বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল ১৭ ডিসেম্বর। তবে তারা উদযাপন করবে আগামী শুক্রবার। তাদের উৎসবে শামিল হতে এ আয়োজন। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সদ্যস্বাধীন কোনো দেশকে গড়ে তুলতে হলে এগিয়ে আসতে হয় মধ্যবিত্তকে। তবে সেই মধ্যবিত্তের শক্তির উৎস হলো প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কয়েকজন তাদের শ্রম, মেধা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এ শিক্ষাবিদ, সংগঠক অনেকটা একক প্রচেষ্টা ও দৃঢ় মানসিকতা নিয়ে গড়ে তোলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। এক সময় ছোট আকারে শুরু হওয়া সেই সংগঠন এখন মহীরুহু। ডালপালা বিস্তৃত করেছে সমগ্র দেশে। কয়েক প্রজন্ম এখন যুক্ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে।
এ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল গত ১৭ ডিসেম্বর। তবে নানা জটিলতায় সে সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো অনুষ্ঠান পালন করেনি। বাংলা মোটরে তাদের বর্তমান ভবনে আগামী শুক্রবার উদযাপন করা হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সাজানো হয়েছে ‘বিশ্বসাহিত্যের গলি’। দেশের সাহিত্য অনুরাগী পাঠক মহলের সবসময় আগ্রহ থাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে। তাদের আগ্রহকে লক্ষ্যবস্তু করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট আলোচনার প্রয়াস চালানো হলো এ লেখায়।
মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশের মধ্যবিত্তকে ধরা হয় রুচিনির্ভর মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর্থিকভাবে ভঙ্গুর, সামাজিক দিক দিয়ে অস্থির মধ্যবিত্তের সম্বল ছিল তার রুচি বা প্রজ্ঞা। বাঙালি মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিক ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কোনো মজবুত শ্রেণি নয়। বদরুদ্দীন উমর লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা মধ্যবিত্ত বলতে যাদের বোঝায় তাদের উদ্ভব ভারতে ব্রিটিশ আমলে। নিজেদের ঔপনিবেশিক স্বার্থ সংহত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা বাংলাদেশে প্রবর্তন করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই বন্দোবস্তের মাধ্যমে যে ভূস্বামী বা জমিদার শ্রেণি সৃষ্টি হলো তাদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে ইউরোপের সামন্ত ভূস্বামীদের পার্থক্য ছিল। এই পার্থক্যের মধ্যে সব থেকে উল্লেখযোগ্য ছিল এই যে, এই শ্রেণিটির নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা বলতে কিছু ছিল না। তারা ছিলেন ঔপনিবেশিক শাসকদের অধীনস্ত এবং তাদেরই ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল একটি শ্রেণি।’
এখানে মধ্যবিত্তের আর্থিক বা সামাজিক মানদণ্ড বলতে ছিল জমিদারের চাকরি বা যার বিবর্তিত রূপ ছিল সরকারি অথবা অন্য চাকরি। নীরদ চন্দ্র চৌধুরীও লিখেছিলেন, ‘‘ভদ্র বাঙালির মধ্যে যাহাদিগকে ‘মধ্যবিত্ত’ বলা হইত তাহারা জীবিকার জন্য কোনো-না-কোনো কাজ করিয়া অর্থ উপার্জন করিত। ভদ্রলোক বাঙালির মধ্যে সম্পন্ন ও মধ্যবিত্তের বংশগত কোনো পার্থক্য ছিল না। রবীন্দ্রনাথের একটি গল্পের নায়িকা বলিয়াছিল, ‘আমাদের বড় জায়ের বংশে কুল ছাড়া আর বড় কিছু ছিল না, রূপও না, টাকাও না।’ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরানী’-তেও ইহার পরিচয় পাওয়া যায় প্রফুল্লের দিকে অর্থ ছিল না, রূপ ছিল; নয়নতারার দিকে শুধু কুল ছিল, রূপও ছিল না, টাকাও ছিল না; সাগরের দিকে কুল, রূপ, টাকা সবই ছিল। এরূপ বহু দৃষ্টান্ত উপন্যাস ছাড়া বাস্তব জীবন হইতেও দেওয়া যাইতে পারে।”
