পৃথিবীতে অন্যতম জীবন্ত রহস্যের নাম বুশরা বিবি। ইমরান খানের তৃতীয় স্ত্রীকে নিয়ে গুজব আর কৌতূহলের শেষ নেই। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
ব্রিটেনের জেমিমা গোল্ডস্মিথ এবং রেহাম খান ছিলেন মডেল এবং সাংবাদিক। যাদের সবাই চেনে। যাদের চেহারাও দেখেছে বিশ্ববাসী। কিছু খোলামেলা পোশাক পরতেও তারা কার্পণ্য করতেন না। এদের দুজনকেই বিয়ে করেন পাকিস্তানের ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইমরান খান। যথারীতি তাদের সঙ্গে বিচ্ছেদও ঘটে ইমরানের। এরপর তিনি যাকে বিয়ে করেন তার নাম বুশরা মানেকা বা বুশরা বিবি। যিনি সারাক্ষণ পর্দার অন্তরালে থাকেন। যাকে কেউ চেনেন না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইমরান খান ২০১৮ সালে বলেছিলেন তিনিও বিয়ের আগ পর্যন্ত বুশরা বিবির মুখ দর্শন করতে পারেননি। যা তার জন্য সেই আশির দশকে ছিল অকল্পনীয়। যখন তিনি রাত কাটাতেন লন্ডনের ক্লাবে। ইমরানের মতে, বুশরা বিবির বুদ্ধিমত্তা ও চরিত্রই তাকে আকৃষ্ট করেছিল। তবে পাকিস্তানবাসী বা পৃথিবীর অন্য অনেকের ধারণা, বুশরা বিবির রয়েছে অলৌকিক ক্ষমতা। যে কারণে ইমরান তাকে বিয়ে করেন। এ নারীর কিছু অনুসারীও রয়েছেন। তিনি যাদের আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা হিসেবে সম্মান পেয়ে আসছেন।
আত্মার সঙ্গী
নিজের সংসার জীবন নিয়ে সাংবাদিক আতিকা রেহমানকে নিজের বিয়ে ও সংসার জীবন নিয়ে ইমরান খান বলেন, ‘‘সহজভাবে বলতে আমি আসলে কখনো ‘আত্মার সঙ্গী’ (সোলমেট) পাব সেটা বিশ্বাস করিনি। কিন্তু আমি এখন জানি একজন আত্মার সঙ্গী কী। আমি আমার জীবনের বেশির ভাগ সময় একা ছিলাম, অনেক বিয়ে ভেঙে যেতে দেখেছি... আমি বিয়ে করতে চাইনি আর, কারণ আমি ভেবেছিলাম এ কাজ আর করব না। মাঝে মাঝে, আমি এই শব্দটি ‘আত্মার সঙ্গী’ শুনতাম... এবং আমি ভাবতাম, আমি কি কখনো সেই সৌভাগ্য পাব?’’
তিনি জানান, নেলসন ম্যান্ডেলা একবার তাকে এবং জেমিমাকে তহবিল সংগ্রহের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখানে ম্যান্ডেলা এবং তার শেষ স্ত্রী গ্রাসা মিশেলকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখেন। তাদের ভেতরের প্রেম ওই অবস্থায়ও বোঝা যাচ্ছিল। ইমরান তখন মনে মনে ভাবছিলেন, ‘‘আমার কি কখনো একজন ‘আত্মার সঙ্গী’ হবে? তবে এখন আমার একজন (বুশরা বিবি) আছে’’।
ইমরান-বুশরার বিয়ে হয় ২০১৮ সালে। এর আগে ২০১৪ সালে প্রথম স্ত্রী জেমিমার সঙ্গে ইমরানের বিচ্ছেদ হয়। তাদের সেই বিয়ে টেকে ৯ বছর। এরপর তিনি রেহাম খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। রেহাম খান ছিলেন একজন ব্রিটিশ-পাকিস্তানি। তিনি সংবাদমাধ্যম বিবিসির আবহাওয়া উপস্থাপক হিসেবে কাজ করতেন।
দণ্ডিত দম্পতি
পাকিস্তানের সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র ইমরান খান। এ বিষয়ে খুব একটা সন্দেহের অবকাশ নেই। পাকিস্তানকে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রীও হন তিনি। তিন বছরের মাথায় আদালতের রায়ে ছাড়তে হয় ক্ষমতা। এরপর তাকে গুলিতে হত্যার চেষ্টা হয়। বর্তমানে রয়েছেন কারাগারে। বিবিসি বাংলা জানাচ্ছে, পাকিস্তানের একটি আদালত ইমরান ও বুশরার বিয়ে অবৈধ বলে রায় দিয়েছে এবং তাদের সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। আদালত বলেছে, বুশরা বিবির সঙ্গে ইমরান খানের বিয়ে অনৈসলামিক এবং অবৈধ। তাদের উভয়কে ২ মিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা করা হয়। আর এ রায়ের পর সারা বিশ্বের পাঠক জানতে চাইছে বুশরা বিবি কে?
