ব্রহ্মদেশ যখন দাঁড়িপাল্লায়...

ব্রহ্মদেশ। বাংলায় এবং ভারতবর্ষে এ নামে যে দেশটি পরিচিত ছিল নে উইনের আমলে এবং তারও আগে সে দেশটির নাম ছিল বার্মা বা বর্মা, এখন তার নাম মিয়ানমার বা মায়ানমার। ব্রহ্মের সঙ্গে বর্মা বা বার্মার সাযুজ্য থাকলেও মিয়ানমার বা মায়ানমারের সঙ্গে ব্রহ্মদেশের কোনো সাযুজ্য নেই। বার্মায় অন্তত অপভ্রংশরূপে ব্রহ্ম টিকে ছিলেন, মিয়ানমারে তিনি একেবারেই নেই।

বার্মার নাম পরিবর্তনের সঙ্গে বর্মীদের সংশ্লিষ্ট থাকার বিষয়টি আপাতভাবে দূরীভূত হলেও এর পেছনে কোনো না কোনো কূটচাল ছিল, এ সন্দেহ করাই চলে। ছিল বলেই আরাকান রাজ্য হয়ে গেল রাখাইন রাজ্য। আর এর ফলে আরাকানিদের একাংশ রাখাইন স্টেটে বা রাখাইন রাজ্যে শূদ্র বা অচ্ছুত হয়ে পড়ল। অচ্ছুত এ অংশটি রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। প্রাচীন রোসাংয়ের সঙ্গে এ জনগোষ্ঠীর একটা সম্পর্ক থাকা অমূলক নয়। ব্যাকরণগতভাবেই দেখানো যায় রোসাইঙ্গা থেকে রোহিঙ্গা।

পদ্মাবতীর কবি আলাওলের মাধ্যমে রোসাং রাজসভার সঙ্গে আধুনিক বাঙালির পরিচয়। রোসাঙ বা রোসাং রাজসভায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা ছিল। বরং বলা চলে বাংলা যখন সংস্কৃতপ্লাবনে ডুবে গিয়েছিল তখন রোসাঙে বাংলাভাষা ভাসমান ছিল। আর তাকে ভাসমান রাখার কাজটি করেছিলেন মাগন ঠাকুর। আর আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ পুরনো পুঁথিগুলো সংরক্ষণ করেছিলেন বলেই আমরা প্রায় লুপ্ত এক ইতিহাসের কথা জানতে সক্ষম হয়েছিলাম। রোসাঙের সঙ্গে এ বঙ্গের গভীর সম্পর্ক ছিল। আমরাও কোনো না কোনোভাবে রোসাইঙ্গাদের সঙ্গে সম্পর্কিত; রোহিঙ্গাদের সঙ্গে না হলেও। 

একসময় রাখাইন রাজ্যের নাম ছিল আরাকান, তারও আগে আরাকানের নাম ছিল রোসাঙ। মোগল শাসনামলে আরাকান রাজ্যের সীমানা চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছিল। চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকা, বিশেষ করে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ের এলাকা মোগল আমলের শেষ দিকেও রোসাঙ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। চট্টগ্রাম থেকেই আরাকানে বাংলা ভাষার প্রচলন। আরকানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বৌদ্ধ, যারা ‘মগ’ নামে পরিচিত ছিল। বাংলা তাদের ভাষা নয়। অথচ এক সময় সে রাজ্যেই বাংলা সাহিত্যের বিকাশ হয়েছিল এবং সেটি ছিল নতুন এক ধারা।

রাষ্ট্রীয়ভাবে বাংলায় মুসলিম শাসন স্থায়ী হওয়ার অনেক আগে থেকে আরাকানে সাধারণ মুসলমানদের যাতায়াত ছিল। মহতৈং চন্দয়ের রাজত্বকালে (৭৮৮-৮১০) আরাকানে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। বাংলায় এবং আরাকানে ইসলামের প্রচার সমসাময়িক। মূলত সে কারণেই দুই অঞ্চলের লোকজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। চট্টগ্রাম ও আরাকান একই রাজ্যভুক্ত হওয়ায় এ অঞ্চল (রোসাঙ) বৃহৎ বঙ্গ থেকে অনেকটাই স্বতন্ত্র ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি ও রাজনীতির সূত্রে রোসাঙের বাঙালিদের আলাদা প্রবাসী সমাজ গড়ে উঠেছিল। রোসাঙ তথা আরাকানে বাংলা সাহিত্যচর্চার একটা পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে রোসাঙ গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। গৌড়ের মুসলমানরা রোসাঙের মংদু শহরে স্থায়ীভাবে বসতি গড়তে শুরু করে। অবশ্য এর আগেও সেখানে মুসলমানদের বসতি ছিল। এরা সবাই বাংলাভাষী। সে সময় আরাকানে প্রধানমন্ত্রী (মহাপাত্র), সমর-সচিব (লস্কর উজির), দেওয়ানি বা ফৌজদারি বিচারক (কাজি) পদে মুসলমানরা অধিষ্ঠিত হতেন। এসবের প্রভাবে বাংলাদেশের বাইরে স্বাধীন আরাকানে বাংলাভাষা ও সাহিত্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।