মোদ্দা কথা মধ্যবিত্ত বলতে বাঙালি সমাজে যাদের চেনা যায় তারা এ রকম রুচিশীল, সাহিত্যপড়া গোষ্ঠী। হিমাল সাউথ এশিয়ান ম্যাগাজিনে তিন বিশ্লেষক লিখেছিলেন, বাঙালি মধ্যবিত্তকে চেনা যায় তাদের শোবার ঘর আর বসার ঘর দেখে। শোবার ঘর বাঙালি মধ্যবিত্ত গুছিয়ে রাখেন। সেখানে নিকটাত্মীয় হয়তো একেবারে কাছের বন্ধু ছাড়া কাউকে ঢুকতে দেন না। আবার বসার ঘর বা ড্রয়িং রুম থাকে নানাভাবে সাজানো, যেখানে যে কোনো অতিথিকে বসতে দেওয়া হয়। আর আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলা হয় ঘরটিতে।
স্বাধীন বাংলাদেশে মধ্যবিত্তকে তৈরি করতে চেয়েছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি ‘আলোকিত মানুষ’ তৈরির কারিগর। বাংলাদেশে আশি-নব্বইয়ের দশকে গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞাপন নির্মাণ, সিনেমা বা নাটক সব এই ‘আলোকায়ন’ দ্বারা প্রভাবিত।
সংগঠন ও বাঙালি
শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা ‘সায়ীদ স্যার’ অবশ্য বলেছিলেন, বাঙালি মনের দিক থেকে সংগঠন গড়ে তোলার জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বইয়ে লিখেছিলেন, ‘আজ আমাদের জাতির মধ্যে আমরা যে-অলজ্জ আত্মস্বার্থকেন্দ্রিকতা দেখি তা আজকের ব্যাপার নয়। ব্রিটিশ রাজকর্মচারীরা বাঙালির মধ্যে যখন এই হীনতাগুলো দেখেছিল এ তার চাইতেও অনেক পুরনো। এই জাতির অতীতের দিকে তাকালে বাঙালির যে-চেহারা চোখে পড়ে তা খুব-একটা সম্মানজনক নয়। মাত্র একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যা লিখেছিলেন তাতেও রয়েছে এরই প্রতিধ্বনি : ‘সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী,/রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি।
কথাটার মানে একটাই বাঙালি আজও মানবপদবাচ্য নয়। শক্তিতে নয় বলে মহত্ত্বে বা মর্যাদাতেও নয়। তবে কথাটার ইতিবাচক দিক এটুকুই যে, কথাটা উনি বলেছিলেন এই জাতির জন্য অপরিসীম বেদনাবোধ ও ভালোবাসা থেকে। গভীর দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তিনি ভাবতে চেয়েছেন সেই অনাগত দিনের কথা যেদিন বাঙালি তার তথাকথিত বাঙালিত্বকে ডিঙিয়ে মানুষের মর্যাদাবান ভূমিকায় দেখা দেবে।’
তবে সেই জড়তা, অক্ষমতা কাটিয়ে ওঠা যে সম্ভব, তার প্রমাণ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এর জন্য তিনি যে পন্থা বেছে নিয়েছেন তা জানা যায় তার আরেকটি বইয়ে। বইটির নাম ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি’। সেখানে সংগঠন গড়ে তুলতে তার দুটি তত্ত্বের কথা বলা জরুরি। একটি হলো তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো নিরিবিলি, লোকালয় থেকে দূরে, শান্ত কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাননি। তিনি চেয়েছেন বাংলাদেশের বাস্তবতার ভেতরেই, ঢাকা শহরের কেন্দ্রে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে। তার দ্বিতীয় তত্ত্ব হলো, সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা।
যেভাবে কেন্দ্র