পাকিস্তানে আসছে সপ্তাহেই সংসদ নির্বাচন। যাতে আর অংশ নেওয়া হচ্ছে না ইমরানের। তবে তার পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বলছে, তারা বিশ্বাস করে পাকিস্তানে এ সপ্তাহের সাধারণ নির্বাচনে জিততে পারে তাদের দল। তাদের দাবি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কাজে লাগিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে।
পাকিস্তানের রাস্তায় এখনো তার দলের নেতাকর্মীরা ইমরান খানের ছবি দিয়ে তৈরি ব্যানার, পোস্টার হাতে রাস্তায় অবস্থান করছে। তাদের বক্তব্য, আমি ইমরান খানের সঙ্গে আছি এবং ইমরান খানের সঙ্গেই থাকব। যদি আমাকে জনসমক্ষে একা ছেড়ে দেওয়া হয়, তবুও আমি ইমরান খানের পতাকা নিয়ে রাস্তায় নামব। সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে আদালতের রায়ে ইমরানের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ছে।
এর আগেও ইমরানকে তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করতে গেলে নেতাকর্মীরা অবরোধ গড়ে তোলে। তারা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ইমরানকে গ্রেপ্তার থেকে সরে আসে দেশটির পুলিশ। পরে অবশ্য আদালত এলাকা থেকে ইমরানকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই থেকে দলটির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দমন অভিযান চালু রয়েছে বলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়।
বিবিসি জানায়, ইমরান খান ১৩ শতকে নির্মিত এক দরগায় পরামর্শের জন্য গিয়েছিলেন পাঁচ সন্তানের মা বুশরা বিবির কাছে। বুশরা বিবির তখনকার স্বামী ছিলেন খাওয়ার মানেকা। ২০১৭ সালে বিচ্ছেদের আগে তারা ২৮ বছর একসঙ্গে সংসার করেন।
ডন এক প্রতিবেদনে জানায়, সরকারি কর্মচারী এবং সুপরিচিত এক রাজনীতিবিদের ছেলে খাওয়ার মানেকা। নভেম্বরে তিনি বুশরার নামে ‘বিয়েতে প্রতারণা এবং ব্যভিচারের’ অভিযোগ দায়ের করেন। ব্যভিচারের অভিযোগ বাতিল করলেও প্রতারণার অভিযোগটি আমলে নেয় আদালত। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্য এ দম্পতির ১৪ বছর জেল হয়েছে।
পিটিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও আইনজীবী গোহর আলি খান বলেছেন, বুশরা বিবির সাজা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর (ইমরান) ওপর চাপ সৃষ্টির আরেকটি প্রচেষ্টা। রয়টার্স জানায় স্থানীয় একটি টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে তিনি বলেন, এ মামলার সঙ্গে বুশরা বিবির কোনো যোগসূত্র নেই। বুধবার গভীর রাতে একটি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে ইসলামাবাদে তার বাসভবনে গৃহবন্দি রাখা হবে।
স্বপ্নে পাওয়া
ইমরান খানকে সব বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন একজনই, আর তিনি বুশরা বিবি। পাকিস্তানে অনেকের ধারণা, বুশরা বিবি সুফি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তবে অন্যরা তা মনে করেন না। বিবিসি জানায়, ইসলামিক রহস্যে ঘেরা সুফিবাদ স্রষ্টার অনুসন্ধান এবং পার্থিব বিষয় ত্যাগের ওপর জোর দেয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইমরান খান এই ধারার প্রতি আগ্রহী।
কথিত আছে, এ সময় একদিন বুশরা বিবি স্বপ্নে দেখেন যে কেবল তাদের বিয়ে হলে ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন। এরপর তারা বিয়ে করেন এবং ছয় মাস পর ইমরান দেশটির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। বুশরা ২০১৮ সালের অক্টোবরে তার দেওয়া একমাত্র টিভি সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টির সত্যতা নাকচ করে দেন।
বুশরাকে নিয়ে এমন গুজব চালু আছে যে তিনি জাদু জানেন এবং মাংস খাওয়া জিনদের একটি বাহিনীকে পালেন।
বুশরাকে বিয়ের পর ইমরান খান দাফনে যোগ দেওয়া বন্ধ করে দেন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বা সহযোগী হলেও দাফনে উপস্থিত হতেন না। অনেকের সন্দেহ, ইমরান খান বিশ্বাস করছেন যে, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে একই ঘরে থাকলে দুর্ভাগ্য বাড়বে তার। এমনকি ২০২১ সালে তিনি বেলুচিস্তানে ইসলামিক স্টেটের হাতে নিহত সংখ্যালঘু হাজারা জাতির খনি শ্রমিকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিতর্কিত হন। এসব সংস্কার বুশরার পরামর্শেই ইমরান মেনে চলতেন বলে ধারণা।
এ ছাড়া আরও শোনা যায়, ইমরানের নানা ধরনের ‘কুসংস্কার’ সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্কে প্রথম ফাটলের জন্ম দেয়। যার একটি ছিল গোয়েন্দা প্রধান নিয়োগে তার অতিরিক্ত সময় নেন। পাকিস্তানের এক মন্ত্রীর দাবি, জনৈক নারী (বুশরা বিবি) তাকে উপযুক্ত সময়ে গোয়েন্দা প্রধান নিয়োগের ঘোষণা দিতে বলেছিলেন। যার কারণে বিলম্ব ঘটে। আর এ ফাটল বড় হতে হতে ইমরানের বর্তমান পরিণতি।
পারবেন কি ইমরান
বিবিসি জানাচ্ছে, ইমরান ক্ষমতায় আসেন যে নির্বাচনের মাধ্যমে, তখনো সামরিক কৌশল দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল নির্বাচন। যার দ্বারা ইমরান উপকৃত হয়েছিলেন। তখনো ব্যাপক মাত্রায় দমন-পীড়ন ও কারসাজি করা হয়েছিল। পিএমএল-এন দলের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে কারাদণ্ড ঘোষণা করা হয়। যার মধ্যে নওয়াজ শরিফের ১০ বছরের জেল হয়।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ওই পরিস্থিতি বর্তমান সময়ের তুলনায় আলাদা। এবার দমন, গ্রেপ্তারের তীব্রতা বেশি। জেলে যাওয়া নেতা ও সমর্থকদের সংখ্যা বেশি। এবার ইমরানের দলের পরিবারের সদস্যদেরও এতে জড়ানো হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাকিস্তানের টিভি চ্যানেলগুলো ইমরানের প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ বা বিলাওয়াল ভুট্টোর নির্বাচনী সমাবেশের কভারেজে ভরপুর। নির্বাচনের আগের সপ্তাহে পিটিআই যে কভারেজ পেয়েছে তা হলো তাদের প্রতিষ্ঠাতা নেতার কারাদণ্ডের খবর।
বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ সক্রিয়ভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। পিটিআই যতটা ভালো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করতে পারবে, তত তাদের পক্ষে ভোট বাড়ানোর সুযোগ থাকছে।
তিনি আরও বলেন, পিটিআই নেতৃত্বের কাছে প্রশ্ন হলো ইমরানের সঙ্গে যা কিছু ঘটছে তা সত্ত্বেও কীভাবে একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠীকে ভোট দেওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করা যায়। পিটিআই মনে করে যদি তারা তাদের ভোটারদের কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারে তবে তারা একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটিয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারবে।