সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, ইতিহাসবিদ, বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক। চলছে বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী বইমেলা। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি, আমাদের পাঠাভ্যাস, প্রকাশনাসহ নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : আপনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। আপনার অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক অবস্থা নিয়ে মূল্যায়ন কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমি ১৯৯৭-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলা একাডেমির দায়িত্বে ছিলাম। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর যে মেলা পেয়েছিলাম, সেটা ছিল বারোয়ারি মেলা। দোয়েল চত্বর থেকে শুরু করে টিএসসি পর্যন্ত আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনে যা কিছু দরকার তার সবই তখন সেখানে পাওয়া যেত। ওটাকে বইমেলা বলা যেত না। বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে কিছু প্রকাশক থাকতেন, অচ্ছুৎ কন্যার মতো। তখন বইমেলা প্রাঙ্গণে নারীদের লাঞ্ছিত করার মতো ঘটনাও ঘটত। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষণা করলাম, আগামী বছর থেকে বইমেলা- বইমেলাই হবে। এরপর, ১৯৯৮ সাল থেকে বারোয়ারি মেলাকে বইমেলায় রূপান্তর করলাম।
দেশ রূপান্তর : এর প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : তখন মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। অনেক প্রকাশক বলেছিলেন যে, অন্তত অন্যান্য সামগ্রীর টানে কিছু মানুষ মেলায় এসে দুয়েকটা বই কিনত, এখন তো সেটাও কিনবে না। আমি তাদের বলেছিলাম যে, আপনাদের বই এবার বেশি বিক্রি হবে। আর আমার কথাটাই সত্য হয়েছিল। সেই সঙ্গে সেবার নারীরা অবাধে বইমেলা প্রাঙ্গণে বিরচণ করতে পারলেন। তখন র্যাব, পুলিশ কিছুই ছিল না। আমিই ছিলাম পুলিশ। এবং বাংলা একাডেমির সামনে আগে পাইরেটেড বই বিক্রি হতো। আমি সেটা তাড়িয়েছি। এবং একটি দৈনিক পত্রিকায় বলা হয়েছিল যে মহাপরিচালকের হাতে বাঁশ। আমার সময়, আমার কথাই বাংলা একাডেমি চত্বরে আইনে পরিণত হতো।
দেশ রূপান্তর : এবারের বইমেলা তো শুরু হলো মাত্র, গিয়েছিলেন?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমি গতকাল (গত শুক্রবার) গিয়েছিলাম। আমার কাছে বইমেলা মনে হয়নি। একটু বিস্তৃত হয়েছে অঙ্গন, অযৌক্তিকভাবে... মনে হয় বইয়ের হাটে পরিণত হয়েছে।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু, আমাদের জনসংখ্যা বেড়েছে, প্রকাশক বেড়েছে... মেলার পরিসর তো একাডেমি প্রাঙ্গণে ঘিঞ্জি হয়ে পড়ত না? হাঁটাচলার পরিসরও তো দরকার..., একাডেমি প্রাঙ্গণে এই ভিড়ের চাপ সামাল দেওয়া কি কঠিন হতো না?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমি এমন যুক্তির সঙ্গে একমত নই। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেড়েছে, বাড়ছে, বাড়তে থাকবে। কিন্তু সেই অনুসারে প্রকাশকের সংখ্যা বাড়েনি।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু, একাডেমির ভেতরে যত সংখ্যক প্রকাশককে জায়গা দেওয়া সম্ভব হতো, উদ্যানে মেলা আসার পর তো অধিক সংখ্যক প্রকাশক প্যাভেলিয়ন ও স্টল পাচ্ছেন, তাদের স্টলের পরিসরও বাড়ছে...।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বইমেলায় যাদের প্রকাশক হিসেবে দেখি, তাদের বেশিরভাগই মৌসুমি প্রকাশক। এরা ভুঁইফোড়। সেজন্য আমি মনে করি ৫০ থেকে ৬০ জনের বেশি প্রকাশক বাংলাদেশে নেই। এই কয়জনের জায়গা তো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই হতে পারে বা পারত। অন্তত আমি যেটা মনে করি, নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিসরের মধ্যে সবকিছু রাখতে হয়। যেমন গতকাল (শুক্রবার) বইমেলায় ঘুরে বাংলা একাডেমির কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে মেলা প্রাঙ্গণে দেখিনি। কিন্তু আমার সময় বইমেলা প্রাঙ্গণ জুড়ে বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকতেন। কোথাও কিছু হলে বা দরকার হলে সঙ্গে সঙ্গে আমাকে রিপোর্ট করতেন এবং আমি দৌড়ে যেতাম। আর দেখলাম অপরিচ্ছন্ন মেলা প্রাঙ্গণ। আমার সময় সম্পূর্ণ মেলা প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখা হতো বলে আমি দাবি করতে পারি।
