন তার মনোবৃত্তি ওই মানুষের কাছে যে গাধাসুলভ তারই প্রতিফলন। কারণ তিনি জানেন এতে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারপরও তিনি কাজটি করেছেন।

মেট্রো রেলের আরও কিছু অব্যবস্থাপনা এরই মধ্যে ঘটেছে। কোচের ভেতরে যাত্রীরা শৃঙ্খলা মানছেন না। কেউ দরজার কাচে হেলান দিয়ে দাঁড়াচ্ছেন, এতে ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। ওঠানামায় কেউ কাউকে সাইড দিতে চান না। প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য লিফট কিন্তু তা দখল করে থাকেন স্বাভাবিক মানুষগুলো। এই আচরণগুলো গাধা সংক্রান্ত গবেষণালব্ধ তথ্য বিশ্লেষণ করলে বলা যায় যে, গাধা এমন বিশৃঙ্খলা ও হঠকারিতা করে না, তা সে বুনো হোক কিংবা প্রশিক্ষিত কিন্তু মানুষ করে। মানুষের কি প্রশিক্ষণ দরকার? ব্রিটেনে মেট্রোতে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের সিট অনেক সময়ই খালি থাকে যদি না ওই কামরায় এ ধররের কোনো মানুষ না থাকেন। তাই বলে ব্রিটেনের সবাই কি শিক্ষিত? মোটেই তা নয়। তারা শিক্ষিত বা অশিক্ষিত হোক তারা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলেন। কিন্তু আমাদের অবাধ্য বাঙালিকে নির্দেশনা মানানো যায় না। আর যারা কর্তৃপক্ষ তারাও মানুষকে নিয়মের মধ্যে চলার পথ দেখান না। এতে গ্যাপ পূরণ হয় না।

কিছুদিন আগেও সারা দেশ কাঁপিয়েছে ডেঙ্গু রোগবাহী এডিস মশা। গত বছরের শুরুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। মৃত্যুর হার যখন বাড়তেই থাকে তখন সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্যোগগুলো হলো অভিযানে গিয়ে বাড়ির মালিকদের জরিমানা করা। আর টিভি ক্যামেরায় পোজ দেওয়া। কিন্তু এতে এডিস মশা আরও উৎসাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। হাজারের কোটা ছাড়ায় মৃত্যু, লাখ ছাড়ায় আক্রান্তের সংখ্যা। অথচ সিটি করপোরেশন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঘোষণা বিবৃতি ছাড়া আর মশা নিধনে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। এ কারণে ডিসেম্বর জানুয়ারি মাস ডেঙ্গু ছড়ানোর কথা না হলেও এখনো ডেঙ্গু রোগ ছড়াচ্ছে। এর কারণ হলো এডিস মশা নিধনে আসলে কার্যকর উদ্যোগ ছিল না। সিটি করপোরেশনের সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব আছে। ড্রেনের ময়লা পরিষ্কার করে সড়কে ফেলে। সেই ময়লা আবার বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে যাচ্ছে। কোথাও ম্যানহোলের ঢাকনা নেই মাসের পর মাস। কিন্তু ঠিক করার কোনো লোক নেই। সড়কের বাতি জ¦লে না। ঠিক হয় না। রাস্তা ভেঙে গেছে কয়েক বছর। কিন্তু মেরামত হয় না। অথচ এই কাজগুলো সিটি করপোরেশনের। আমাদের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ আসলে গাধার কাছে দায়িত্ব ও কর্তব্যপরায়ণতা শিখতে পারেন। কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারা আরেকটি বিষয় শিখতে পারি গাধার কাছ থেকে। নাগরিক নানা অব্যবস্থাপনা দিনের পর দিন চললেও সবকিছুই যেন আমরা মেনে নিই। গাধারা নিজের ক্ষতি করে এমন কিছু মেনে নেয় না, মারা হলেও সে ডুবে যাওয়ার ভয় থাকলে নদীতে নামবে না, পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা টের পেলে ঢাল বেয়ে উঠবে না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বহু দিন ধরে। এর মধ্যেই কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য আরও বাড়িয়ে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কমতে কমতে সিন্ডিকেট চক্র বাজার থেকে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সিন্ডিকেট যারা করেন এবং সরকারের যারা দাম কমাতে দেনদরবার করেন তাদের ধারণা দেশের সাধারণ মানুষ এই টেকনিকটা বোঝে না। তা না হলে সব সময়ই একই ফর্মুলাতে পণ্যের সিন্ডিকেট হয়। আবার কমে কী করে। ব্যবসায়ীরা দেশের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে পণ্যের দাম বাড়ায়। আসলে জিম্মি না, তারা জনগণকে বোকা ভাবে, মানুষ যেমন স্মার্ট গাধাকে বোকা ভাবে।

অনলাইনে বাহারি পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এসব বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে আমরা ঝুঁকে পড়ি পণ্যের প্রতি। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতারিত হতে হয় গ্রাহকদের। কিন্তু গ্রাহকরা প্রতারিত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা মেনে নেয়। মানুষ নিজে লোভে পড়ে ধোঁকা খেয়ে বোকা হয়েও বদলায় না, আবার একই ফাঁদে পা দেয়। কিন্তু গাধাকে লোভ দেখিয়ে, ধোঁকায় ফেলে বোকা বানানো পারতপক্ষে সম্ভব নয়, অন্তত গবেষণা তো তা-ই বলে।

লেখক : সাংবাদিক

zakpol74@gmail.com