পিৎজা, গাজা এবং ইসরায়েলের তৈরি দুর্ভিক্ষ

গত দু’সপ্তাহ আগে আমি বেশ কয়েকটি ছবি পেয়েছি। যেগুলো পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করলে গাজায় ইসরায়েলের অপরাধের অসুস্থ মাত্রা সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই দেখতে পারি। এটা বেখাপ্পা মনে হতে পারে যে, একজন কলামিস্ট একটি দুর্বৃত্ত জাতি কর্র্তৃক সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের মধ্যে পিৎজার কথা উল্লেখ করতে বাধ্য হন। কিন্তু গাজায় চলমান অবরোধের একটি সংজ্ঞায়িত দিক হিসেবে সময় এবং শালীনতার দাবি মানতে গিয়েই আমাকে পিৎজার প্রসঙ্গ আনতে হয়েছে। দুর্বৃত্ত সংগঠন ইসরায়েলের নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে তারা বিধ্বস্ত ছিটমহল, শিশু, পুরুষ এবং মহিলাদের কাছে খাদ্য ও পানি পৌঁছানো থেকে সবাইকে বিরত রাখার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

আজ ফিলিস্তিনিরা যে ক্ষোভ সহ্য করছে এবং যতদিন পর্যন্ত ইসরায়েলের নিরলস হিংস্রতা গাজাকে ধ্বংসের মত্তলীলায় মগ্ন থাকবে, ততদিন পর্যন্ত পিৎজাকে মনে হতে পারে পাঁচ পয়সা মূল্যের একটি পিকায়ুন, এমনকি বিরক্তিকর। তবে এ সময়ের মধ্যেই পিৎজা হয়ে উঠতে পারে একটি কলামের সূচনাবিন্দু, যা পুরো কলামজুড়ে ‘গণহত্যা’ ও ‘দুর্ভিক্ষ’ শব্দ দুটির বেদনার্ত দিক ফুটিয়ে তুলবে।

সপ্তাহ দুয়েক আগে আমি বেশ কয়েকটি বিড়ম্বনাপূর্ণ ছবি দেখেছি, যেগুলোকে পাশাপাশি রেখে বিবেচনা করা হলে আমরা গাজা ও এর বাইরের ভয়ানক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করতে পারি। সেই সঙ্গে প্রত্যক্ষ করা যাবে ভুক্তভোগীদের কাতরতা, যা বিভিন্ন মানবেতর পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছু বলে।

একটি ছবিতে দুজন তরুণ ইসরায়েলি অস্ত্রধারীকে দেখানো হয়েছে। এদের উভয়েই পিৎজা বক্সের টাওয়ার বহন করছে। এগুলো মূলত একটি জনপ্রিয় পিৎজা ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে এদের পাঠানো হয়েছে  উপহার হিসেবে। সবুজ পোশাক পরা সৈন্যরা হাসছে। এদের অস্থির দেখাচ্ছে। পিৎজার বাক্সে লেখা- ‘পিৎজার প্রতি ভালোবাসার জন্য এ উপহার।’

ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে টাকমাথার স্থূলকায় এক ইসরায়েলি সৈনিকের কাঁধে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র। তার ডান হাতটি একটি সুপরিচিত আমেরিকান পিৎজা চেইনের স্তূপের ওপর হেলান দিয়ে রাখা। সে বিশ্রাম নিচ্ছে ইসরায়েলি সৈন্যদের বিনামূল্যে উপহার দেওয়া এসব পিৎজার ওপর। তার দাড়িওয়ালা চকমকে মুখে একটি হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।

ওপরে উল্লিখিত উভয় স্ন্যাপশটেই প্রচুর লাভ রিয়েক্ট ও ইমোজির উদ্দেশ্য হলো, যারা এদের ফাস্টফুড সরবরাহ করে, তাদের দয়ার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো। ইসরায়েলি সেনারা খুশি। এদেরকে ভালো ভালো খাওয়ানো যাচ্ছে। যদি সৈন্যরা এ অঞ্চলকে ঘিরে থাকা সমস্ত খুনের উন্মাদনায় সামান্যতম বিরক্ত হয়েও থাকে, তবুও এটা অন্তত সেলফোনের তাৎক্ষণিক ক্যাপচারে বন্দি হয় না। এরা সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট। স্বাভাবিকতার একটি পরাবাস্তব বাতাস এদের ব্যাপক অমানবিকতার মধ্যে রাজত্ব করে চলে। আনন্দ উল্লাসে মত্ত হয়ে এরা রাতের খাবার খায়।

