চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎই, হেমন্ত বিশ্ব শর্মার পুরনো এক ইন্টারভিউ শুনতে শুনতে বুঝতে পারলাম, দেশটাকে ঠিক কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে সংঘ পরিবার। আরএসএস, বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ চালিত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। তাদের কাজকর্ম দেখে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশ যে ধর্মনিরপেক্ষতা বর্জন করে হিন্দুত্ববাদের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে তা শুধু আমি না, ভারতের সংবেদনশীল সব মানুষের কাছে বহুদিন ধরেই স্পষ্ট হচ্ছিল। তবুও হেমন্ত বিশ্ব শর্মা এই মুহূর্তে আসামের দাপুটে মুখ্যমন্ত্রী তো বটেই, পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম মুখ বলেই তার ইন্টারভিউয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই মন দিয়ে শুনছিলাম তিনি কী বলেন। আপাত শান্ত, নিতান্তই দেশপ্রেমিক ভদ্রলোকটির কথাবার্তায় উদ্বেগ ফুটে উঠছিল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য। বলছিলেন, তিনি বিল আনছেন পলিগামি বা একাধিক বিয়ে বন্ধ করবেন বলে। আপনি ভাবতে পারেন যে এতে তো সব ধর্মের, শ্রেণির মহিলারাই উপকার পাবেন। ফলে হেমন্ত জি তো সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এতে তো আপত্তি করার কিছু নেই।
ওইটিই তো ধাঁধা। আমাদের অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থা ঋণ দেওয়ার সময় বিরাট এক ফর্ম দেয়। সেখানে নানা ধরনের ধারা, উপধারা, ক্লজ, সাব-ক্লজ থাকে তা বোঝা সাধারণ মানুষের কম্ম নয়। হাজারো হিডেন বা ছদ্ম লাইন ঠিকঠাকভাবে না বুঝলে, আপনি বিপদে পড়বেন। ঋণ করে ফ্ল্যাট বা গাড়ি যে কোনো সময়ে, উল্টোপাল্টা অজুহাতে বেসরকারি কর্তৃপক্ষ আপনার কাছ থেকে নিয়ে আপনাকে পথে বসাতে পারে। আমাদের শাসকদের এক একজন সে-রকম উচ্চপদস্থ বেসরকারি কর্তা। আসামের প্রাক্তন কংগ্রেসের সেবক, অধুনা সংঘ বিশ্বস্ত মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মার বয়ান মন দিয়ে শুনুন। পলিগামি বলতে যে তিনি নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের দিকে আঙুল তুলছেন তা বোঝা যায়, যখন তিনি পরের বাক্যেই মাদ্রাসা প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। আসামে ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়েছে, বেশ কয়েকশো মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সম্পর্কে ধীরে ধীরে জনমনে চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে বহুবিবাহ, তালাক, মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পুরনো ধ্যান-ধারণার প্রসার, আধুনিক ভারতকে পেছনের পথে নিয়ে যাচ্ছে।
মুশকিল হচ্ছে যারা এভাবে বিভাজনের রাজনীতি করছেন, তারা নিজেরাই ধর্মের নামে এদেশকে ত্রেতা যুগে নিয়ে যাওয়ায় অতি সক্রিয়। বাবরি মসজিদের জায়গায় রামের জন্মস্থান খুঁজে পাওয়া। সেখানে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করে নতুন এক তীর্থস্থান গড়ে তোলার কাজ ঘটা করে সম্পন্ন করার পর ভক্তদের দৃষ্টি পড়েছে কাশির জ্ঞান ব্যাপী মসজিদের দিকে। কোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে রায় দেওয়ার আগেই সেখানে পূজা পাঠ শুরু হয়ে গেছে। না জানি এরপর আরও কত নতুন নতুন ধর্মীয় তীর্থ নির্বাচনের আগে মাটি খুঁড়ে বের হবে। বস্তুত ধর্মের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এ হচ্ছে রাজনৈতিক কৌশলে হিন্দু ভোট সংহত করা। সমস্যা হচ্ছে, হিন্দু বলতে শাসক দল ঠিক কাদের বোঝাতে চান তা মোটেও পরিষ্কার নয়।
