পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। এটি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ বছরেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দাঁড়াতে পারেনি। অনিয়ম, দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারে প্রতিষ্ঠানটি ডুবতে বসেছে। তিন বছর ধরে এটির উপাচার্য (ভিসি) নেই।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এই প্রতিষ্ঠানে নেই উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ। ১৩ বছর ধরে সমাবর্তন হয় না। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব ও উপদেষ্টার স্বেচ্ছাচারিতায় বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও রুগ্ণ হচ্ছে।
সম্প্রতি পিপলস ইউনিভার্সিটির সদস্য সচিব ও উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামীমা নাসরিন শাহেদের স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) অভিযোগ জমা পড়েছে। ইউজিসি তা আমলে নিয়ে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে। কমিটির আহ্বায়ক কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. হাসিনা খান।
ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. ওমর ফারুখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। কমিশন তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাবে।’
অভিযোগে বলা হয়েছে, অধ্যাপক শামীমা নাসরিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিষয়ের শিক্ষক হলেও পিপলস ইউনিভার্সিটির দুটি বিভাগে গেস্ট টিচার হয়ে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। তিনি ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের এমবিএ কোর্সে এবং ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে অতিথি শিক্ষক (গেস্ট টিচার) হিসেবে রয়েছেন। অথচ তেমন কোনো ক্লাস নেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব হিসেবেও ভাতা নেন। উপদেষ্টা হিসেবেও ভাতা, ঈদ বোনাস, বৈশাখী ভাতা নেন ও সার্বক্ষণিক গাড়ি ব্যবহার করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি প্রজেক্টের পরিচালক হিসেবেও বেতন-ভাতা নিচ্ছেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফাউন্ডেশন ফর পিপলস এডুকেশন’, ৩/২ আসাদ অ্যাভিনিউয়ের সম্পত্তি ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে ‘ড. আবদুল মান্নান ফিজিওথেরাপি ইনস্টিটিউট ও কলেজ’-এর সঙ্গে ভাড়ায় চুক্তি দেখিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের আবেদন করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১৫ সদস্যের একটি ট্রাস্টি বোর্ড থাকলেও তা অকার্যকর। ওই বোর্ডের সদস্য সচিব ও উপদেষ্টা অধ্যাপক শামীমা নাসরিন টানা ৯ বছরেরও বেশি সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা করছেন। তিনি চান না এই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতিনিয়োজিত ভিসি আসুক। এতে তার একক কর্তৃত্ব খর্ব হতে পারে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রোভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ১৩ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন হয় না। অথচ শামীমা নাসরিন তিন বছর আগে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা সমাবর্তন বাবদ নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শামীমা নাসরিন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় ও অযোগ্য লোক নিয়োগ দিয়েছেন। তাদের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে ভাটা পড়েছে। এসব নিয়ে কেউ কথা বললেই তিনি তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস নরসিংদীতে বদলি করে দেন।
জানা যায়, গত ৩০ জুলাই পিপলস ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মুহম্মদ নাজমুল হাসান বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান বরাবর শামীমা নাসরিনের ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী কর্মকর্তারা ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব সমঝোতা করে সিন্ডিকেট, নিয়োগ কমিটি, আর্থিক নীতিমালা, মেমোরেন্ডাম অব আর্টিকেলস অমান্য করে জনবল নিয়োগ, ব্যক্তিগত কাজে গাড়ি ব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয় তহবিলের অর্থ তোলা ও অপচয় করছেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ আগস্ট দুজন ট্রাস্টির সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ট্রাস্টিরা হলেন কাজী সিরাজুল ইসলাম ও ডা. মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ। কমিটি গঠনের আদেশে সই করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবু বকর সিদ্দিক। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। এখনো প্রতিবেদন জমা হয়নি।
গত ১৪ নভেম্বর বিস্তারিত জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি দেন ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মুহম্মদ নাজমুল হাসান। এর আগে গত ১৬ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন শিক্ষার্থী ইউজিসিতে আরেকটি অভিযোগ জমা দিয়েছিলেন। ইউজিসি ব্যাপারটি তদন্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অভিযোগের ব্যাপারে অধ্যাপক শামীমা নাসরিন শাহেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ব্যাপারে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, তার কোনোটিই সঠিক নয়। আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। বেতন-ভাতা নেওয়ার তথ্যও সঠিক নয়। একটি গ্রুপ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমার বাবা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। আমি যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে না পারি, সেজন্য তারা খুব তৎপর।’