তাবলিগ ও ইজতেমার কাজে আলেমদের তত্ত্বাবধান জরুরি

শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। ইতিমধ্যে দেশ-বিদেশের তাবলিগের সাথীরা ময়দানে আসা শুরু করেছেন। ইজতেমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, দাওয়াতে তাবলিগের কাজের মাকসাদ এবং এসব কাজের নেতৃত্বে কেন আলেমদের প্রয়োজন- এসব বিষয়ে কথা বলেছেন জাতীয় দ্বীনি শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব, রামপুরা আফতাবনগর আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলুমের মুহতামিম মুফতি মোহাম্মদ আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- হাসান আল মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ কেন করতে হবে?

মুফতি মোহাম্মদ আলী : আল্লাহ তায়ালা কোরআনে কারিমে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলেছেন, ‘হে রাসুল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার কাছে যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দিন।’ -সুরা আল মায়েদা : ৬৭ আর হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে বলেছেন, ‘আমার একটি বাণী হলেও তোমরা পৌঁছে দাও।’ -সহিহ বোখারি : ৩৪৬১

আল্লাহ এবং তার প্রেরিত রাসুলের বাণী বাস্তবায়নে সাহাবায়ে কেরাম পৃথিবীর দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে মহাসত্যের এই বাণী পৌঁছে দেন। তাইতো দেখা যায়, লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে মাত্র অল্পসংখ্যক সাহাবির কবর মক্কা-মদিনায়। আর বাকি সাহাবিদের কবর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত। দাওয়াতের কাজে যে যেখানে ইন্তেকাল করেছেন তাকে সেখানেই দাফন করে দেওয়া হয়। সাহাবায়ে কেরামের এই ত্যাগ ও কোরবানির মাধ্যমেই সুদূর আরব থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের আলো পৌঁছেছে। সাহাবায়ে কেরামের পর তাবেয়িন, তাবে তাবেয়িন এবং তৎপরবর্তী আলেম-উলামা, মুমিন মুসলমানরা বিভিন্ন উপায়ে নানা পদ্ধতিতে এই দাওয়াত ও তাবলিগের আঞ্জাম দেন। এ জন্য, দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ করতে হয় উম্মতে মুহাম্মদীকে।

দেশ রূপান্তর : দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ কী?

মুফতি মোহাম্মদ আলী : দাওয়াত অর্থ আহ্বান করা। তাবলিগ অর্থ হচ্ছে, পৌঁছে দেওয়া। ইসলামের সৌন্দর্যের প্রতি মানুষকে আহ্বান জানানো এবং আল্লাহর একত্ববাদ ও রেসালাতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সৎকাজের আদেশ করা অসৎ কাজ থেকে বাধা দেওয়া। উম্মতে মুহাম্মদির বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হচ্ছে- এই দাওয়াত। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত। তোমাদের মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা মানুষদের সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অন্যায়মূলক কাজ থেকে বাধা প্রদান করবে এবং আল্লাহর ওপর ইমান আনবে।’ -সুরা আলে ইমরান : ১১০

দেশ রূপান্তর : বিশ্ব ইজতেমার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কী?

মুফতি মোহাম্মদ আলী : বিশ্বের আলেম-উলামাদের কাছ থেকে কোরআন-হাদিসের বয়ান শোনা ও তা বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়া। টঙ্গীর এবং অন্যান্য সমস্ত ইজতেমারও উদ্দেশ্য বেশি বেশি মানুষকে দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে উদ্বুদ্ধ করে জামাতে বের করানো।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ব ইজতেমা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

মুফতি মোহাম্মদ আলী : বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের মুসলমান একসঙ্গে হয়। এখানে বাদশা, আমির, ফকির সবাই সমান, সবাই আল্লাহর দাস। বিশ্ব ইজতেমা আমাদের সহিহ ইসলামের শিক্ষা দেয়, সহমর্মী হতে বলে। হককে হক জেনে আমল করা ও অন্যকে ইসলামের পথে নিয়ে আনার শিক্ষা দেয়। এ ছাড়া, ইজতেমাতে ইমান সংক্রান্ত কথা হয়, নবী-রাসুল (আ.) এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-দের ঘটনা বলে জামাতে বের হওয়ার তাকিদই বেশি দেওয়া হয়। দেখা যায় যে, সারা বছর মিলে যে পরিমাণ জামাত বের হয়, এক ইজতেমা থেকেই তার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি জামাত বের হয়।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ব ইজতেমায় কী খোরাক রয়েছে, যা মানুষ নিয়ে যেতে পারবে?

মুফতি মোহাম্মদ আলী : ইজতেমায় মানুষের আমলি জিন্দেগি সুন্দর করার জন্য বয়ান করা হয়। মানুষের আচার-আচরণ, লেনদেন ঠিক রাখার জন্য এটা কোরআন-হাদিসের পাঠশালা। মানুষের মাঝে দুনিয়াবিমুখতা তৈরি ও ঘরে-বাইরে দ্বীনি পরিবেশ বজায় রাখতে উদ্বুদ্ধ করে বিশ্ব ইজতেমা। সেই খোরাক নিয়ে মানুষ ফিরে বিশ্ব ইজতেমা থেকে।

দেশ রূপান্তর : বিশ্ব ইজতেমা ও তাবলিগের কাজ আলেমদের নেতৃত্বে হতে হবে কেন?

মুফতি মোহাম্মদ আলী : আল্লাহ ও তার রাসুল আলেমদের নানাভাবে সম্মানিত করেছেন। আলেমদের উম্মতের সবার ওপরে রেখেছেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আলেমরা নবীদের উত্তরাধিকারী।’ -সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৪১

নবীরা পৃথিবীতে নেই, এ জন্য নবীদের উত্তরাধিকারী হিসেবে মুসলিম সমাজের নানাবিধ সংকট মোকাবিলা করা আলেমদের দায়িত্ব। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মান্য করো, অনুসরণ করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্র্তৃত্বসম্পন্ন ব্যক্তি তাদের।’ - সুরা নিসা : ৫৯

তাই, শুধু বিশ্ব ইজতেমা ও তাবলিগের কাজ নয়, সব কাজেই আলেমদের নেতৃত্বের গুরুত্ব অপরিসীম। আলেমহীন যেকোনো কাজ- সেটা ইজতেমা হোক বা অন্য কিছু তা শয়তানের আখড়া।