ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আবার মুখোমুখি। তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর চাপে জো বাইডেন। তিনি কি সিদ্ধান্ত নেবেন ইরানে হামলার? লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
গত রবিবার জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়ে তিন সেনাকে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে। ইরাকভিত্তিক এ গোষ্ঠী ঘটনার দায় স্বীকার করেছে। হামলার জন্য ইরান-সমর্থিত জঙ্গিদের দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আক্রান্ত মার্কিন ঘাঁটিটি ইরাক ও সিরিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। আর ইরান এ হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবর, এ হামলার পর ইরানে পাল্টা হামলা চালানোর চাপ আসছে বাইডেনের ওপর। যদিও তার প্রশাসন বলেছে এ হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবে না। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, আমরা জবাব দেব আর সেই জবাব বহু স্তরের হতে পারে, পর্যায়ক্রমে আসবে আর সময়ের সঙ্গে চলতে থাকবে। তিনি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবেশ ততটা বিপজ্জনক যতটা এই অঞ্চলে আগেও ছিল। অন্তত ১৯৭৩ সাল থেকে।
ইরানের ওপর কেন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা চালাতে চায় না তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মোটামুটি একমত। আর সেটি হলো গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে। তখন অনেক শিবিরে লড়তে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।
দ্য গার্ডিয়ানের যুক্তরাষ্ট্র সম্পাদক সাইমন টিসডল যেমন বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে বিস্ফোরণের অপেক্ষায় রয়েছে একটি মেগা-বোমা’।
যে প্রেক্ষাপটে
অভিযুক্ত ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি নিপীড়নের কারণে এ হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি ইরাক ও সিরিয়ায় অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের হটানোও তাদের লক্ষ্য।
গত ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলে হামলা চালায়। যার প্রতিক্রিয়ায় গাজায় যুদ্ধ পরিচালনা করে যাচ্ছে ইসরায়েল। এ পর্যন্ত ২৬ হাজারেরও বেশি গাজাবাসী নিহত হয়েছে তাদের হামলায়। মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। হুতিরা আটকে দিয়েছে লোহিত সাগরের বাণিজ্য। সেখানেও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা হামলা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকেও। যেমন ইরাক ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ওপর অন্তত ২০টি হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানি সহযোগীদের অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। তবে এসব হামলার কোনোটি ‘জঙ্গিদের’ দমন করতে পারেনি। উল্টো ইরান-সমর্থিত বলে অভিযুক্ত এসব গোষ্ঠীর ১৬৫টি হামলায় অক্টোবর থেকে ১২০-এরও বেশি মার্কিন সেনা সদস্য আহত হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মার্ক হার্টলিং এ বিষয়ে সিএনএনকে বলেন, মার্কিন সেনা সদস্যদের মৃত্যু অবশ্যই প্রেসিডেন্টের জন্য লালরেখা অতিক্রম করেছে।
তিনি আরও শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া আশা করছেন, তবে পরামর্শ দিয়েছেন ইরানের ভেতরে মার্কিন হামলার সম্ভাবনা কম।
সিএনএন জানাচ্ছে, বিকল্প হিসেবে বাইডেন প্রশাসন ইরাক, সিরিয়া বা উভয় দেশে ‘জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে’ আবার আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা আঞ্চলিক মিলিশিয়াদের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। সিএনএন উদাহরণ হিসেবে জানায়, চলতি বছর জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ইরাকের বাগদাদের পূর্বাঞ্চলে ইরানপন্থি একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীর কার্যালয়ে ড্রোন হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে চার যোদ্ধা নিহত ও অপর ছয়জন আহত হয়। যাদের একজন ছিল গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
পরিকল্পিত না ভুল
টাওয়ার ২২ ইরাক এবং সিরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি জর্ডানের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত একটি ছোট মার্কিন লজিস্টিক ফাঁড়ি। এ ফাঁড়ি সম্পর্কে সীমিত তথ্য পাওয়া যায়। টাওয়ার ২২ সিরিয়ার সীমান্তের ওপারে অবস্থিত আল-তানফের নিকটবর্তী মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কমপক্ষে ৩৫০ মার্কিন সেনা এবং বিমানবাহিনীর সেনারা সেখানে অবস্থান করছে। ফাঁড়িতে কী ধরনের অস্ত্র রাখা হয় এবং বায়ু প্রতিরক্ষার ধরন কী তা স্পষ্ট নয়। ২০১১ সালে সিরিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পর সিরিয়া ও ইরাক থেকে সশস্ত্র যোদ্ধাদের অনুপ্রবেশ রোধ করতে ওয়াশিংটন সীমান্ত নিরাপত্তা কর্মসূচি নামে পরিচিত একটি নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করে। বর্তমানে প্রায় ২৫০০ মার্কিন সেনা ইরাকে অবস্থান করছে এবং উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় মোতায়েন রয়েছে ৯০০।
একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে এখন পর্যন্ত এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে ইরান এ হামলার নির্দেশ দিয়েছে বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, আমি মনে করি না এটি শত্রুতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। একই ধরনের আক্রমণ তারা আগে ১৬৩ বার করেছে এবং ১৬৪-তে তারা ভাগ্যবান হয়েছে। পেন্টাগনের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি সাবরিনা সিং সোমবার এক ব্রিফিংয়ে বলেন, আমরা জানি এ গোষ্ঠীগুলো ইরান সমর্থিত।