অন্যান্য ছবি আমাদের শোনায় অন্য জগতের গল্প, বেদনা, নিষ্ঠুরতা ও অমানবিকতার। ফিলিস্তিনি ছেলে-মেয়েদের একটি দল ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজার কিছু অংশে একটি লোহার গেটের সামনে চাপা পড়ে। তারা প্রচণ্ড শীতের ঠাণ্ডা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সোয়েটার এবং হুডি পরে আছে। ছেলে-মেয়েদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে বা তাদের কেউ কেউ পরিবারের জন্য খাবার ও পানি খোঁজার জন্য বের হয়েছে। সঙ্গে পাত্র এবং একটি কোলান্ডার নিয়ে।

একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রসারিত হাত প্রেটসেলের মতো ঘন কালো কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে। হাতে সিলভারের একটি বাটি। ছবি দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি মনে হয় দূর থেকে চিৎকার করে তার খালি বাটির দিকে কারোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আশপাশের বাচ্চারা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সাহায্যের জন্য হাত পাততে বাধ্য হচ্ছে।

লাখ লাখ ফিলিস্তিনি আত্মসমর্পণ করবে না। আত্মসমর্পণের পরিবর্তে তারা বেঁচে থাকার জন্য যা করতে পারে তাই করে যাচ্ছে। টিকে থাকাটাই তাদের একমাত্র সংগ্রাম হয়ে গেছে। সপ্তাহ তিনেক আগে গাজা শহরের পশ্চিমে একটি গর্তের ধ্বংসাবশেষে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি পুরুষ ও ছেলে ময়দা এবং টিনজাত খাবারের সন্ধান করার সময় একটি পরিত্যক্ত ট্রাকে মৌমাছির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

গাজা উপত্যকা ক্ষুধা, নিত্য ও মৌলিক প্রয়োজনের জন্য হাহাকার আর হতাশায় ভেসে যাচ্ছে। দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। কবরস্থান মুছে ফেলা হয়েছে। স্কুলগুলো বিধ্বস্ত করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদগুলোর অস্তিত্ব নেই। হাসপাতালগুলোও ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আশা মুছে গেছে।

গাজায় দিনের পর দিন চলা গণহত্যার দুটো রূপ রয়েছে। একটি জোরেশোরে এবং দ্রুততর। অন্যটি শান্ত এবং ধীর। উভয় রূপই প্রাণঘাতী পূর্বাভাসযোগ্য। পশ্চিমা রাজধানীগুলো এসব পূর্বাভাসকে বারবার ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে।

ইসরায়েল গাজায় নির্বিচারে যে বোমা ও ড্রোন ছুড়ছে, হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, আরও হাজার হাজার পঙ্গু করেছে, তা হলো গণহত্যার তাৎক্ষণিক ও প্রথম রূপ। গাজাকে ধ্বংস করার জন্য ইসরায়েল বহুমাত্রিক নকশা তৈরি করেছে। এখানে সরাসরি সন্ত্রাস চালানো, উপত্যকার সমস্ত বাসিন্দাকে নির্মূল ও উপত্যকাকে পুরোপুরি পরিবর্তিত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার সমস্ত আয়োজন করেছে তারা। এমনকি গাজা উপত্যকার সমস্ত ধুলো অনুর্বর এবং বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

কিন্তু পরিস্থিতি এমন যে কোনো প্রান্তের কেউ যদি ধারাবাহিক নৃশংসতার বিপরীত কোনো দাবি তুলেন, তাহলে তাকে ইসরায়েলের সরকারের কাছে কৈফিয়ত দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। কারণ, এই দুর্বৃত্তদের ঘোষিত পরিকল্পনা হচ্ছে গাজায় জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালানো। ক্ষমাপ্রার্থীরাও সততার অস্বস্তির চেয়ে অন্ধত্বের আরাম পছন্দ করেন।

পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম-সমূহের চকচকে পর্দায় আধিপত্য বিস্তার করে বেড়ানো ‘ঠুং ঠাং’ দৃশ্যের বাইরেও সেখানে একটি শান্ত ও ধীর গণহত্যা চলছে। এ গণহত্যা ঘটছে জীর্ণ তাঁবুগুলোতে। যেখানে গৃহহীন ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি সৈন্যদল ঘেরাও করে রেখেছে এবং তাদের কাছে খাদ্য মজুদ নেই, বাইরে থেকেও খাদ্যসামগ্রী সেখানে পৌঁছানো যাচ্ছে না। তাদের অবরুদ্ধ গাজার এক অংশ থেকে অন্য অংশে পায়ে হেঁটে যাওয়ার জন্য বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। জাতিসংঘের মতে, গাজায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে ‘অবিশ্বাস্য গতিতে’।

জাতিসংঘের হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাফেয়ার্স ও এর জরুরি ত্রাণ সমন্বয়কারী মার্টিন গ্রিফিথস সম্প্রতি সিএনএন-এর ক্রিশ্চিয়ান আমানপুরকে বলেছেন, জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর বিবরণ অনুসারে চার লাখ ফিলিস্তিনি মারাত্মক খাদ্যঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘সত্যি বলতে, দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে নয়, ফিলিস্তিন মূলত দুর্ভিক্ষের মধ্যেই রয়েছে।’

দুর্ভিক্ষ প্রকৃতির নির্দয়তা আর সংঘর্ষের অনিবার্য পরিণতির সংমিশ্রণ দ্বারা রূপ লাভ করে। গাজাকে যে দুর্ভিক্ষ গ্রাস করছে তা কোনো ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’ নয়। ইসরায়েলের ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অন্যদের নিষ্ক্রিয়তার প্রত্যক্ষ এবং সাজানো ফলাফল। ইসরায়েলের উচ্চস্বর ও গণহত্যার প্রথম শিকার নিরপরাধ শিশুরা। আর ধীর ও শান্ত গণহত্যা সেখানকার আরও অগণিত নির্দোষের প্রাণ হন্তারক। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, গাজার পাঁচ বছরের কম বয়সী সাড়ে তিন লাখ শিশুকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শিশু বলা হয়।

ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, ‘অপুষ্টি ও রোগের কারণে মৃত্যুর উচ্চঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিকিৎসা, বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশন পরিষেবা অতীব প্রয়োজন। কিন্তু স্থলভাগের পরিস্থিতি শিশু ও অভাবগ্রস্ত পরিবারের কাছে আমাদের পৌঁছাতে দেয় না।’ এ পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ যে কোনো আইনি ও নৈতিক মানদণ্ডের বিচারে একটি নির্লজ্জ যুদ্ধাপরাধ।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করে বলেছে, ‘ইসরায়েল সরকার অধিকৃত গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের পদ্ধতি হিসেবে বেসামরিকদের অনাহারকে ব্যবহার করছে, যা একটি স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।’ সংস্থাটির অভিযোগ, ‘ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে পানি, খাদ্য এবং জ্বালানি সরবরাহে বাধা দিচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে মানবিক সহায়তায় বাধা সৃষ্টি করছে। দৃশ্যত কৃষি এলাকা ধ্বংস করছে এবং বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে তাদের বেঁচে থাকার অপরিহার্য দ্রব্যাদি থেকে বঞ্চিত করছে।’

এই দ্বিমুখী দুর্ভিক্ষে হয়তো ইসরায়েলের ক্রমাগত ড্রোন ও বোমা বৃষ্টির চেয়ে বেশি ফিলিস্তিনি মারা যাবে রোগের নিশ্চিত প্রাদুর্ভাবের ফলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কবরস্থানের এপিটাফে একদিন লেখা হবে: ইসরায়েল ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের আত্মসমর্পণ, বশ্যতা লাভের চেষ্টা ও জাতিগত নিধনের উদ্দেশ্যে যখন গণহত্যা পরিচালনা করছিল, তখন দুর্ভিক্ষ বন্ধ করার পরিবর্তে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তাদের ‘কৌশলগত মিত্র’ ইসরায়েলকে সহায়তা করেছিল।

তাদের প্রতি ধিক্কার! তাদের সবার জন্য লজ্জা!

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি

  লেখক: আলজাজিরার কলামিস্ট