বাংলা একাডেমিই বইমেলার অস্তিত্ব

বাংলা একাডেমির নেতৃত্বে চলছে অমর একুশের গ্রন্থমেলা, ২০২৪। আজ যে বইমেলার বিকাশ, প্রকাশ ও অগ্রসরমানতা, শুরুর কেন্দ্রবিন্দুতেই ছিল বাংলা একাডেমি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ লড়াই করছিল প্রাণের সব আরতি নিবেদন করে, প্রতিবেশী ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল ১ কোটি  বাঙালি। নানা স্তরে অবর্ণনীয় দুঃখ আর কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করলেও অনেকে সৃজন মেধায় জন্মভূমির স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেছেন। পুঁথিঘরের প্রকাশক চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন অন্যতম সিদ্ধপুরুষ। তিনি কলকাতায় বুদ্ধিভিত্তিক বাঙালিদের একত্র করে সৃজনশীল একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ার স্বপ্ন জানিয়ে নাম রাখলেন, মুক্তধারা। বললেন, যুদ্ধরত বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম বইটি ‘মুক্তধারা’ থেকে করতে চাই। বইয়ের নাম রাখা হলো- ‘রক্তাক্ত বাংলা’। সম্পাদক- আনিসুজ্জামান। খুব অল্প সময়ে যুদ্ধাক্রান্ত বাঙালি লেখকরা লেখা দিলেন, যুদ্ধরত স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম বই প্রকাশিত হলো।

১৯৭২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বপ্নবান পুরুষ মুক্তধারার বই নিয়ে প্রথম প্রহরে লাল কাপড় বিছিয়ে বাংলা একাডেমির প্রবেশ পথে বইয়ের মিছিল নিয়ে বসলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনের শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে বাংলা একাডেমিতে প্রবেশপথে বই দেখে অজস্র বাঙালি আপ্লুত হলেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অমর ভাষা শহীদদের স্মরণে আত্মত্যাগের বেদিতে পরম শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে এসেই বইয়ের সঙ্গে জনতার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলবার এই প্রয়াস ছিল অনবদ্য, ঐতিহাসিক। সেদিন চিত্তরঞ্জন সাহা আজকের বিশাল অগ্রযাত্রার প্রথম ইটটি গেঁথেছিলেন। পরের বছর আবারও একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির গেটে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন তিনি। প্রথম বছরে মুক্তধারার স্বপ্নমিছিল অন্য প্রকাশকদেরও দেখেছিলেন। সুতরাং দ্বিতীয় বছরে আরও কয়েকজন প্রকাশক বাংলা একাডেমির গেটের পাশে বইয়ের আড়ং সাজিয়ে বসেন। বাঙালিরা শহীদ মিনারে ফুল নিবেদন করে বাংলা একাডেমিতে প্রবেশপথে সাক্ষাৎ পান বইয়ের। পছন্দের বইটি কেনেন, গন্ধ নেন। বইয়ের গন্ধ নিতে নিতে বাংলা একাডেমির আয়োজনে কবিতা পাঠের আসরে ঢুকে যান। এক আবেগঘন সৃজন সত্তার উদ্বোধন ঘটে বাঙালির অন্তরে গোটা বাংলা একাডেমির ঘন সবুজ প্রাঙ্গণ জুড়ে। পরের বছর আরও বইয়ের প্রকাশকরা আসেন বাংলা একাডেমিতে, বইয়ের পসরা নিয়ে। একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে। সত্তরের দশকে গোটা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ জুড়ে বইয়ের দোকান বসে যায়। কোনো নিয়ম বা নিয়ন্ত্রণ বা সাংগঠনিক রূপ না থাকায় বইয়ের দোকানের পরিধি নিয়ে প্রকাশদের মধ্যে এক ধরনের ঠেলাঠেলি বা রেষারেষির সৃষ্টি হলে, বাংলা একাডেমি হস্তক্ষেপ করে। কমিটি গঠন করে একটা সাংগঠনিক রূপ দেওয়া হলে মেলায় শৃঙ্খলা ফিরে আসে। আশির দশকে প্রকাশকদের সঙ্গে মিলে বাংলা একাডেমি ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নামে বইমেলা শুরু করে আনুষ্ঠানিক রূপ ধারণ করে। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা উদ্বোধন করেছিলেন সেই সময়ের নির্বাচিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ভাষণের এক পর্যায়ে উপস্থিত সুধীজনের সামনে বলেছিলেন, ‘আপনারা বুকে হাত দিয়ে বলেন, আপনারা ভাষার জন্য কী করেছেন? দেশের জন্য আপনারা কী করেছেন?... আমরা যেদিন ক্ষমতায় যাব, সেদিন থেকে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হবে।... বাংলা একাডেমিরও সৌভাগ্য যে, এতদিন পরে তারা একুশে ফেব্রুয়ারি পালনের সুযোগ পেয়েছে। আমারও সৌভাগ্য যে, এখানে আপনাদের সামনে এসে দাঁড়াবার সৌভাগ্য জীবনে এই ‘প্রথমবার’ আমি পেয়েছি।’ সূত্র-অমর একুশের বইমেলার ইতিহাস, জালাল ফিরোজ, পৃষ্ঠা-৫৩, বাংলা একাডেমি।

প্রশ্ন উঠেছে. বইমেলা আয়োজন কি বাংলা একাডেমির দায়িত্ব? পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বইমেলা তো করেন প্রকাশকরা বা প্রকাশক সমিতি। সরকার বাইরে থেকে সমর্থন জানায়। হয়তো এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য দেশের বইমেলার সঙ্গে বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশের বইমেলা আয়োজনের মধ্যে রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। প্রথমত বাংলা একাডেমি গড়ে উঠেছে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের ইশতেহারের অধীনে। বাংলা একাডেমির মতো একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবার সম্পর্কে বলেছিলেন বাঙালি জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহও।

বিদগ্ধ পণ্ডিত বা সমালোচকরাও অভিমত রাখেন, বাংলা একাডেমি কেন বইমেলার আয়োজন করবে? প্রশ্নটা এক অর্থে সংগত। কিন্তু কেউ যদি বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি ও বাংলা একাডেমির বইমেলার অন্তর্নিহিত ইতিহাসটা জানেন, তাহলে এই ধরনের প্রশ্ন তুলবেন না। অমর একুশের বইমেলা গড়ে উঠেছে বাঙালি জাতিসত্তার উঠোন বাংলা একাডেমির মর্মমূলের পাঁজর থেকে। অর্ধশতাব্দীর যাত্রায় নানা ধরনের প্রতিকূলতা পার হয়ে আজ বইমেলা বাঙালির অস্তিত্বের প্রতীক। বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশের গ্রন্থমেলা একান্তভাবেই বাংলা একাডেমির- ইতিহাস, স্থান, বাস্তবতা ও ঐতিহ্যের ধারণায় এবং একই সঙ্গে এই দেশের কোটি কোটি নাগরিক, বাঙালির। এই ধারণার বাইরে আরও ধারণা থাকতে পারে। থাকাটাই স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে নিজেরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিকল্প বইমেলার আয়োজন করতে পারে কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশের গ্রন্থমেলার ঐতিহাসিক স্বত্ব বাংলা একাডেমিরই। অনেকে ঈর্ষা প্রসূত প্রসঙ্গ তোলেন, বইমেলার আয়োজন ছাড়া বাংলা একাডেমি কী করে? বাংলা একাডেমি সতত প্রবহমান মনোজাগতিক সৃষ্টিশীল অদম্য সংবিধিবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। যার স্লোগান ‘বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক’। প্রতি বছর চিন্তা ও নতুন ধারণায় অসংখ্য বই প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি জাতির মননময় বিজ্ঞান ও প্রগতিমনস্ক একটি জাতি সম্প্রদায় গড়ে তুলবার কাজে নিয়োজিত। বাংলা একাডেমির বাংলা ইংরেজি বানান অভিধান কেবল বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও সুনাম অর্জন করে চলেছে অনেক বছর ধরে। বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান অনন্য নজির স্থাপন করেছে অভিধান বিশ্বে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর আঞ্চলিক ভাষার অভিধান তো অসামান্য আবেদন তৈরি করেছে সেই ষাটের দশক থেকে। দুর্লভ, প্রাচীন প্রয়োজনীয় কিন্তু কম বিক্রীত বই বাংলা একাডেমি নিজস্ব সৃজনশীলতার কারণেই প্রকাশ করে, কারণ জ্ঞানের কোনো বিকল্প নেই। অনুবাদ সাহিত্য জাতিকে অন্য জাতির সঙ্গে সংযুক্তই করে না কেবল, ইতিবাচক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রচনায় রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রচনাসম্ভার জাতির সামনে সুলভমূল্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য একের পর এক প্রকাশ করে চলেছে রচনাসমগ্র। ইতিমধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. এনামুল হক, আবুল মনসুর আহমদ, শামসুর রাহমান, সত্যেন সেন, মাহমুদুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দসহ আরও অসংখ্য মনীষীর রচনা সমগ্র প্রকাশ করেছে জাতির মননের প্রতীক ‘বাংলা একাডেমি’। এই প্রতিষ্ঠান গত পঞ্চাশ বছরে সুপ্রশিক্ষিত মননময় কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে। যাদের নিরলস শ্রম-নিষ্ঠা আর নিরঙ্কুশ ভালোবাসায় বইমেলা যেমন করছে, তেমনি অন্তঃসলিলায় করে যাচ্ছে জাতির মেধা নবায়নেরও পরম সাধনা। চিন্তায় সীমাবদ্ধরা পরে থাকুক পথের কিনারে। দুটো কাজের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই বরং চর্চার ধারাবাহিকতায় বাংলা একাডেমি এগিয়ে যাচ্ছে পরমার্থের পথে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও পান্ডুলিপি সম্পাদক, বাংলা একাডেমি

monihaider68@gmail.com