কিছু দিন আগে মেট্রোরেলে নারী বগিতে কয়েকজন পুরুষ উঠে পরায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কেউ কেউ সেদিনের ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে বিষোদগার করেছেন এবং পরবর্তীতে না উঠার অনুরোধ করেছেন। আবার অনেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণও করেছেন। সম্প্রতি ওই নারী বগিতেই বাচ্চা কোলে নিয়ে পুরুষেরা উঠে পড়ছেন এবং এ বিষয়টি নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাচ্চা কোলে থাকলেই কি তারা নারী বগিতে উঠতে পারবেন? কেউ কেউ বলছেন, সম-অধিকারের দেশে এই বৈষম্য কেন? সমান অধিকার আন্দোলন কি শেষ? আবার কেউ বলছেন, মহিলা কোচে পুরুষ প্রবেশ অনুমতি নেই। এটা অপরাধ।
সম্প্রতি ফেসবুকের একটি কমিউনিটি গ্রুপে নাদিরা আনজুম মিমি নামের এক মেট্রোরেল যাত্রী লিখেছেন, 'গতকাল আর আজ এই দুইদিন মেট্রোতে পরপর একটা ঘটনা ঘটলো। সাধারণত একটা বগি নারীদের জন্য রিজার্ভড। এখানে মাঝে সাঝে বড় জোর স্কুলগামী ছোট বাচ্চা ছেলে ওঠে, তাও মায়েদের সঙ্গে। কিন্তু গত দুদিন সন্ধ্যায় আমি আমাদের ঢাবি ক্যাম্পাসের স্টেশন থেকে মেট্রোতে উঠলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখি। এই বগিতে দুজন ভাইয়া উঠেন এবং মজার ব্যাপার হলো তারা দুজনই একই কারণ দেখিয়ে এই বগিতে উঠেন। দুজনেই বাচ্চা কোলে নিয়ে উঠলেন। তাই আমরা নারীরা যাদের মাতৃত্ববোধ সহজাতভাবেই একটু প্রবল তারা এই বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা না বলেই তাদের উঠতে দিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই এক লোক ভুলবশত উঠতে নিলে তাকে বলা হলো এটা নারীদের বগি সুতরাং তিনি যেন না ওঠেন। আর এনারা যেহেতু বাচ্চা নিয়ে উঠেছেন এখানে মানবকিতার একটা ব্যাপার থাকেই। তবে যেহেতু তাদের সঙ্গে স্ত্রী ছিলেন সুতরাং বাচ্চাকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে অন্য বগিতে যেতেই পারতেন।'
মিমি লিখেছেন, 'আমি এই বিষয়টায় মানবিকতা কিংবা মাতৃত্বের অনুভূতি দেখাতে পারছি না। কারণ হলো তিনি তার বাচ্চাকে এখানে নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য জাস্ট ইউজ করেছে। তাছাড়া, প্রত্যেকে এমন ফ্যামিলিসহ উঠতে নিলে প্রতিদিন একটু একটু করে এই নিয়ম ভেঙে নারীদের জন্য বরাদ্দকৃত এই বগিটাও জেনারেল বগি হয়ে যাবে। এমনিতেই নারী বগিতে যায়গা না থাকলে জেনারেল বগিতে মেয়েদের বেশ গাদাগাদি করে অস্বস্তিকর অনুভূতি নিয়ে গন্তব্যে যেতে হয়। মেট্রো বগিতে লেখা নির্দেশিকায় বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, অসুস্থদের জন্য যায়গা ছাড়তে বলা হলেও এমনটা দেখা যায় না। তবে হ্যা! কিছু ভালো মানুষও থাকেন যারা নিজেদের পারিবারিক শিক্ষা ও ব্যক্তিত্বের সুন্দর চর্চায় এই বিষয়গুলো সর্বদাই খেয়াল রাখেন।'
মেট্রোরেলের অন্যান্য নারী যাত্রীদের উদ্দেশ্যে মিমি আরও লিখেছেন, 'আপুরা/আন্টিরা আপনারা এ ধরনের বিষয়গুলো কাইন্ডলি এলাউ করবেন না। ক্ষীপ্ত না হয়ে সুন্দর করেই না হয় বুঝিয়ে বলুন। তবুও এটা অহরহ ঘটতে দিয়েন না।' পাশাপাশি তিনি পুরুষ যাত্রীদের উদ্দেশ্যেও বলেছেন। তিনি বলেছেন, 'আর ওইসব ভাইয়াদের/চাচাদের বলছি, এভাবে ছলেবলে উঠে কোণঠাসা হয়ে থাকতে তো আত্মসম্মানবোধে লাগবার কথা!'