তার কারণ, আমরা না হয় ঘোষিত বিজেপির নীতি বিরোধী। যে কোনো দলনিরপেক্ষ ঐতিহাসিককে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তারা নিশ্চিতভাবে আপনাকে বলে দেবেন এখন যা সনাতন ধর্ম তা কোনোকালেই একমাত্রিক নয়। বৌদ্ধ, জৈন, চার্বাকপন্থি নাস্তিকদের কথা যদি বাদ দিই, তাহলেও শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে অজস্র ভাগ রয়েছে শত শত বছর ধরে। যে হেমন্ত বিশ্ব শর্মা ন্যায়ের পরাকাষ্ঠা হয়ে টিভি চ্যানেলে বাণী দিচ্ছেন, তিনিও তো একাধিকবার বলেছেন যে, শূদ্রদের কাজ হচ্ছে ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈষ্য জাতিগোষ্ঠীর সেবা করা।
ভারতের নির্বাচন আসন্ন। এখনই আমি তথাকথিত করপোরেট পুঁজি শাসিত মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতো আগাম বলে দিতে রাজি না যে, আগামী নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ফের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিততে চলেছে। সাধারণভাবে আমরা বিজেপির যে হাঁকডাক দেখছি, এখনো মোটের ওপর তা শহরে। কয়েক বছর ধরে, নয়া অর্থনীতি ও গ্লোবালাইজেশন এদেশে ও অন্যান্য দেশে যে নিও মিডল ক্লাস, বা নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম দিয়েছে, তাদের বড় অংশ নিঃসন্দেহে মোদিভক্ত। কিন্তু তারা ভারতের কত সংখ্যক তা নিয়ে আলোচনা হোক। মনে রাখবেন, এদেশের সংগঠিত শ্রম আজও সাত আট শতাংশের বেশি নয়।
বিরানব্বই, তিরানব্বই শতাংশ অসংগঠিত শ্রমিক দলে দলে রাম মন্দির নির্মিত হয়েছে বলে আনন্দে আত্মহারা, এটা ভাবার সময় এখনো আসেনি। আসেনি বলেই তো হেমন্ত বিশ্ব শর্মা থেকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও দোর্দণ্ড পরাক্রমশালী অমিত শাহ কথায় কথায় রাহুল গান্ধীকে নিয়ে কুৎসা করতেন না। হেমন্ত বিশ্ব শর্মার ইন্টারভিউ শুনে মনে হয়, তিনি রাহুল গান্ধীকে ঈর্ষা করেন। এবং রাহুলের ন্যায়যাত্রা কতটা প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত।
বিজেপির মূল রণকৌশল এক্কেবারে গোয়েবলসীয়। এমন মিথ্যে বলতে থাকবে যাতে মিথ্যেকেই সত্যি মনে হয়। ১৯২৫ সালে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের লেখাপত্তর ঘাঁটলে যে কেউই জানতে পারবেন, নাৎসি জার্মানির দর্শন তাদের কতটা প্রভাবিত করেছিল। ফলে এখন যখন সারা ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন সংঘীদের পেয়ে বসেছে, তখন গোয়েবলসীয় মন্ত্র জপ করা তো অস্বাভাবিক নয়। জার্মানির নাৎসিবাদের উত্থানকালে কল্পিত শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল ইহুদিদের। যেন তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারলেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জার্মানির শ্রেষ্ঠত্ব হবে বিশ্বসেরা। আমাদের দেশকে জার্মানির পথে নিয়ে যেতে যারা বদ্ধপরিকর, বলাই বাহুল্য তাদের কল্পিত শত্রু এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সেই দলে শুধু মুসলমান নয়, খ্রিস্টান, এমনকি এদেশীয় দলিতরাও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