এ বিষয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ একই বইয়ে লিখেছেন, ‘অনেকদিন পর্যন্ত আমি সত্যি সত্যি চেষ্টা করেছি মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় কোথাও এটার অফিস নিতে, জাতির কর্মমুখর বাস্তবতা এবং হিংস্র উদ্যমের মূল প্রাণকেন্দ্রে। ... এই কেন্দ্র থেকে পাঠ নিয়ে একদিন যাদের এই জাতিকে দিকনির্দেশনা দিতে হবে, আমি বিশ্বাস করি, তাদের উত্থিত হতে হবে এই জাতির সর্বময় রাষ্ট্রপ্রক্রিয়ার বাস্তব ভিত্তিমূল থেকে।... জীবন-সংগ্রামের দাঁতাল আক্রমণ থেকে দূরে, প্রকৃতির শান্ত নির্জন পরিবেশে, জীবন-বিচ্ছিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা আমার পছন্দ নয়। শান্তিনিকেতনের মতো তপোবন আদর্শে গড়ে তোলা শিক্ষাপ্রণালি একালের নিষ্ঠুর রক্ত-সংঘাতের যুগে খানিকটা অচল বলেই আমার ধারণা।’
তিনি তার প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘...আমি জানি, এই কেন্দ্রের সামনে আজ যদি সত্যিকার করণীয় কিছু থাকে তবে তা হচ্ছে দুটো : এক. আজকের তরুণদের অর্থাৎ আগামী দিনের মানুষদের বড় করে তোলা; দুই. তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা।’
সে আলো ছড়িয়ে গেল
সংগঠন গড়ে তোলার যে তাত্ত্বিক ভিত্তিকে তিনি আশ্রয় করেছিলেন, সে বিষয়ে ওই বইয়ে লেখেন, ‘প্রথম থেকেই টের পেয়েছিলাম এদেশে ভালো কিছু করতে হলে করতে হবে অজান্তে, অলক্ষ্যে। তার বিকাশ খাড়া বা উভূমিক vertical) হলে চলবে না, হতে হবে আনুভূমিক (horizontal)। নিঃশব্দ সাফল্যই এদেশের একমাত্র শর্ত। এজন্যই রাজধানীর ভেতর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে উঁচু করে তৈরির চেষ্টা করিনি। একই জিনিসকে সারা দেশে গুঁড়ো-গুঁড়ো করে ছড়িয়ে দিয়েছি। ঢাকায় একটা উঁচু মনুমেন্ট গড়ে তোলার চেয়ে সারা দেশকে ছোট ছোট তুলসীতলার অজস্র প্রদীপে ভরে দেওয়া ভালো। চারপাশের হাজার হাজার ঈর্ষা আর হীনতার তীক্ষè-চোখ ফাঁকি দিয়ে আমাদের এগোতে হচ্ছে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কাঠামো তৈরির সময় আমি কেন্দ্রের শীর্ষকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করিনি, ফরাসি আদলে এর শক্তিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এর প্রতিটি শাখাকে গড়া হয়েছে এক-একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে। এটা করেছি একটা ভয় থেকে। ভয়টা হলো, মূল কেন্দ্র যদি কোনোদিন না-ও থাকে, তবু যেন স্বয়ম্ভূ কেন্দ্র হিসেবে এই শাখাগুলো টিকে যায় নিজেদের শক্তিতে, নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে। শাখাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে এদের আমরা দুর্বল করতে চাইনি। স্বাধীনতা আর দায়িত্ব দিয়ে সবাইকে সাবালক হতে উৎসাহিত করেছি। মূল কেন্দ্রের সঙ্গে এর যে যোগাযোগ তা এক ধরনের বাস্তব ও আত্মিক সহযোগিতার যোগাযোগ, নিয়ন্ত্রণের নয়। শাখাগুলোকে আমরা কেন্দ্রের ওপর আশ্রিত করে বড় করিনি, চোখ রাঙানি দিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করিনি, বরং কেন্দ্র থেকে সামান্য সাহায্য পেলে, এমনকি না-পেলেও যাতে একা একা নিজেদের সাংস্কৃতিক সংগ্রাম এরা চালিয়ে যেতে পারে, সেই ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছি।’
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এগিয়ে যাবে অবশ্যই। তবে বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবন ও অভিজ্ঞতা, তার দর্শন, কার্যকর ভূমিকা থেকে শিক্ষা নিয়ে একদল তরুণ এ দেশে বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে যেন এগিয়ে আসে। তাহলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সার্থক হবে। এমনটা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই মনে করেন। তিনি বিপ্লবী তরুণ-তরুণীদের পছন্দ করেন। তাদের ভেতর অপার সম্ভাবনাকে উদযাপন করতে চান।