মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগার লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিলেও মিয়ানমার সরকারের নানা টালবাহানায় আশ্রিতদের ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সময় যতই গড়াচ্ছে ততই রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারে বাড়ছে নানামুখী সংকট। প্রত্যাবাসন অনিশ্চয়তায় চরম হতাশায় রোহিঙ্গারাও। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট হয়েছে। মিয়ানমারে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যার প্রভাব বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যেও এসে পড়েছে। যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্তে পাঁচ স্কুল বন্ধ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে নিরাপত্তার কারণে সোমবার সীমান্তের পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এক দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। বন্ধ হওয়া এক স্কুলের শিক্ষক জানান, রবিবার সীমান্তের কাছে মিয়ানমারের সামান্য ভেতরে দুটি যুদ্ধ হেলিকপ্টার মহড়া চালানোকালে বেশ কয়েকটি বিকট শব্দের বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, বিদ্রোহীদের ওপর হামলা করার জন্য ওই হেলিকপ্টারের মহড়া। সচরাচর এ রকম যুদ্ধ হেলিকপ্টার সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি দেখা যায়নি। স্থানীয়রা জানান, মিয়ানমার সীমান্তের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি এবং আরসা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিয়ানমার জান্তা সরকারের গুলিবিনিময় হচ্ছে। সীমান্ত ঘেঁষে ওপারে কামানের গোলা নিক্ষেপে এপারের অভ্যন্তরে ছুটে আসায় সীমান্তের আশপাশে বসবাসরত লোকজন ও স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, মিয়ানমার-নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘেঁষে মিয়ানমার অংশে তিন দিনে অর্ধশতাধিক মর্টার শেলের প্রকট শব্দে ৪৭ ও ৪৮ নম্বর সীমান্ত পিলারসংলগ্ন বাংলাদেশ অংশ কেঁপে উঠেছে। এতে কেউ হতাহত না হলেও আতঙ্কে রয়েছেন সীমান্তে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহী দল আরাকান আর্মি তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে জান্তার বাহিনীকে। রাখাইনের রাজধানী শহর সিত্তের চারপাশের ঘাঁটিগুলো থেকে উচ্ছেদ হয়েছে জান্তার সেনারা। এ অবস্থায় মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সদস্যদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী ৭৫ বছর ধরে দেশটির কোথাও না কোথাও নিজ জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আছে। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গাদের হত্যা ও নির্যাতন শুরুর পর বাংলাদেশে তাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়। এর আগেও কয়েক দফায় বাংলাদেশে রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঘটে। এমনকি, ২০২২ সালে মিয়ানমারের জান্তাবাহিনী বাংলাদেশের দিকেও মর্টার ও গুলি ছুড়েছে। নিকট অতীতে অপর দেশ থেকে বাংলাদেশে মর্টার ছোড়ার নজির নেই। এ কারণে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহে বান্দরবান সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বাস্তব কারণ আছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় সৃষ্ট আতঙ্ক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এটা পরিষ্কার যে, শরণার্থী সংকট যত দীর্ঘায়িত হয়, সমাধানের সম্ভাবনা ততই সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের উচিত অত্যন্ত কৌশলী হয়ে আইন ও বাস্তবতার নিরিখে জোরেশোরে লবিং শুরু করা এবং মিয়ানমারকে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে বাধ্য করা। সশস্ত্র বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় সামরিক জান্তার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু এবারের গৃহযুদ্ধের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। প্রথমবারের মতো এ লড়াই অনেকটা জনযুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ভূ-রাজনীতির বিষয়াদি ছাড়াও মিয়ানমার ও রাখাইনে কী ঘটে, তাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় হচ্ছে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। এমতাবস্থায় সামরিক জান্তার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এনইউজি ও আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা দরকার বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে।