‘বইমেলা প্রকাশকদের হাতে দ্রুত ছেড়ে দেওয়া উচিত’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় পড়াশোনা শেষ করে তিন বন্ধু মিলে ‘অন্যদিন’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা করেছিলেন। গেটআপ, মেকআপ আর কনটেন্টে নতুনত্ব নিয়ে পত্রিকার সাফল্য ছিল বাংলাদেশের পাক্ষিক পত্রিকার ইতিহাসের একটি নতুন ঘটনা।

‘অন্যদিন’ পত্রিকার সহোদর প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে এ সময়ের অগ্রগণ্য প্রকাশনা সংস্থা ‘অন্যপ্রকাশ’। অন্যদিনের ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদের বই রূপার পালঙ্ক বইমেলায় প্রকাশ করে সে বছর। ওই মেলায় বইটি ৫৫ হাজার কপি বিক্রির রেকর্ড চমকে দেয়  হুমায়ূন আহমেদের মতো আমাদের প্রকাশনা অঙ্গনের অনেক প্রকাশককেও।

সেই সময়ের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদের বই পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। মুগ্ধকর তাকে মুগ্ধ করে তার বই পাওয়ার গল্প মাজহার একাধিকবার লিখেছেন, বলেছেন। তাতে বোঝা যায় একাধারে সাংবাদিক, নাট্যনির্মাতা, গল্প লেখক, অন্যদিন সম্পাদক, অন্যপ্রকাশের প্রকাশক মাজহারুল ইসলামের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ও ক্যারিশমা। বলছিলেন, ‘১৯৯৯ সালে হুমায়ূন আহমেদকে পাশে না পেলে কোনোভাবেই অন্যপ্রকাশ আজকের অবস্থানে থাকত না।’ 

সেই প্রারম্ভিক ধামাকার পর অন্যপ্রকাশকে পেছনে ফিরে আর তাকাতে হয়নি। হুমায়ূন আহমেদ অন্যপ্রকাশ আর মাজহারুল ইসলাম যেন হয়ে উঠেছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। ২৫ বছর পেরিয়ে মাজহারুল ইসলাম এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠিত প্রকাশক এশিয়া প্যাসিফিক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সহসভাপতি, বইমেলা পরিচালনা কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এবার তিনি বইমেলায় অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে রিকশা পেইন্টিংয়ের মোটিফ ব্যবহার করেছেন, যা মেলায় নজর কাড়ছে সবার।

২৫ বছরে অন্যপ্রকাশের সাফল্যে সামগ্রিক প্রকাশনা উপকৃত হয়েছে বলে গর্ববোধ করেন মাজহারুল ইসলাম। এখন নিজেদেরই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে প্রতিদিন আপডেট করছেন বলে জানালেন বাংলাদেশের প্রকাশনায় অনেক প্রথমের শুরু করা মাজহার। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রকাশনার মান বাড়লেও তুলনামূলকভাবে ভালো বইয়ের সংখ্যা, মানসম্পন্ন বইয়ের সংখ্যা বাড়েনি।

মেলার আয়োজন বিষয়ে মাজহার বলেন, এবার একটা দক্ষ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান না থাকার অভাব এরই মধ্যে অনুভব করা শুরু করেছেন প্রকাশকরা। মেলার চতুর্থ দিনেও যদি ময়লা হয়ে থাকে মেলা, যত্রতত্র ইট আবার কাদা মেখে থাকে মাঠ এই দায় কে নেবে?

পাঠকদের বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বসার কোনো ব্যবস্থা এবার মেলায় রাখেনি বাংলা একাডেমি। প্রসঙ্গটি তুলতেই মাজহার বলেন, মেলার অরাজকতা নিরসনে দ্রুতই বাংলা একাডেমির উচিত এই মেলা প্রকাশকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া। প্রকাশকরা আয়োজন করলে মূলত গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির প্রায় দুই মাস গবেষণাকাজ বাদ দিয়ে মেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হবে না। পাশাপাশি তিনি মনে করেন, এই মেলার জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুদান জরুরি। বই কেনায় ও পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি গড়ে তুলে পাঠক তৈরি করায় সরকারের আরও মনোযোগ দাবি করেন তিনি।

প্রকাশনার বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে পাঠকের সামর্থ্যরে মধ্যে বইয়ের দাম রাখা। সেটা করা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ দেশীয় কাগজে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের আধিপত্য। দেশে যারা কাগজ বিক্রেতা, তারা দৈনিক পত্রিকা ও প্রকাশনার দিকে না তাকিয়ে ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে। এর একমাত্র সমাধান এখন শুল্কমুক্ত কাগজ আমদানিতে সরকারের অনুমোদন। সেটা হলেই কেবল প্রকাশনা বাঁচানো সম্ভব। বলছিলেন মাজহারুল ইসলাম।

এবারের বইমেলায় ফিকশন, নন-ফিকশন গবেষণা মিলিয়ে নতুন ১০০-এরও বেশি বই প্রকাশ করছে অন্যপ্রকাশ। এর মধ্যে মাজহারের ভাষায় কলকাতা বইমেলায় অভূতপূর্ব দৃশ্যের রচয়িতা এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসেনের উপন্যাস রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুবিষয়ক বইও রয়েছে অন্যপ্রকাশের তালিকায়।