দূষণের প্রতিবাদে আবর্জনা প্রদর্শনী

সবুজ প্রকৃতি আর জলাশয়ের জন্য সবুজ স্বর্গ হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস। কিন্তু গত দুই বছরে যত্রতত্র প্লাস্টিকজাতীয় বর্জ্যসহ নানা ধরনের ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কয়েক গুণ দূষিত হয়েছে। ভয়াবহ মাত্রা নেওয়া দূষণরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বটতলায় অভিনব এক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শিক্ষার্থী। সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে তারা প্রদর্শনীর নাম দিয়েছেন ‘জাহাঙ্গীরনগর সবুজ স্বর্গ’।

গত ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রদর্শনীর কাজ শুরু করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারিহা জামান নিকি, সরদার ইসফার সাদী, ইমরান হাসান শুভ, জুয়াইরা মেহজাবিন, নওশাদুল সাবেরিন, আনিকা রাহি ও মাহিব মহিউদ্দিন জামান। প্রদর্শনীটি চলছে আজ রবিবার পর্যন্ত। গতকাল শনিবার প্রদর্শনীতে গিয়ে দেখা যায়, একটি গাছে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে শতাধিক প্লাস্টিকের প্লেট ও প্যাকেট। আরেকটি গাছে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে প্লাস্টিকের বোতলসহ বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী সপ্তম ছায়ামঞ্চের পাশ থেকে কুড়ানো এসব বর্জ্যরে মধ্যে রয়েছে পলিথিন, সিগারেটের প্যাকেট, কাচের টুকরোসহ বিভিন্ন আবর্জনা। সেখানে কয়েকটি ভাঙা জানালার গায়ে আঠা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা রয়েছে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থান থেকে তোলা বলে ময়লা-আবর্জনার ছবি।

আয়োজকরা জানান, প্রথমে তারা ক্যাম্পাসের একটি স্থানে ভাঙা জানালাগুলো দেখতে পান। সেগুলো দেখেই তাদের মাথায় আসে সচেতনতামূলক একটি প্রদর্শনী করার। তারপর তারা দুদিন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ময়লা-আবর্জনার ছবি তোলেন। তারা বলেন, মূলত করোনা-পরবর্তী সময় থেকে প্লাস্টিকের প্লেট ও গ্লাসের ব্যবহার বেড়ে গেছে। শিক্ষার্থী ও বহিরাগতরা খাওয়া-দাওয়ার পর এসব প্লেট ও গ্লাস যেখানে-সেখানে ফেলে রেখে যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকার ফলে সেগুলো রিসাইক্লিং বা অন্যত্রে সরিয়ে ফেলায় হয় না। খাবারের দোকানের পেছনের জলাশয়ের পাড়ে স্তূপ করে রাখা হয়।

আয়োজকদের একজন সরদার ইশফার সাদী বলেন, ‘আমাদের এই প্রদর্শনীটি প্রতিবাদমূলক ও সচেতনতামূলক। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।’

এদিকে এসব দূষণের বিরূপ প্রভাব পড়ছে ক্যাম্পাসের জীববৈচিত্র্যের ওপর। ইতিমধ্যে অতিথি পাখি আসা কমে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দীন রুনু বলেন, ক্যাম্পাসে যত্রতত্র প্লাস্টিক বর্জ্যসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলার ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বায়ু দূষিত হচ্ছে। জলাশয়ের পানি দূষিত হচ্ছে। ফলে অতিথি পাখির পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের প্রদর্শনীটি প্রশংসার দাবিদার। আশা করব, তাদের এই কাজের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতিমালা তৈরি করবে। তিনি জানান, জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (জাইকা) ও গ্রামীণ শক্তির সহায়তায় ২০১২ সালে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে ক্যাম্পাসসহ আশপাশের প্রায় ৫০০ উৎস থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে পচনশীল বর্জ্য দিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করা হতো। কিন্তু ২০২০ সালের মার্চে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নূরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিদিন সকালে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ক্যাম্পাসের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে থাকে। এস্টেট শাখাকে বলে দিচ্ছি কোথাও ময়লা-আবর্জনা থাকলে তা যেন দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলা হয়। আর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেনি। তবে আমরা ভাবছি সুষ্ঠু সমাধানের জন্য।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান বাবুল বলেন, ‘আমরা বিষয়টি দেখব। যেখানে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে, সেখান থেকে পরিষ্কার করার ব্যবস্থা করব।’