ক্যানসার আক্রান্ত ক্যানসার হাসপাতাল 

রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে ‘সূচনায় পড়লে ধরা ক্যানসার রোগ যায় যে সারা’ স্লোগান লেখা পোস্টার। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই হাসপাতালে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও চিকিৎসা পায় না রোগীরা। এই হাসপাতালটি দেশে ক্যান্সার চিকিৎসায় এক মাত্র পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল হলেও নানা অনিয়মে বন্দি হয়ে পড়েছে। 

ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দালালকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া ছাড়া শয্যা পাওয়া যায় না।  টাকা দিলে শয্যা পেতে আর ভোগান্তি হয় না। হাসপাতালের বর্তমান যে চিত্র তাতে দালাল ছাড়া ভর্তি হওয়া কষ্টসাধ্য। শয্যা পেতে দালালকে দিতে হয় ৫-৭ হাজার টাকা।

এখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার খরচ বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে অনেক কম। কিন্তু যন্ত্রপাতি না থাকায় কিংবা বিকল থাকায় সঠিক সময়ে, সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সরকারি এই হাসপাতালের ওপর নির্ভর করা রোগীরা। ফলে চিকিৎসার মাঝপথে বা চিকিৎসা শুরুর আগেই অনেক রোগী মারা যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যানসার হাসপাতালের রেডিওথেরাপির ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটি পুরোপুরি বিকল। বাকি দুটিও কখনো কখনো বিকল হয়ে পড়ে। ক্যানসার নির্ণয়ের অন্যতম যন্ত্র এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) বিকল হয়ে পড়ে আছে। নেই এক্স-রে (রঞ্জন রশ্মি), সিটিস্ক্যান মেশিনও। যন্ত্রপাতি বিকল থাকায় এখানে বায়োপসিসহ ক্যানসার নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পরীক্ষা করা যায় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিকটবর্তী এই হাসপাতালটির সেবার সুযোগ ও মান দিনে দিনে ধসে যাচ্ছে। খোদ ক্যানসার হাসপাতাল ই যেনো ক্যানসার আক্রান্ত। 

সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে ৩০০ থেকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে ২০০ শয্যা বাড়ানোর ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নতুন করে কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে যেখানে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট মিলিয়ে ২ হাজার ৮৫৮ জনবল প্রয়োজন, সেখানে আছে কমবেশি ১ হাজার ১৭৬ জন। জনবল বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে বারবার জানানো হলেও প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কোনো কোনো রোগীর শয্যা পেতে এক মাসের বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিদিন ভর্তি হতে আসে ৫০০-৬০০ রোগী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভর্তি হতে আসা রোগীদের ঘিরে হাসপাতালের আশপাশে গড়ে উঠেছে আবাসন-বাণিজ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তার মতো আরও ৮-১০ জন রোগীর আশপাশে বাসা ঠিক করে দেন। একেকটি কক্ষের জন্য প্রতিদিন ৩০০-৭০০ টাকা দিতে হয়। তারা ৫০ টাকা করে কমিশন পান।

যাদের সামর্থ্য নেই, তারা হাসপাতালের দোতলা ও প্রশাসনিক ভবনের সামনের খালি জায়গায় রাত কাটান। মাঝেমধ্যে তাদের তাড়িয়ে দেন নিরাপত্তায় থাকা আনসার ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। রোগীদের অভিযোগ, তারা যাতে বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসা নেন, সে জন্যই আনসার সদস্যরা তাদের তাড়িয়ে দেন। কারণ তারা দালালদের কাছ থেকে কমিশন পান।

ক্যানসার হাসপাতাল ঘিরে গড়ে উঠেছে আরেকটি দালালচক্র। তারা রোগীদের হাসপাতালের বাইরে পরীক্ষা করানোর জন্য উৎসাহিত করে। হাসপাতালে মেশিন নষ্ট থাকার কথা বলে রোগীদের অন্য জায়গায় পরীক্ষা করাতে নিয়ে যায়। তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে হাসপাতালের আউটসোর্সিংয়ের কর্মী, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের।

নিয়ম অনুযায়ী ভর্তি হওয়া রোগীদের বিনামূল্যে হাসপাতাল থেকে ওষুধ দেওয়ার কথা। কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময় ওষুধ দেওয়া হয় না। তবে দালালদের টাকা দিলে পাওয়া যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মী জানান, প্রায় ছয় মাস আগে ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কেনা হচ্ছে না।

নানা অব্যবস্থাপনার কথা স্বীকার করে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. আবু হেনা মোস্তাফা জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতাল কেন্দ্র করে যে দালালচক্র গড়ে উঠেছে তা নির্মূলে আমরা কাজ করছি। হাসপাতালের পরিচালক স্যার ও আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করছি। রোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছি।’