গ্রামের পর গ্রাম, বহু, বহু বছর ঘুরে বেড়াই। গো-বলয়ের কোথাও, পশ্চিমবঙ্গের কোনো জনপদেই হালে মুসলমান সমাজের মধ্যে একাধিক বিয়ে দেখিনি। বিচ্ছিন্ন দু-একটা থাকতে পারে। কিন্তু তা ব্যতিক্রম। মুসলমান জনসংখ্যা বাড়ছে, এই রটনার পেছনেও আছে রাজনৈতিক মতলব। আর রয়েছে মুসলমান অনুপ্রবেশের নানান কাহিনি। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ভোট এলেই এই অনুপ্রবেশের ঢাক বাজতে শুরু করে। অবিরাম গলা ফুলিয়ে বাংলাদেশি ঘুষপেটিয়াদের চলে আসার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়া ও বিজেপির হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে। বিদ্বেষ এমনভাবে চারিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, ইদানীং আবার ঘুষপেটিয়া নয়। বলা হচ্ছে রোহিঙ্গা। এমন ঘৃণার কারবারিরা ভুলে যান, এই দেশের সংস্কৃতি বহুত্ববাদের। এ এমন এক দেশ, যেখানে পাঁচ-দশ কিলোমিটার অন্তর ভাষা, পোশাক, চেহারা বদলে বদলে যায়। এ এমন এক দেশ, যেখানে বহু বছর ধরে পাশাপাশি বাস করেন হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ। এখানে রামকৃষ্ণ পরমহংস যত মত তত পথের কথা বলে গিয়েছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীতে। এ দেশ লালন, কবির, গুরু নানক, চৈতন্যদেবের। এখানে আজও ভোরের আজান ও সন্ধ্যারতি জনগণকে মুগ্ধ করে। বিসমিল্লাহ সানাই বাজালে গায়ে কাঁটা দিতে থাকে আজও। ভীমসেন যোশী আর আলী আকবর খান একই সঙ্গে উচ্চারিত হন। মুর্শিদাবাদের গাঁয়ে এই তো দেখে এলাম, একসঙ্গে পাট চাষ করে গোধূলি বেলায় বাড়ি ফিরছেন আজিমা বিবি ও প্রতিমা ম-ল।
ভোটের হিসাব বড় বালাই। তাই ভোটের কাঠি বাজলেই হেভিওয়েট মন্ত্রী ও নেতারা ঘটা করে দলিতদের বাসায় ভাত খাবেন। সঙ্গে আসা ক্যামেরাম্যানের দৌলতে পরের দিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তার বিশাল ছবি দেখতে দেখতে আমরা জানতে পারব, সবকা সাথ, সবকা বিকাশ। আচমকা মনে পড়ে যেতে পারে, ছত্তিসগড়ের সেই বাচ্চা মেয়েটিকে। যে অবিবেচনার লকডাউনের ফলে বাধ্য হয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির খুব কাছে এসে লুটিয়ে পড়েছিল। কিংবা বস্তারের আদিবাসী মা। যে কোলের শিশুর খিদের কান্না শুনে থাকতে না পেরে বাধ্য হয়ে বিষাক্ত আলু মুখে দিলে কোলেই শিশু মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। এত কান্না, হাহাকার, বিষাদ চাপা পড়ে যায় বা চাপা দিতেই ধর্মীয় উন্মত্ততা বাড়তে থাকে রাষ্ট্রীয় মদদে। বেকারত্ব, অভাব, কৃষকের ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যা, এনআরসি ও আরও অন্যান্য আইনের নামে নাগরিক হেনস্তা সব, সব চাপা পড়ে যায় জয় শ্রীরাম ধ্বনিতে। এ আওয়াজ রঘুপতির নয়। এ হচ্ছে রাজনীতির।
রাজনীতির কারবারিদের সঙ্গে কখনো সারা দেশকে এক করে দেখবেন না। রাষ্ট্র, সরকার ও দেশের জনগণ কোথাও কখনো এক নয়। এখনো এদেশে রাম কথকতা শোনা যায়। এখনো ধীর লয়ে নদী বয়ে যায়। আজও অজস্র দরগায় একই সঙ্গে মাথা নোয়ান হিন্দু ও মুসলমান। একই সঙ্গে হালবলদ নিয়ে মাঠে যান গরিব কৃষক। দরিয়ায় একই সঙ্গে লগি বয় মাঝিমাল্লা। হিন্দু ও মুসলমান জোয়ারে ভাসতে ভাসতে আওয়াজ তোলেন, দরিয়ার পাঁচ পীর বদর বদর...।
উত্তর প্রদেশের অখ্যাত এক জনপদে হাঁটছিলাম। সন্ধ্যা হয় হয়। দূর থেকে ভেসে আসা কাজরীর সুর এখনো কানে লেগে আছে। ছোট্ট বেলায় বাবার হাত ধরে কাশির দশাশ্বমেধ ঘাটে ভোর ভোর কুস্তি দেখতাম। বাবা আমাকে রামায়ণের গল্প বলতেন। বাবা ছিলেন কমিউনিস্ট কর্মী। বাবার রাম কথা ছিল মহাকাব্য। তার সঙ্গে কোনো ঢক্কানিনাদের কাহিনি ছিল না। এ ভারত সাবেক জনসংঘ, অধুনা চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অশ্লীল রচনা লিখতে চলেছে। আসাম দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। গুজরাট ছিল দুহাজার দুই সালে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ল্যাবরেটরি। এখন আসাম হচ্ছে কল্পনার হিন্দু রাষ্ট্রের গবেষণাগার। বিকৃত ইতিহাস ও বিদ্বেষ জনমনে চারিয়ে যা গড়ে তুলতে সংঘ পরিবার দৃঢ়সঙ্কল্প।
লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক
sdastidar27@gmail.com