দেশ রূপান্তর : আপনি পরিচ্ছন্নতার কথা বললেন, মেলার ব্যবস্থাপনা আপনার সময় কীভাবে হতো? ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম বা কোনো থার্ড পার্টি এখানে যুক্ত হতো?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমার প্রশ্ন তো সেখানে। নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিসীমার মধ্যে না থাকার ফলে মেলার ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে গিয়েছে। এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলা একাডেমির বইমেলায় অনেক সমস্যা-সংকট তৈরি হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বইমেলার আয়োজন, পরিসীমা সবকিছু নিয়ে সরকারকে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এবং বাংলা একাডেমিকে নতুন করে ভাবতে হবে।
দেশ রূপান্তর : বাংলা একাডেমি কি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার কর্তৃত্ব হারিয়েছে?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হলো মহাপরিচালকের দৃঢ়তা, স্বাধীনচেতা মনেবৃত্তির ওপরই বাংলা একাডেমির স্বাধীনতা, স্বায়ত্তশাসন, গণতন্ত্র ইত্যাদি নির্ভর করে। এবং আমি বারোয়ারি মেলাকে বইমেলায় রূপান্তরিত করেছিলাম। আমার আশঙ্কা, বইমেলাটি আবার বারোয়ারি মেলায় রূপান্তরিত হচ্ছে। আরেকটা কথা, বাংলা একাডেমি কতটা স্বায়ত্তশাসন ধরে রাখতে পারছে বা না পারছে, সেটা মহাপরিচালকের ওপরই নির্ভর করে।
দেশ রূপান্তর : বইমেলায় টিকিট কেটে প্রবেশের ব্যবস্থা করা নিয়ে একটা ক্ষীণ আলোচনা শোনা যায়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তেমন জোরালো আলাপ হয় না। আপনার মত কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : ব্যক্তিগতভাবে আমি এ ব্যাপারে সহমত পোষণ করি। বাংলা একাডেমির দিক থেকে বইমেলায় প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া যায়। সেই প্রবেশ মূল্য খুব বেশি না ধরলেও সেখান থেকে বাংলা একাডেমির কিছুটা হলেও আয় হবে। এবং সেটা বাংলা একাডেমির নিজস্ব আয় হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। এছাড়া কত লোকসমাগম হলো তারও একটা বিশ্বাসযোগ্য হিসাব পাওয়া যাবে।
দেশ রূপান্তর : সাম্প্রতিককালে বাংলা একাডেমি নিয়ে নানা রকম আলোচনা জন্ম নেয়। এবার সেটা আলাদা মাত্রা পেয়েছে একজন লেখকের ১০ বছর আগের পুরস্কার ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনায়। এর আগে আমরা দুয়েকজন লেখককে পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে দেখেছি, কিন্তু এবার দেখলাম গ্রহণ করা পুরস্কারটি বাংলা একাডেমির সমালোচনা করে ফিরিয়ে দিলেন একজন। আপনার মন্তব্য কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : এই প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। বাংলা একাডেমিতে আমার চার বছর মেয়াদ কালের মধ্যে দুই বছর আমি কোনো পুরস্কার দিইনি। কারণ, যারা পেয়েছিলেন বলে মনে করেন, বা যাদের নাম উচ্চারিত হয়েছিল, ঘোষিত হওয়ার আগেই উচ্চারিত হয়েছিল তাদের আমি যোগ্য মনে করিনি, বা কাউন্সিলও তাদের যোগ্য মনে করেনি। সেজন্য ওই দুইবছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়া হয়নি। মঞ্জুরে মাওলা যখন মহাপরিচালক ছিলেন, তখনো একবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার তিনি দেননি।
দেশ রূপান্তর : এই পুরস্কার কি মহাপরিচালক দেন?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : না। বাংলা একাডেমি পুরস্কার একাডেমির মহাপরিচালক দেন না। এটা সম্পূর্ণ যে পদ্ধতিতে হয়, তাতে মহাপরিচালকের ভূমিকা খুবই সীমিত। তবে যারা চূড়ান্ত নির্বাচক থাকেন তাদের কথা সবাই জেনে যায়। কেন এবং কীভাবে জানে, সেটা আমি বুঝি না।
দেশ রূপান্তর : এবারের ঘটনাটা নিয়ে..., প্রতিষ্ঠানের গণতন্ত্রহীনতার প্রসঙ্গ...
