২৩ বছরের দখল হারিয়ে হতাশায় গারোরা

হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলা নিয়ে ময়মনসিংহ-১ আসন গঠিত। গারো পাহাড়ঘেঁষা এই আসনটি ১৯৯১ সাল থেকে আওয়ামী লীগ ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গারো সম্প্রদায়ের দখলে। কিন্তু দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হকের কাছে হেরে এই আসনের দখল হাতছাড়া হয় আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ও গারো সম্প্রদায়ের জুয়েল আরেংয়ের।

এই আসন থেকে ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন গারো সম্প্রদায়ের প্রমোদ মানকিন। এরপর ১৯৯৬ সালে তিনি বিএনপির প্রার্থী আফজাল এইচ খানের কাছে হেরে যান। ২০০১ সালের নির্বাচন থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি প্রমোদ মানকিনকে। ২০০১, ০৮, ১৪ সাল পর্যন্ত টানা ৩ বার সংসদ সদস্য হিসেবে নৌকা প্রতীক নিয়ে জয় লাভ করেন প্রমোদ মানকিন।

২০১৬ প্রমোদ মারা গেলে উপ নির্বাচন থেকে বিজয়ী হন তার ছেলে ছেলে জুয়েল আরেং। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে জয়লাভ করে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৭ ই জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জুয়েল আরেং পরাজিত হন। তার পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে এই আসনে টানা ২৩ বছরের দখল হারাতে হয়েছে গারো সম্প্রদায়কে।

১৯৯১ সালের ৫ম নির্বাচন থেকে ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচন এই ৩২ বছর ১১ মাসের মধ্যে প্রায় ২৮ বছরই এই আসনের দখল ছিল প্রমোদ ও তার ছেলে জুয়েল আরেংয়ের। এবার দীর্ঘদিন পর সেই নেতৃত্ব হাতছাড়া হওয়ায় হতাশা বিরাজ করছে সারা দেশের গারো সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে জুয়েল হেরে যাওয়ায় সংসদে গারোদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার জন্যে সরাসরি কেউ থাকল না।

ময়মনসিংহ-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৫২ জন। তাদের মধ্যে ৩৫-৪০ হাজার ভোটার গারো সম্প্রদায়ের। ফলে ভোটের মাঠে গারোদের ভোট ই ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। ফলে এই সুবিধা সবসময় আদায় করতে আওয়ামী লীগ গারো সম্প্রদায় থেকেই তাদের প্রার্থী করে আসছে, যার সুফল ও তারা পেয়ে আসছে। এবার যেহেতু বিএনপি ভোট বর্জন করেছে ফলে ভোট ভাগাভাগির সম্ভাবনা কমে যায় এবং জুয়েল আরেং হেরে যান। একাদশ নির্বাচনে জুয়েল আরেং ২ লাখ ৫৮ হাজার ৯২৩ ভোট পেলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে পেয়েছেন মাত্র ৭৩ হাজার ৮৫২ ভোট। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হক পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৫৩১ ভোট।

গারো সম্প্রদায়ের নরেন তুজু মনে করেন, জুয়েল আরেংয়ের হারের মধ্যে দিয়ে কার্যত নেতৃত্ব হারাল গারো সম্প্রদায়। গারোদের ভোট ফ্যাক্টর কাজে লাগাতে এই আসনে আওয়ামী লীগ এতদিন প্রার্থী করলে আগামী নির্বাচনে তা অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দেশের আর কোনো আসন থেকে গারো সম্প্রদায়ের কারও জয়ের ও কোনো সম্ভাবনা নেই।

জুয়েল আরেংয়ের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দুই উপজেলার আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা প্রকাশ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে দায়ী করা হচ্ছে। পাশাপাশি গারো সম্প্রদায়ের বাইরে তার ভোট অনেকটাই কমে যাওয়া উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এলাকাভিত্তিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। নির্বাচনের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহমুদুল হক সাম্প্রদায়িক উসকানি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গারো সম্প্রদায় নিয়ে নানা নেতিবাচক প্রচারণার ও অভিযোগ রয়েছে গারোদের পক্ষ থেকে।

নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য জুয়েল আরেং বলেন, ভোটে জিততে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছিল। গারো বিরোধী স্লোগান ও প্রচারণা চালানো হয়েছে। দলের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিলো। আমি সংসদ সদস্য থাকার কারণে সম্প্রদায়ের সবাই যে নিরাপত্তা বোধ করতেন তা কমে গেছে। এরপরও আওয়ামী লীগ সরকার যেহেতু ক্ষমতায় আছে সেই ভয় খুব একটা প্রকট নয়।