মামলা ও সাজা

ভ্রাম্যমাণ আদালতে গতি ও সাজা বেড়েছে

ফৌজদারি মামলার প্রায় ২২ শতাংশ মাদক-সংক্রান্ত মামলা। বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন ফৌজদারি মামলা ও বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে মাদক-সংক্রান্ত বিচার নিষ্পন্ন মামলায় প্রথম ৬ বছরে সাজার হার ৫০ শতাংশের বেশি হলেও পরের ৯ বছরে সাজার হার কমে ৫০ শতাংশের নিচে নেমেছে।

দেশে খুন, ধর্ষণ, অবৈধ অস্ত্র রাখা, ডাকাতি, অপহরণ, মাদক, দুর্নীতি, অর্থ পাচারের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ প্রমাণসাপেক্ষে শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রচলিত দন্ডবিধিসহ বিশেষ আইন রয়েছে। মাদক মামলার বিচার হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে। মাদকের পরিমাণ ও ওজন অনুযায়ী মৃত্যুদন্ড, যাবজ্জীবন সাজাসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাৎক্ষণিক বিচারের (দুই বছরের বেশি সাজা নয়) ব্যবস্থাও রয়েছে।

গত কয়েক বছরে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে নানা মহল উদ্বিগ্ন। বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষীর গরহাজিরায় মাদক মামলার অর্ধেক বা তার বেশি আসামি খালাস পাওয়ায় হতাশাও আছে। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দুর্বল ও ত্রুটিযুক্ত তদন্ত, সাক্ষীর গরহাজিরা প্রভৃতি এড়ানো গেলে মাদক মামলায় গতি আসবে, সাজার হারও বাড়বে।

সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখার তথ্য (গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত) অনুযায়ী, অধস্তন আদালতগুলোতে বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ২১ লাখ ৬৪ হাজার। বিচারাধীন মাদক মামলার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৪৬৮। বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার ২১ দশমিক ৯২ শতাংশই মাদক-সংক্রান্ত।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের করা মামলায় গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসামি ছিল ২০১৬ সালে; ৫ হাজার ৩৪৮ জন। ওই বছর সাজা হয়েছে ২ হাজার ৩৫৬ জনের, অর্থাৎ ৪৪ শতাংশের, আর খালাস পেয়েছেন ২ হাজার ৯৯২ জন। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৬৬৯ জন আসামির ১ হাজার ৬৯৮ জনের (৪৬ শতাংশ) সাজা হয়েছে, খালাস পেয়েছে ১ হাজার ৯৭১ আসামি।

২০০৯ সালে ১ হাজার ৬৯২ আসামির ৯৩২ জন (৫৫ শতাংশ) সাজা পেয়েছে। ২০১০ সালে ২ হাজার ৪১৪ আসামির ১ হাজার ৪৮০ জনের (৬১ শতাংশ) সাজা হয়েছে। ২০১১ সালে ২ হাজার ৩৩৫ জনের ১ হাজার ৪৪৪ জন (৬২ শতাংশ), ২০১২ সালে ৩ হাজার ৪৯৪ আসামির ১ হাজার ৮৪৬ জন (৫৩ শতাংশ), ২০১৩ সালে ২ হাজার ৬৬ আসামির ১ হাজার ১২৭ জন (৫৫ শতাংশ) ও ২০১৪ সালে ২ হাজার ৬৮৯ জন আসামির ১ হাজার ৭১৬ জনের (৬৪ শতাংশ) সাজা হয়েছে। অর্থাৎ ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সাজার হার ঊর্ধ্বমুখী ছিল।