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : এবার তো ফিরিয়ে দিলেন জাকির তালুকদার। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। তবে এটা তার বিলম্বিত বোধোদয়। এত দিন পরে কেন? তিনি যখন গ্রহণ করেন পুরস্কারটি, তখনো বাংলা একাডেমি তাই-ই ছিল, এখনো তাই-ই আছে। বাংলা একাডেমির গণতন্ত্রহীনতা নিয়ে টক-শোতে আমি বহুবার কথা বলেছি। তার কারণ, ১৯৯৯ সালে শেষ কাউন্সিল নির্বাচন হয়েছে। আর পুরস্কার নিয়ে আমি যেটা দেখেছি, বাংলা একাডেমির পুরস্কার সাম্প্রতিককালে যেভাবে দেওয়া হয়, তাতে সরকারি আনুকূল্য বা সরকারি সংশ্লেষণ একটা থাকে আর কি। এসবের জন্যই বিতর্ক হয় আর কি। বাংলাদেশের সব পুরস্কার নিয়েই অবশ্য বিতর্ক হয়। স্বাধীনতা পুরস্কার, একুশে পদক সবকিছু নিয়েই বিতর্ক আছে। বিতর্কমুক্ত করা যায়, আমি মনে করি যদি সঠিক মানুষকে নির্বাচনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দেশ রূপান্তর : একটু বই প্রসঙ্গে আসি। দেশে তো শিক্ষিতের হার বাড়ছে, জনসংখ্যাও বাড়ছে, পাশাপাশি এখন এই ডিজিটাল দুনিয়াতে মানুষ নানাভাবেই টেক্সট পড়ছে। কিন্তু বইয়ের বিপণন, বিক্রি এসব সেই অনুপাতে তেমন বাড়ছে না কেন? শিল্প হিসেবে প্রকাশনা ব্যবসা দাঁড়াচ্ছে না কেন?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : এবার মেলায় যে একদিন গেলাম, সেদিন একটি স্টলে প্রায় এক ঘণ্টা ছিলাম। খুব খেয়াল করলাম যে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কবিতার বই, উপন্যাস এসব চাচ্ছে। মননশীল কোনো বই তারা চাচ্ছে না। এরাই কিন্তু বইমেলার মূল ক্রেতা। কাজেই বাংলা একাডেমির বইমেলা উপলক্ষে যত প্রকাশনা বেরিয়ে আসে তার সিংহভাগই আবর্জনার মতো মনে হয় আমার। যে বই ভাবায় না...। আবার প্রকাশকও বাংলাদেশে হাতেগোনা। তাদের কোনো সম্পাদনা পরিষদ নেই। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে বেশিরভাগ প্রকাশকই বই ব্যবসায়ী। তারা চান চটুল বই, যার চট করেই বিপণন হয়। তবে কিছু প্রকাশক সাহস করে স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভালো বই প্রকাশের চেষ্টা করেন। সেটা তাদের সাহস। তাদের এই বিবেকি সাহসকে আমি অভিবাদন জানাই। এমন আছেন খুবই অল্প কয়েকজন।
দেশ রূপান্তর : এক্ষেত্রে বিপণনের কি কোনো ঘাটতি আপনার চোখে পড়ে?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমি যখন বগুড়া জিলা স্কুলে পড়ি, ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে তখন আকাশবাণী কলকাতা থেকে একটা সাক্ষাৎকার শুনেছিলাম। সত্যজিৎ রায়ের। তিনি বলেছিলেন, চলচ্চিত্র তৈরি করেন যে পরিচালক, তিনিও কিন্তু দর্শক তৈরি করেন। আমি মনে করি প্রকাশকের দায়িত্ব পাঠক তৈরি করা। তবে সম্পূর্ণ ব্যাপারটা সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। বাঙালি মুসলমান পড়ে কম। ভাবে কম। কিন্তু সে বলতে চায়, লিখতে চায় বেশি। সে কারণে বাঙালি মুসলমানের বলা এবং লেখায় গভীরতা নেই, সারবত্তা নেই। এসব জায়গায় তার অনেক সমস্যা হয়ে যায়। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতিতে সমস্যা আছে। সৈয়দ মুজতবা আলীর যে একটা গল্প ছিল যে, বই তো বাসায় একটা আছেই, তাহলে আবার বই কেনার দরকার কি! বাঙালি মুসলমানের সমস্যা আসলে সেটাই।