সাইমন টিসডল তার কলামে বলেছেন, ইরান যদিও দাবি করছে তারা এ হামলার জন্য দায়ী নয়, তবে ওয়াশিংটনে খুব কম লোকই তাদের এ ধরনের বিবৃতিকে বিশ্বাস করে।
এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস আছে ইরানের। ইরানের এ নীতি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডের আল-কুদস ফোর্সের জেনারেল কাসেম সুলেইমানি প্রবর্তন করেছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ড্রোন হামলায় হত্যা করে। ইরানের দীর্ঘদিনের কৌশলগত লক্ষ্য হলো ইরাক, সিরিয়া এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের ঘাঁটি থেকে আমেরিকান সৈন্যদের তাড়িয়ে দেওয়া। তেহরান যেসব অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, সেখানে মার্কিন উপস্থিতি তারা বরদাস্ত করবে না। গত ৭ অক্টোবরের ভয়ংকর হামলা এবং মার্কিন-সমর্থিত ইসরায়েলের ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া সেই উদ্দেশ্যকে এগিয়ে নেওয়ার একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ দিয়েছে (ইরানকে)।
তিনি বলেছেন, তবে জর্ডানে হামলাটি ইরান এবং তার স্থানীয় মিত্র ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মিলিশিয়ার ইচ্ছাকৃত ছিল কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। এটি নিছক আরেকটি এলোমেলো ড্রোন আক্রমণ হতে পারে, যা অপ্রত্যাশিতভাবে সফল ছিল। অন্য কথায়, এটা সম্ভব যে, ইরান অথবা তার মিত্ররা ভুল করেছে। তার মতে, বাইডেন প্রশাসন এর সর্বোচ্চ প্রতিক্রিয়া দেখাবে। বাইডেনের উপদেষ্টারা যুক্তি দিয়েছেন যে, ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না। কারণ তারা জানে এর জন্য অনেক মূল্য দিতে হবে।
জর্ডানের ওই মার্কিন সামরিক চৌকিতে হামলা থামাতে যুক্তরাষ্ট্র কেন ব্যর্থ হয়েছে তার একটি কারণ জানাচ্ছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। সেখানে তাদের প্রতিবেদক এরিক স্মিথ লেখেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই ড্রোন হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে কারণ সশস্ত্র গোষ্ঠীর ড্রোনটি যখন লক্ষ্যবস্তুর কাছে পৌঁছায় তখন আরেকটি মার্কিন ড্রোন ঘাঁটিতে ফিরছিল। দুই মার্কিন কর্মকর্তা তাকে এ তথ্য দেন।
মেগা বোমা
সাইমন টিসডল বলছেন, বাইডেন ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে ভুল করেছিলেন। নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেওয়ার জন্য তিনি জনসমক্ষে হাজির হয়েছিলেন। এখন তিনি যদি আবার ভুল করেন তাহলে আরও ভয়ানক প্রভাব পড়বে। ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র সামরিক প্রতিশোধ নিলে তা বিপর্যয়ের হবে। এটি গাজা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করে তাহলে এটি প্রায় নিশ্চিত যে, ইসরায়েলের ওপর সর্বাত্মক হিজবুল্লাহ আক্রমণ শুরু হবে। এটি ইরাক ও সিরিয়াকে ভয়াবহ নরকে পরিণত করতে পারে এবং মিসর, জর্ডান এবং উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ সরকারগুলাকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ এলাকায় গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন সংঘাত দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লেবাননে ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘর্ষ, ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহী ও পশ্চিমা মিত্র শক্তিগুলোর মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা; ইরাক, সিরিয়া এবং পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে ইরানের অভিযান এবং ইরানপন্থি কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা।
তাদের মতে, সংঘাতের একাধিক উৎসের কারণে শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, এগুলো আসলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে দেবে কি না এবং প্রথাগত আঞ্চলিক ক্ষমতাধর জোটের পরিবর্তন ঘটাবে কি না। একদিকে আরব বিশ্ব ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব। আর শিয়া ও সুন্নিদের দ্বন্দ্ব, যে নেতৃত্বে আছে ইরান ও সৌদি আরব। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এ দুই ধারার দ্বন্দ্ব গুরুত্বপূর্ণ।
বিবিসি বাংলা জানায়, গত ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি আরব এবং ইরান প্রকাশ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রেখেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ একে ‘নব্য মধ্যপ্রাচ্য স্নায়ুযুদ্ধ’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।
তবে...
কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা বলেছেন, বাইডেন আবার নির্বাচিত হওয়ার আশায় মার্কিন খ্যাতি বলি দিচ্ছে। জো বাইডেন ফিলিস্তিনিদের নির্বিচারে গণহত্যা এবং হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জীবন ধ্বংসের অনুমতি দিচ্ছেন, যাতে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হতে পারেন।
তিনি বলেন, যখন ইউক্রেন আক্রমণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং জার্মানির মতো দেশগুলো রাশিয়াকে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করেছিল। তারা ইউক্রেনকে সমর্থন ও সহায়তা করেছিল। কিন্তু যখন ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধের কথা আসে, তখন তারা পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। ইসরায়েলে অস্ত্র দিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অপরাধের পক্ষে ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছে, যুদ্ধবিরতি প্রতিরোধ করেছে এবং তাদের নিজস্ব মানবতার কথা ভুলে গেছে।