বঙ্গে মোগল-পাঠান সংঘর্ষের ফলে অনেক অভিজাত মুসলমান আরাকান রাজ্যে আশ্রয় নেয়। তাদের বেশির ভাগ ছিল সুফি। তখন থেকে আরাকান রাজসভায় আরবি-ফারসিতে পণ্ডিত কবিদের বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা শুরু হয়। আরাকান রাজসভায় বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া কবিদের মধ্যে ছিলেন দৌলত কাজি, মরদন, কোরেশী মাগন ঠাকুর, মহাকবি আলাওল, আবদুল করীম খোন্দকার প্রমুখ। তারা আরবি-ফারসি কিংবা হিন্দি থেকে উপকরণ নিলেও মধ্যযুগে বাংলা ভাষায় কাব্যচর্চায় স্বকীয়তার পরিচয় রেখেছেন। দৌলত কাজির ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’, মহাকবি আলাওলের ‘পদ্মাবতী’। মাগন ঠাকুর ছিলেন কোরেশ বংশোদ্ভূত মুসলমান; আর ‘ঠাকুর’ আরাকান রাজার দেওয়া উপাধি। তিনি নিজেও কবি ছিলেন; তার কাব্যের নাম ‘চন্দ্রাবতী’। আলাওল ‘সয়ফুল মুলুক বদিউজ্জামাল’ নামের কাব্যও লিখেছিলেন। দৌলত কাজির অসমাপ্ত কাব্য ‘সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী’র বাকি অংশটিও লিখেছিলেন আলাওল। 

পরবর্তীকালে বাংলা ভাষায় ধর্মপ্রভাবমুক্ত যেসব মানবীয় প্রণয়োপাখ্যান পাওয়া যায় তা মুখ্যত মুসলমান কবিদের রচনা। আর এসবের বেশির ভাগই রচিত হয়েছিল রোসাঙ রাজসভাকে কেন্দ্র করে। ‘বর্মী’ আরাকানিদের মাতৃভাষা হলেও বাংলাভাষা ওজস্বীগুণে আরাকানের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে গৃহীত হয়েছিল। রোসাঙ রাজারা বৌদ্ধ হলেও ধর্মসহিষ্ণু ছিলেন। সে কারণেই সেখানে হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতি প্রভাবিত সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল। আরাকানবাসীদের সহৃদয়তা ও গুণগ্রাহিতার কাছে বাংলা সাহিত্য অনেকটাই ঋণী। এখন এমনটা কল্পনা করা যায় না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্তের কথাও মনে রাখা উচিত। ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে  প্রবাসী বাঙালি সমাজের পরিচয় রয়েছে।

ব্রহ্মদেশে ‘ব্রহ্মার অভিশাপ’ পড়েছে, নানা কারণে এলিগরিক্যালি এ কথা বলা যায়। একটা কারণ বিরোধী ও বিদ্রোহী পক্ষের সঙ্গে বিরোধ-বিবাদ, আরেকটা কারণ গণতান্ত্রিকতাকে অস্বীকার, আরেক কারণ বিবিধ জাতিগোষ্ঠীর স্বাধিকারের দাবি অস্বীকার, আরেক কারণ ঐতিহাসিকতাকে অস্বীকার, আরেক কারণ রাখাইন রাজ্যে সম্পূর্ণ অন্য ধর্ম ও জাতিসত্তার লোকদের নাগরিক সত্তাকে অস্বীকার। আর সবকিছুই হচ্ছে সামরিক সরকারের শ্রেণিগত এবং পেশাগত উচ্চন্মন্যতার কারণে।

ব্রহ্মদেশে সরকার তথা সামরিক সরকার বনাম বিদ্রোহী ও বিরোধী পক্ষের লড়াইটা বেশ চাড়া দিয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও এ লড়াইয়ের ঝাপটা এসে লেগেছে এবং ভালোভাবেই লেগেছে। বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াইয়ে টিকতে না পেরে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দুই শতাধিক সেনা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নাম বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি); একসময় বাহিনীটির নাম ছিল নাসাকা বাহিনী, তাদের কুখ্যাতিও ছিল যথেষ্ট। অন্তত বাংলাদেশিরা তাদের নাশকতার বাহিনী হিসেবেই জানত। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছেই তারা তা-ই ছিল।  শব্দগতভাবেই নাসাকা’র সঙ্গে ধ্বংস বা বিনাশ করার, ডেস্ট্রাকশনের একটা সম্পর্ক আছে। নামের কুখ্যাতির কারণেই নাসাকা নাম বদল করা হয়েছে। যাই হোক, বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) তাদের আশ্রয় দিয়েছে। মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। যদিও অস্ত্র হাতে নিয়ে দাঁড়ালেই বিজিবি এবং বিজিপি একে অপরের প্রতিপক্ষ। 