দেশ রূপান্তর : বাংলা একাডেমি তো বই প্রকাশ করে, তাদের প্রকাশনার অবস্থা কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বাংলা একাডেমি তার দায়িত্ব পালন করছে। আপনি বাংলা একাডেমির প্রকাশনার তালিকাটা লক্ষ করুন। দেখবেন, তাদের প্রকাশিত বইগুলো কিন্তু অত্যন্ত উন্নত মানের। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য যেসব প্রকাশনী আছে, তাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে সৃজনশীল, মননশীল প্রকাশনা আছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমন পাবেন না। সেক্ষেত্রে, বাংলা একাডেমির নীতিমালা আছে বইমেলা নিয়ে। সেখানে কিছু বিষয় সংশোধন করা দরকার মনে হয়। সাধারণত নীতিমালায় আছে, গত এক বছরে ২৫টি বই প্রকাশ না করলে তাকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হবে না। এখন এই ২৫টি সৃজনশীল, মননশীল বইয়ের বিচার করবে কে? বিচারকের তো একটা দায়িত্ব আছে বলে আমার মনে হয়। প্রত্যেক প্রকাশকের সম্পাদনা পরিষদ থাকা দরকার। যে পরিষদে জ্ঞানী, গুণী মানুষেরা থাকবেন। এতে করে বাজারে ভালো বই আসার পথ তৈরি হয়।
দেশ রূপান্তর : যা বুঝতে পারছি, ভালো বই প্রকাশের একটা দিক। কিন্তু ভালো বই বের হলো এখন সেটা পাঠক বা ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াতে কোনো ঘাটতি আছে? সারা দেশে বাংলা একাডেমির বিপণন কেন্দ্রও তো নেই। পাঠক ও ভোক্তাকে ইনফরমড করার জন্য প্রচারের প্রশ্ন তো আছেই।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : অবশ্যই ঘাটতি আছে সেখানে। আমার সময় বিভিন্ন বাংলা পত্রিকাসহ ইংরেজি পত্রিকাতেও পেছনের পাতায় বইমেলায় বাংলাা একাডেমির কী কী নতুন বই এলো তার বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচারের ব্যবস্থা করি আমি। আমি সবসময় সাংবাদিকদের বলেছি, আপনারা চটুল বইয়ের পেছনে ছুটবেন না। এবং আমি আশা করি সাংবাদিকরা ভালো বইয়ের সন্ধান করবেন এবং গণমাধ্যমও ভালো বইগুলোর যথাযথ প্রচার চালাবে। তারা আমাদের জানাবে। যেমন, আমি জানতে চাই ভালো বই বের হলো কি না এবং আমি সেটা কিনতে চাই।
দেশ রূপান্তর : বইয়ের প্রচারের জন্য তো বাজেটের সংকট থাকে। প্রকাশকরা তো বইয়ের প্রডাকশন লেভেল পর্যন্ত খরচ করেন, প্রচারের খরচ নিয়ে তাদের বাজেট থাকে না।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : এই সংকট থেকে উত্তরণ একই সঙ্গে খুবই কঠিন, আবার খুবই সহজ। যেমন প্রকাশকদের মধ্যে অল্প কিছু আছেন যারা পান্ডুলিপির গুণাগুণ বিচার করেই কিন্তু তারা বই ছাপেন। এ ধরনের প্রকাশকদের এগিয়ে আসতে হবে। আর সরকারের উচিত প্রকাশনা ব্যবসাকে শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা। আর প্রণোদনার অধিকার তারাই পাবেন যারা শর্ত পূরণ করবেন।
