জাতীয় দলে নিয়মিতরাই বিপিএলে ব্যর্থ

নাজমুল হোসেন শান্ত, সবশেষ আন্তর্জাতিক সিরিজে তিন সংস্করণেই ছিলেন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক। একটা সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে হতো বিদ্রুপ, ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে তার অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীনকেও দিতে হয়েছিল অনেক প্রশ্নের জবাব। রানের ভাষায় সব প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে শান্ত সেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের এবং পরে বিপিএলে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হয়েছিল যা তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই সঙ্গে বন্ধ হয় সমালোচকদের মুখও। কিন্তু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের পরের মৌসুম এসে শান্ত যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন সেই আগের দিনগুলোর কথা। হতাশ করছেন লিটন দাসও। আগামী দিনে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ব্যাটিংটা আবর্তিত হবে যাদের ঘিরে, বিপিএলে তারা দেশের মাটিতেই খেলতে পারছেন না অনামি সব বোলারদের। পাচ্ছেন না রান, বিলিয়ে দিয়ে আসছেন উইকেট।

বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলে স্ট্রাইকার হিসেবে যারা খেলেন, তাদের একটা অনুযোগ সব সময়ের। ক্লাবগুলোতে বিদেশি স্ট্রাইকার খেলানোর কারণে তারা পর্যাপ্ত সুযোগ পান না খেলার। একটা সময় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও অনেকে এই অনুযোগ করতেন যে বিপিএলে বিদেশি ক্রিকেটারদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, ১২০ বলের খেলায় স্থানীয় ক্রিকেটাররা পর্যাপ্ত সুযোগ পান না। নাজমুল হোসেন শান্ত এবং লিটন দাসের এই ধরনের অজুহাত দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সিলেট স্ট্রাইকার্সের হয়ে ৫ ম্যাচ খেলা শান্ত সবগুলো ম্যাচেই নেমেছেন উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে। সব মিলিয়ে তার রান ৬৯, স্ট্রাইক রেট ৯৪.৫২ আর সর্বোচ্চ ইনিংস ৩৬ রানের। উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে পাওয়ার-প্লে’র ওভারগুলোতে ব্যাট করা একজন ব্যাটসম্যানের জন্য এই পরিসংখ্যান রীতিমতো লজ্জাজনক। বিশেষ করে সবশেষ টি-টোয়েন্টি সিরিজে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করা শান্ত, যাকে সাকিব আল হাসানের পর আগামীতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের তিন সংস্করণেই অধিনায়ক মনে করা হচ্ছে তার পাশে এই পরিসংখ্যান একদমই বেমানান। শান্ত খারাপ করেছেন, তার দল সিলেট স্ট্রাইকার্সও হেরেছে টানা ৫ ম্যাচ এবং প্লে-অফের সঙ্গে গতবারের রানার্সআপদের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। গেল আসরে শান্ত ছিলেন সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, দল সিলেটও সবার আগে নিশ্চিত করেছিল ফাইনাল। এবার শান্ত এবং দল পুরোই উলটো রথে।

লিটন দাস খেলছেন বিদেশি তারকায় ঠাসা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসে। এখন পর্যন্ত খেলেছেন ৪ ম্যাচ, সব ম্যাচেই ইনিংসের সূচনায় নেমেছিলেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। অন্যপ্রান্তে প্রথমে পেয়েছিলেন অভিজ্ঞ ইমরুল কায়েসকে, পরের ৩ ম্যাচে পেয়েছেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ রিজওয়ানের মতো তারকা ক্রিকেটারকে। লিটনের ব্যাট হাসেনি একবারও। ৪ ম্যাচে তার ইনিংসগুলো যথাক্রমে ১৩, ১৪, ৮ এবং ০। সব মিলিয়ে ৪০ বল খেলে করেছেন ৩৫ রান, এখন পর্যন্ত মেরেছেন মোটে ৪ খানা বাউন্ডারি আর একখানা ছক্কা। শুরুতে লিটন ব্যর্থ হলেও অন্যরা সামলে নিয়েছেন বলেই হয়তো সিলেটের মতো দুর্দশা হয়নি কুমিল্লার। তবে গত মৌসুমে সিলেট স্ট্রাইকার্সে খেলে ভালো করা তাওহীদ হৃদয় এবার দল পালটে এসেছেন কুমিল্লায়। কিন্তু আগেরবারের সেই ঝলক নেই ব্যাটে। এখন পর্যন্ত ৪ ইনিংসে তার রান ৯৫, কোনো হাফসেঞ্চুরি নেই। ৪৭, ০, ৯ এবং ৩৯ এই হচ্ছে তার ৪ ইনিংসের রান, স্ট্রাইক রেট ১২১.৭৯। সবশেষ ম্যাচে রংপুর রাইডার্সের বিপক্ষে কুমিল্লার ৮ রানের হারে অনেকটাই দায় তাওহীদের। হাসান মাহমুদের করা ১৯তম ওভারের শুরুতেই বাউন্ডারি পাওয়ার পরও সেই ওভারে নিতে পারেন মাত্র ৭ রান, তিন বলে নেন সিঙ্গেল। ওখানেই শেষ ওভারের সমীকরণটা কঠিন হয়ে ওঠে আর তাওহীদ নিজেও প্রথম বলে হয়ে যান রানআউট।

