ওমরায় আগ্রহ, টাকা বাড়ায় হজে অনীহা

সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ নিবন্ধনের সময় তৃতীয় দফায় বাড়িয়েও তেমন সাড়া মেলেনি হজযাত্রীদের। আজ বৃহস্পতিবার (১ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টায় হজ নিবন্ধনের সময় শেষ হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এবছর সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করেছেন ৭৯ হাজার ৮৮২ জন। এখনও কোটা খালি রয়েছে ৪৭ হাজার ৩১৪ জনের। এ অবস্থায় হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সময় বাড়ানোর দাবি করেছেন।

এবছর হজ যাত্রী কমার পেছনে জাতীয় নির্বাচন, হজের তুলনায় ওমরায় আগ্রহ এবং বৈশ্বিক কারণকে দায়ী করেছেন হজ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ওমরা করতে হজের তুলনায় অর্ধেকরও কম টাকা খরচ হয়। এজন্য অনেকেই ওমরার দিকে ঝুঁকছেন। এদিকে প্রতিবছর হজের টাকা বেড়েই চলছে। হজ করতে একজনের খরচ হয় পাঁচ লাখের অধিক, সেখানে ওমরায় খরচ হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। হজের তুলনায় পাঁচভাগের একভাগ টাকা প্রয়োজন হয় ওমরায়।

এ বিষয়ে হজ এজেন্সি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) সভাপতি শাহাদাত হোসাইন তসলিম  দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় নিবার্চনের সময় অনেকেই দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাই প্রাক-নিবন্ধন করলেও চূড়ান্তভাবে হজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এছাড়াও হজের তুলনায় ওমরায় টাকা কম খরচ হওয়ায় মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এসব কারণে এবছর হজে সাড়া কম মিলেছে। তবে সময় বাড়ানোর জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়কে আমরা অবহিত করেছি।’  

চলতি মৌসুমে হজের নিবন্ধন শুরু হয় গত বছরের ১৫ নভেম্বর, যা ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। এ সময়ের মধ্যে হজ যাত্রীদের প্রত্যাশিত সাড়া না মেলায় সময় বাড়ান হয় ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাতেও কোটার অর্ধেকও পূরণ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত এবং সর্বশেষ তৃতীয় দফায় ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ান হয়।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত দুই বছরের তুলনায় হজের খরচ অনেক বেড়েছে। ২০২২ সালে হজ যাত্রীদের তিনটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল। প্রথম প্যাকেজে সর্বমোট খরচ ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, দ্বিতীয় প্যাকেজে ৩ লাখ ৬০ হাজার এবং তৃতীয় প্যাকেজে ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ছিল। বেসরকারি প্যাকেজে ৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা খরচ ঘোষণা করা হয়। তবে পরের বছরই খরচ বেড়ে যায়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজের খরচ নির্ধারণ করা হয় ৬ লাখ ৮৩ হাজার ১৮ টাকা এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় খরচ ধরা হয় ৬ লাখ ৭২ হাজার ৬১৮ টাকা। খরচ বাড়ার কারণে প্রাক-নিবন্ধনকারী অনেকেই আর নিবন্ধন করেননি। বর্তমানে হজে যেতে হলে প্রথম ধাপে ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে প্রাক-নিবন্ধন করতে হয়। আর মূল নিবন্ধনের জন্য ন্যূনতম ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। বাকি টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়।

এবারের হজের জন্য খরচ কমিয়ে গত নভেম্বর প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। সাধারণ প্যাকেজে হজ করতে ৫ লাখ ৭৮ হাজার ৮৪০ টাকা এবং বিশেষ প্যাকেজের মাধ্যমে ৯ লাখ ৩৬ হাজার ৩২০ টাকা ব্যয় ধরা হয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৮৩ হাজার ২০০ টাকা কমিয়ে সাধারণ প্যাকেজ ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং বিশেষ প্যাকেজ ৬ লাখ ৯৯ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে হাব।

হজ নিবন্ধনের সাড়া কম হওয়ায় পেছনে কয়েকটি কারণ দেখিয়েছে হজ এজেন্সির মালিকরা। তাদের মতে, গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নিবন্ধন শুরু হলেও এবার শুরু হয়েছে নভেম্বর মাসে। এ কারণে হজে যেতে ইচ্ছুকদের ধারণা, সময় বাড়ান হবে। এছাড়াও হজের মাত্রাতিরিক্ত খরচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও দেশের টালমাটাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি। মধ্যবৃত্ত শ্রেণির লোকজন বেশি হজ করতে যান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে তাদের বেশিরভাগ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব একটা ভালো না। তারা হজ না করে এখন ওমরাহ করার দিকে ঝুঁকছেন।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মো. মঞ্জুরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলতি মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জনের হজে যাওয়ার কোটা রয়েছে। তার মধ্যে বৃহস্পতিবার রাত ৮টা পর্যন্ত নিবন্ধন করেছেন ৭৭ হাজার ৭৪ জন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ৪ হাজার ১৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় নিবন্ধন করেছেন ৭২ হাজার ৯০৯ জন হজযাত্রী। তবে শেষ পর্যন্ত হজ নিবন্ধনের সংখ্যা কয়েক হাজার বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রায় চার হাজারের মতো হজযাত্রীর পেমেন্ট ভাউচার পেন্ডিং আছে।’

কোটা পূরণে সময় আরও বাড়ানো হবে কিনা—জানতে চাইলে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হজ) মতিউল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সময় বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হজযাত্রীর সংখ্যা সৌদি সরকারকে জানিয়ে কোটা সারেন্ডার করতে হবে। বাংলাদেশি কোটার ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ হজযাত্রীর জন্য মাথাপিছু সিকিউরিটি মানি হিসাবে ২৮ রিয়াল করে জমা দিতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সৌদি সরকারকে মোট সংখ্যা না জানালে বাকি অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে না।’