দেশ রূপান্তর : আপনার কি বই আসছে এবার? বিষয়বস্তু কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমার একটা বই ইতিমধ্যে মেলায় এসে গেছে। আমার সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : এ প্রোফাইল ইন লিডারশিপ’ বইটি এবার আগামী প্রকাশনী বের করেছে। এই বইটির পান্ডুলিপির কিছুটা সম্পাদনা করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটি একটি অত্যন্ত উঁচুমানের প্রকাশনা। এবং মুজিববর্ষ উপলক্ষে যত বই বের হয়েছে বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত, আমি নিজেও মুজিববর্ষ উদযাপন কমিটিতে ছিলাম, আমি বলতে পারি যে এত দিনে একটি ভালো বই বের হয়েছে। পাশাপাশি, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই বাংলা একাডেমির এবারের বইমেলায় আগামী থেকে আসবে আমার ‘শেখ মুজিব: বঙ্গবন্ধু থেকে বিশ্ববন্ধু’। এটি সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার বই। এখানে যত বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে এ যাবৎ এমনটা আর হয়নি। কাজেই এই দুটি বই-ই বঙ্গবন্ধুকে জানতে, চিনতে, বুঝতে সহায়তা করবে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের ইতিহাসভিত্তিক প্রকাশনার পরিস্থিতি কেমন?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : খুবই সঙ্কুচিত। এর কারণ হচ্ছে প্রকাশকরা। ভালো বইও লেখা হয় না, লেখকও নেই। কারণ বই দেখে বই লেখার অনেক লেখক আছে। কিন্তু চিন্তা, মনন সবকিছুকে মিলিত করে, মিশ্র করে মিথস্ক্রিয়ার ভিত্তিতে একটা ভালো বই উপহার দেওয়ার মতো মানুষ বাঙালি মুসলমানের মধ্যে খুব কম আছে।
দেশ রূপান্তর : একটা অভিযোগ আছে দেশে একপাক্ষিক ইতিহাস চর্চার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আপনার মন্তব্য কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমি একমত না। ইতিহাস সবসময় দ্বিপাক্ষিক বা বহুরৈখিক। যারা এসব বলেন তারা ভুল বলেন। দেশে এমন একটা সময় গিয়েছে যখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা ছিল, বঙ্গবন্ধুর নামও অনেকে নিতে চাইতেন না। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। কিন্তু আগের পরিস্থিতির কারণে এখন আপনার মনে হতে পারে যে একপাক্ষিক। বরং এখন সঠিক ইতিহাস চর্চার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নাম যথাযথভাবে নেওয়া যাচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : আমাদের শিশুদের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস নিয়ে একরকম বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে আপনার মত কী?
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে এনসিটিবিতে যারা পাঠ্যপুস্তক প্রকল্পে আছেন তারা সঠিকভাবে নির্বাচিত বা নিযুক্ত হননি। আমার নিজের লেখাই পাঠ্যপুস্তকে বিকৃত করার মতো ঘটনা ঘটেছিল। কাজেই সরকারকে এ বিষয়ে ভাবতে হবে। যোগ্য লোককে যোগ্য জায়গাতে দায়িত্ব দিতে হবে। এ জায়গায় সরকারের ঘাটতি রয়ে গিয়েছে।