দূর থেকে হার্টে রিং পরানোর পথ খুলল

এবার ক্যাথল্যাবের (অস্ত্রোপচার কক্ষ) বাইরে থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত রোবট দিয়ে দুই হৃদরোগীর হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে সফলভাবে রিং পরালেন জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা। এর আগে গত ২১ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো দুজন রোগীর প্রধান ধমনিতে রোবট দিয়ে রিং পরানোর ইতিহাস গড়েন এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা। কিন্তু দূরে থেকে রোবট দিয়ে রিং পরানোর সফল ইতিহাস এটিই প্রথম।

চিকিৎসকরা জানান, গত ২৮ জানুয়ারি ৫৫ বছর বয়সী হারুন উর রশিদ ও ৪৫ বছর বয়সী লিটন কর্মকারের হার্টের মূল রক্তনালিতে ৯০ শতাংশ ব্লক ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের পরামর্শে দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিনামূল্যে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর ধমনিতে রিং স্থাপন করার প্রস্তাবে সাড়া দেয় রোগী ও রোগীর স্বজনরা। পরে সেদিনই দূর থেকে রোবটের মাধ্যমে রিং পরান হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার ও তার দল।

এর ফলে এখন থেকে রোবট দিয়ে দেশের যে কোনো প্রান্তে অবস্থিত ক্যাথল্যাবে থাকা রোগীর হার্টে রিং পরানোর সুযোগ তৈরি হলো। রোবট এনজিওপ্লাস্টি ব্যবস্থা চালু হলে রোগীদের আর এই চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে আসতে হবে না। কিংবা সার্জনকে ছুটতে হবে না রোগীর হাসপাতালে। শুধু রোবটের একটি হাত বা একটি অংশ পাঠিয়ে দিলে ঢাকা থেকেই নির্বিঘ্নে হার্টে রিং পড়ানো যাবে।

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার দেশ রূপান্তরকে জানান, রোগী ও রোবটিক টিম ছিল হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার ক্যাথল্যাবে। তিনি হাসপাতালের ৮ম তলার কনফারেন্স রুমে স্থাপিত রোবটিক কন্ট্রোল ইউনিটের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে দুই রোগীর হার্টে সফলভাবে রিং পরান। অস্ত্রোপচার উদ্বোধন ও প্রত্যক্ষ করেন হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান মিলনসহ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। দুই রোগী বর্তমানে ভালো আছেন এবং শিগগির তাদের ছুটি দেওয়া হবে। 

ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অত্যাধুনিক দূরনিয়ন্ত্রিত বা অপারেশন থিয়েটারের (ক্যাথল্যাব) দূর থেকে রোবটের মাধ্যমে হার্টে রিং পরানোর মাধ্যমে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এশিয়া মহাদেশে তৃতীয় দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। এর আগে ভারত ও চীনে এই ধরনের অস্ত্রোপচার হয়েছে।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানান, দূর নিয়ন্ত্রিত রোবটিক এনজিওপ্লাস্টির এই প্রক্রিয়ায় রোবটের একটি হাত থাকে ক্যাথল্যাবে। আরেকটি থাকে কন্ট্রোল সেকশনে, যা মূল কার্ডিওলজিস্ট নিয়ন্ত্রণ করেন। সেখানে ৩টি মনিটর থাকে। একটি দিয়ে রিং পরানো প্রক্রিয়া ও সময় প্রত্যক্ষ করা হয়। দ্বিতীয় মনিটর দিয়ে রোগীর ব্লাড প্রেসার, পালস, অক্সিজেন স্যাচুরেশন ও ইসিজি দেখার মাধ্যমে রিং পরানোকালে রোগীর শারীরিক অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

তৃতীয় মনিটর দিয়ে ক্যাথল্যাবে অবস্থিত রোবটিক টিমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করা হয়।

এর আগে গত ২১ জানুয়ারি ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার ও তার বিশেষায়িত টিম হৃদরোগ আক্রান্ত দুজন রোগীর প্রধান ধমনিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রোবট দিয়ে রং পড়ানোর ইতিহাস গড়েন। তখন রোগী ছিল ক্যাথল্যাবে ও ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার ছিলেন একই তলার কন্ট্রোল রুমে।

এ ব্যাপারে ডা. প্রদীপ কুমার কর্মকার বলেন, প্রথমবার ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সার্জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ রোগী ছিল ভেতরে, আমরা ছিলাম বাইরে কন্ট্রোল রুমে। এরপর আমরা ওয়্যারলেস ছাড়াই করলাম। আমাদের লক্ষ্য হলো হাসপাতালের বাইরে থেকে কন্ট্রোল ইউনিট নিয়ে এনজিওপ্লাস্টি করা। এক্ষেত্রে আমরা হাসপাতালে থেকে রোবট দিয়ে দেশের যে কোনো প্রান্তে রিং পরাতে পারব। দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো অত্যাধুনিক এই চিকিৎসা প্রযুক্তি চালু হলে রোগীকে আর দেশের বাইরে যেতে হবে না বা চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছোটাছুটি করতে হবে না।