সেখানে রেজাউল করিম নামের এক মেট্রো যাত্রী কমেন্ট করেছেন, 'সম-অধিকারের দেশে এই বৈষম্য কেন? পুরুষের জন্যও কি রয়েছে আলাদা বগি যেখানে মহিলারা উঠতে পারবে না?' তাসনিম ফারিয়া মিতুল লিখেছেন, 'কমপ্লেন করার নিয়ম আছে।' রুহুল আমিন খান মৃদুল লিখেছেন, 'জেনারেল বগিতে নারী এলাউড। মহিলা বগিতে পুরুষ এলাউড না। হাজবেন্ড সাথে থাকলে জেনারেল বগিতে গেলেই পারে। বাচ্চা সাথে থাকলে জেনারেল বগিতেও মহিলাকে সিট ছেড়ে দেওয়ার কথা ভদ্র ঘরের যেকোনো পুরুষের।'
কামরানা শাহেদ প্রান্ত লিখেছেন, 'সব জায়গায় নারী পুরুষ সমান অধিকার নিয়ে আন্দোলন হয়। চাকরির ক্ষেত্রে পুরুষের ক্ষেত্রে নারীরা বেশি অগ্রাধিকার পায় কিন্তু সংসার চালানোর সময় পুরুষের টাকাই বেশি খরচ হয়। আর মেট্রোরেলে যদি নারী বগি আলাদাই হয় তাহলে পুরুষ বগি গুলাই নারীরা উঠবে কেনো। অধিকারটা অধিকারের জায়গায় থাকা উত্তম কিন্তু অধিকার যখন জোরজবরদস্তির মদ্ধে পরে যাই তখন সেটা ভয়াবহ রুপ নেয় যেমন টা বর্তমানে প্রকাশ পায় কিছু অশ্লীল আন্দোলনে। সর্বপরি আমি নারীদের অধিকারের বিরুদ্ধে যাই না কখনো কিন্তু এই সমাজে নারীদের অধিকারের মদ্ধে পরে পুরুষের অধিকার প্রায় বিলুপ্তএই হয়ে যাচ্ছে।'
মজা করে মো. মুরাদ উদ্দিন লিখেছেন, 'শাহবাগে একটা সম্মেলন দেওয়া দরকার মেট্রোরেল যাতে সরকার বন্ধ করে দেয়। বন্ধ করে দিলে না থাকবে কোনো বগি, না থাকবে কোনো সমস্যা।' আব্দুল রহিম অনিক লিখেছেন, 'যারা শরীফ থেকে শরীফা হয়ে যাচ্ছে তারা কি নারী বগি তে উঠতে পারবে না? জেনারেল বগিতে তাদের ও খুব অস্বস্তি লাগে। গুটি কয়েক পুরুষ যারা নারী বগিতে উঠেন তারা আসলে পুরুষ না তারা শরীফা তাদের বুকে টেনে নেন তারা আপনাদের জাতি বোন।' আহাদুল তাওয়ালি লিখেছেন, 'ওনারা হলো শরিফ যে নিজেকে শরীফা মনে করে।' শিবলি নোমান লিখেছেন, 'তারা মনে মনে নারী।'
শামীম হোসেন লিখেছেন, 'যেই আপুটা অন্য সময়ে বিদ্রোহী, তিনিই আবার সাথে স্বামী/বয়ফ্রেন্ড থাকলে এসব মানেন না।' ইমন সাজি লিখেছেন, 'আপনাদের এসব ব্যবহারের কারনে মেয়েদের সিট ছেড়ে দেওয়া বাদ দিয়ে দিয়েছি। দিবোও না আর কখনো যতোদিন বেঁচে আছি।' আব্দুল্লাহ আল কাফি লিখেছেন, 'আরে ভাই, এইডা নিয়ে গ্যাঞ্জাম করার কি আছে। বেচারা ভুলে উইঠা গেছে মনে হয় রাগ হইয়েন না থাক। হাজারে এমন দুই একটা ঘটনা ঘটে। বাচ্চার কথা চিন্তা কইরা মনে হয় উঠছে। গ্যাঞ্জাম না কইরা বগি থেকে বগিতে তো গেট আছেই বুঝিয়ে বললে চলে যাবে।' গোলাম কিবরিয়া ফফসাল ভূঁইয়া লিখেছেন, 'ওই পুরুষগুলো ব্যক্তিত্বহীন। তারা মহিলাদের কথায় উঠে ও বসে, তাই স্ত্রীর সাথে মহিলাদের বগিতে উঠেছে। ব্যক্তিত্ববান হলে সে জেনারেল বগিতে উঠতো স্ত্রীকে নিয়ে।'
তবে কাজী মোহাম্মদ ইয়াসিন লিখেছেন, 'মহিলা কোচে পুরুষ প্রবেশ অনুমতি নেই। এটা অপরাধ।' সাদাত সেলিম লিখেছেন, 'নারীদের সম্মান করুন- এই শিক্ষাটা মনে হয় অনেক পুরুষকেই তাদের পরিবার ও গুরুজনেরা দেয় নাই অথবা তারা এই শিক্ষাটা গ্রহণ করতে পারেন নাই। আপনি প্রতিদিন শুধু একবার ভাবুন যে আপনার মা /বোন/ স্ত্রী অথবা মেয়ে একা একা প্রতিদিন বাস অথবা মেট্রোতে যাতায়াত করছে। আশা করি এই ভাবনাটা আপনাকে নারীর প্রতি সম্মান করতে উৎসাহিত করবে।'