বিপিএলের গত আসর দিয়ে অনেকটা পুনর্জন্মই হয়েছিল রনি তালুকদারের, ২০১৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হওয়ার পর আর ডাক পাননি এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। রংপুর রাইডার্সের হয়ে ২০২৩ বিপিএলে ৪২৫ রান, (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) তাকে ফেরাল টি-টোয়েন্টি দলে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে ৩ ম্যাচেই খেললেন। রান আহামরি নয়; ২১, ৯, ২৪। তবুও টিকে গেছেন। ২০২৩ সালে খেলা ৯ টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২০৩ রান করা রনি এই বিপিএলের পর জাতীয় দলে থাকবেন কি না সেই প্রশ্ন উঠে গেছে, কারণ নিজের ফ্র্যাঞ্চাইজি দল রংপুর রাইডার্সেই তিনি একাদশে জায়গা হারিয়েছেন। ৪ ম্যাচে যথাক্রমে ৫, ৬, ১৫ ও ১১ রানে আউট হওয়ার পর এই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে কুমিল্লার বিপক্ষে সবশেষ ম্যাচে একাদশে রাখেনি রংপুর। সূচনার সঙ্গতে ব্রেন্ডন কিং কিংবা বাবর আজমকে পেয়েছেন রনি, একটা ইনিংসে নেমেছিলেন ওয়ানডাউনে। কিন্তু পারফরম্যান্সে কোনো পরিবর্তন নেই।

সামগ্রিকভাবে ব্যাটসম্যানরা সবাই খারাপ করলে হয়তো মেনে নেওয়া যেত যে সমস্যা উইকেটে বা অন্য কোথাও। কিন্তু তাদের এই পারফরম্যান্সটা আরও দৃষ্টিকটু হয়ে পড়ছে যখন আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে প্রায় বছর দুয়েক আগে অবসর নিয়ে নেওয়া মুশফিকুর রহিম কিংবা লম্বা সময় ধরে জাতীয় দলে অনিয়মিত এনামুল হক বিজয়রা ভালো করেন। বাংলাদেশে বিপিএল বাদে আর কোনো টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা নেই, তাই আন্তর্জাতিক ম্যাচে না খেললে দুটো বিপিএলের মধ্যে টি-টোয়েন্টি সংস্করণে খেলার চর্চাটাও থাকে না। লিটন গত ১ বছরে খেলেছেন ৯টা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ, শান্ত খেলেছেন ১১টা, রনি ১০টা আর তাওহীদ খেলেছেন ১১ ম্যাচে। জুনে বিশ্বকাপ দলে তারাই সম্ভাব্য অথচ এই পাঁচজনেরই বিপিএলে বেহাল দশা। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর ২০২২ এর পর আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি না খেলা মুশফিকুর রহিমের রান ৫ ইনিংসে ২০২, ২টা হাফসেঞ্চুরি। স্ট্রাইক-রেট ১৩৪ প্রায়। এমনকি অনেকের কাছে বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া  মাহমুদউল্লাহও ২৪ বলে ৫১* রানের ইনিংস খেলেছেন। গত কয়েকটি সফরে বদলি হিসেবে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া এনামুল হক বিজয়ও দুটো হাফসেঞ্চুরি করেছেন, তার দল খুলনা টাইগার্স পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে।

তরুণদের এই ব্যাটিং ব্যর্থতা ভাবাচ্ছে বিকেএসপির ক্রিকেট বিশ্লেষক ও বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সাবেক কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমকেও, ‘আসলে ব্যাপারটা অবাক করার মতোই। কেন তারা পারছে না সেটার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বলা মুশকিল। উইকেটও ভালো, অন্যরা রান করছে। কিন্তু লিটন, শান্ত, হৃদয়রা কেন রান করছে না সেটা আসলেই চিন্তার। কারণ তাদের তো জাতীয় দলে নিজেদের জায়গাটা পাকা, তাদের তো দলে জায়গা নিয়ে কোনো চাপ নেই। এই মুহূর্তে একটা জাতীয় দল করা হলে আমরা কিন্তু ১১ জন ক্রিকেটার পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বেছে নিতে  পারব না।’

ফাহিম মনে করেন মানসিকভাবে বাংলাদেশের তরুণ ব্যাটসম্যানদের খেলায় একটা অস্থিরতার ছাপ দেখা যাচ্ছে, ‘ওদের খেলার কোনো প্যাটার্ন বা ধাঁচ নেই, মনে হচ্ছে খুব অস্থির। কেউ শুরুতে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হচ্ছে, কেউ আবার বেশি ধরে খেলতে গিয়ে চাপ বাড়িয়ে আউট হয়ে যাচ্ছে। বাবর আজম যে খেলাটা খেলল, সে জানে এখানে কী করতে হবে, সবই তার মুখস্থ। আমাদের ক্রিকেটারদের নিজের ইনিংস নিয়ে কোনো ধাঁচ চোখে পড়ছে না। ক্রিস গেইল কিংবা বাবর আজম, ওরা যে যেভাবেই খেলে ওরা কিন্তু সবসময় এভাবেই খেলে এবং সেই খেলাটাই তাদের বৈশিষ্ট্য। যেমন গেইম শুরুতে একটু সময় নেয় বা বাবর এই কন্ডিশনে কীভাবে রান করতে হয় সেটা ভালো জানে। আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে সে রকম কোনো ধাঁচ দেখছি না, এটাই  অ্যালার্মিং।’