অন্যদিকে ২০১৫ সালে ১ হাজার ৭৩ জনের ৮৯২ জন (৪৮ শতাংশ), ২০১৭ সালে ২ হাজার ৫৪৪ জনের ১ হাজার ১৬ জন (৪০ শতাংশ), ২০১৮ সালে ১ হাজার ৪৩৫ জনের ৫৯২ জন (৪১ শতাংশ), ২০১৯ সালে ১ হাজার ৬৫৪ জন আসামির ৬৪২ জন (৩৯ শতাংশ), ২০২০ সালে ৭২২ আসামির ৩১০ জন (৪৩ শতাংশ), ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৬৪ জনের ৬৬১ জন (৪০ শতাংশ) এবং ২০২২ সালে ২ হাজার ৫৫০ জন আসামির ১ হাজার ৩২ জনের (৪০ শতাংশ) সাজা হয়েছে। অর্থাৎ গত ৯ বছরে সাজার হার ক্রমান্বয়ে কমেছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি আব্দুল্লাহ আবু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাক্ষীদের আদালতে আনা একটা বড় সমস্যা। সরকারি সাক্ষীরা (পুলিশ বা বিশেষজ্ঞ) কমবেশি এলেও অন্য সাক্ষীদের ঠিকানায় গিয়ে পাওয়া যায় না। আর যারা আসে তারা আদালতে সঠিকভাবে সাক্ষ্য দেয় না, জব্দ তালিকার সাক্ষী আদালতে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে তো সমস্যা। তদন্তে ত্রুটি থাকলে আসামিপক্ষ এর সুযোগ নেয়। ফলে আসামি খালাস পেয়ে যায়। তবে, আমরা সক্রিয় আছি বলেই অনেক আসামির সাজা হচ্ছে।’

১৫ বছরে অধিদপ্তর মামলা করেছে ২ লাখ

গত ১৫ বছরে অভিযানে ২ কোটি ৬৩ লাখ ৮ হাজার ৫১৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। উদ্ধারের তালিকায় আরও আছে, ২ লাখ ৬ হাজার ৯৮২ কেজি হেরোইন, ৯ হাজার ৬৯৪ কেজি কোকেন, ৫ হাজার ৫৫৭ কেজি আফিম, ৬ কোটি ৪৮ লাখ ৫ হাজার ৮০৩ কেজি গাঁজা ও ৫ লাখ ৯ হাজার ৮৫৪ বোতল ফেনসিডিল।

প্রাপ্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৫ বছরে (২০০৯-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৩-এর ডিসেম্বর) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ৭ লাখ ৭৯ হাজার ৮১০টি অভিযান চালিয়েছে। মামলা করেছে ২ লাখ ১০ হাজার ৯৫২টি। এসবের আসামি ২ লাখ ২৬ হাজার ২৮ জন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক দিন ধরে প্রায় অর্ধেক জনবলে চলছে অধিদপ্তর। বর্তমান জনবলের বেশিরভাগই দপ্তরকেন্দ্রিক। অভিযান চালানোর জন্য যথেষ্ট জনবল নেই। জনবল বাড়ানো না হলে মামলা বাড়তেই থাকবে।’

ভ্রাম্যমাণ আদালতে গতি বাড়ছে

মাদক নির্মূলে প্রচলিত আদালতে বিচারের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অধিদপ্তর ছাড়াও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান চালান এবং মাদকসহ গ্রেপ্তারকৃতদের তাৎক্ষণিক সাজা দেন। গত ১৪ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে ২০২২ ও ২০২৩ সালে।

২০২২ সালে ৩৩ হাজার ৩৯২টি অভিযানে মামলা হয়েছে ১৫ হাজার ১৭০টি। গ্রেপ্তার হয়েছে ১৫ হাজার ২১১ জন, সাজা হয়েছে সবার। গত বছর সারা দেশে অভিযান পরিচালিত হয়েছে ৩৯ হাজার ৮৫৯টি, মামলা হয়েছে ১৯ হাজার ২৩৮টি, গ্রেপ্তার হয়েছে ১৯ হাজার ২৫৩ জন, সাজা হয়েছে সবার।

সব মিলিয়ে গত প্রায় ১৪ বছরে (২০১০-এর আগস্ট থেকে ২০২৩-এর ডিসেম্বর) ২ লাখ ৪০ হাজার ৫১৭টি অভিযান চালিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। মামলা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪৫৮টি। গ্রেপ্তার হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৫ জন। সাজা হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৫০ জনের। পাঁচজন খালাস পেয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আজিজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধিদপ্তরের ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের মোবাইল কোর্টের অভিযান আগেও বেশি ছিল, এখনো তাই আছে। হয়তো মাদক উদ্ধার বেশি হচ্ছে, তাই অভিযান বাড়ছে। এ রকম চললে মাদকের বেচাকেনা কমবে।’

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধ ও মামলা বেড়ে যাওয়া অবশ্যই উদ্বেগের। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু সাক্ষী আসে না বলে মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হয়। তদন্ত নিখুঁতভাবে করতে হবে। সাক্ষী হাজির করতে হবে। তাহলে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে এবং অপরাধীদের সাজার হার বাড়বে।’