রাখাইন রাজ্যে জান্তা সরকারের সেনাসদস্যদের সঙ্গে স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত ব্যাপক আকার ধারণ করার জেরেই সেদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)-এর ২৬৫ জন সদস্য অস্ত্রসহ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা রেখে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে পাঁচটি সেনা ব্যাটালিয়নের সদর  দপ্তর জান্তার কাছ থেকে দখল করে নিয়েছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি। জান্তার অনুগত বাহিনীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে রাখাইনে প্রচারপত্র সাঁটিয়েছে তারা। নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম-তমব্রু সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইনে ব্যাপক সংঘর্ষ চলছে। সীমান্তের ওপার থেকে গুলি ও মর্টার শেল বাংলাদেশের বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তমব্রুতে এসে পড়ছে। এতে অন্তত তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। মর্টার শেলের আঘাতে ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়েছে। আতঙ্কে ঘর ছেড়েছে সীমান্তবর্তী তিন গ্রামের মানুষ। সীমান্তের পাঁচটি স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং তিন হাজার লোককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিজিবি সদস্যরা সতর্ক। হেলিকপ্টার থেকে মিয়ানমার সেনাদের ছোড়া মর্টার শেলের আঘাতে বাংলাদেশি এক নারীসহ দুজন নিহত হয়েছে। গত সোমবার (০৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টার দিকে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডেও বেতবুনিয়া সীমান্তের জলপাইতলী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন জলপাইতলীর বাদশা মিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা (৪৫) ও উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আনুমানিক ৫৫ বছরের এক বৃদ্ধ।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) এবং রাখাইনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে। ব্যাপক সংঘর্ষ। বাংলাদেশ সীমান্তের অনেক দূরের রাজ্যগুলোতেও জান্তা বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী বাহিনীগুলোর সংঘর্ষ চলছে। পূর্বাঞ্চলের শান রাজ্যে শান বিদ্রোহীদের সঙ্গে, রাখাইন রাজ্যের উত্তরে চিন রাজ্যে চিন বিদ্রোহীদের সঙ্গে কয়েক দশক ধরেই জান্তার বিরোধ-বিবাদ চলছে। অং সান সুচির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যোসির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ বাধার বেশ আগে থেকেই বিরুদ্ধ রাজ্য বাহিনীগুলোর অস্তিত্ব ছিল এবং প্রবলভাবেই ছিল। কারেন বিদ্রোহীদের কথা একসময় ব্যাপক আলোচনায় ছিল। সাম্পতিক বছরগুলোতে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হলো এনএলডির দর্শনে ও কৌশলে একটা পরিবর্তন ঘটেছে। তারা আর ‘শান্তিবাদী’ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় আবদ্ধ থাকতে রাজি নয়। এনএলডি’র রেডিকেল একটা অংশ সরকারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছে এবং আঞ্চলিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের একটা কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়েছে। তারই জের হচ্ছে বর্তমান সংঘাত। জান্তার এখন লেজেগোবরে অবস্থা। জান্তা সেনারা শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতে, থাইল্যান্ডেও পালানোর চেষ্টা করে। পলাতকদের আবার মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ফেরত পাঠাবে বলেছে। 

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত একটি ছবি আছে, নাম ‘ভানু পেল লটারি’ তাতে ভানু মূর্তিনির্মাতার কাজ করে। তাতে এ গানটি রয়েছে― ‘ ব্রহ্মা যখন দাড়িপাল্লায় তোমায় আমায় তুলল ভগবান/ আমায় ছেড়ে তোমার ওজন বেশি কি সমান’। ছবির শুরুতেই গানটি রয়েছে। যাক, ভগবান বা ব্রহ্মা তার সঙ্গে কী করেছিলেন তার থেকে একটু সরে গিয়ে ব্রহ্মদেশের বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে ব্রহ্মা কী করতে যাচ্ছেন সে কথা উপাখ্যানের মোড়কে বলার চেষ্টা করা হলো। ব্রহ্মার দাঁড়িপাল্লায় জান্তা নাকি বিদ্রোহী, সুচি নাকি অং মিন হ্লাইং; নাকি জান্তা এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কোন পক্ষ ভারী হবে নাকি সমানই থাকবে তা ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া তেমন কোনো উপায়ও নেই।

লেখক: সাংবাদিক

tarik69@gmail.com