নিরানন্দ পুঁজিনির্ভর শিক্ষা

ঊনবিংশ শতাব্দীতে নবজাগরণের প্রভাবে বাংলার শিক্ষাজগতে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। তখন প্রকৃত শিক্ষায় আলোকিত মানুষ, পুরনো ঐতিহ্য-শিক্ষার মূলে কুঠারাঘাত করে। সেই নবজাগরণের একটা উদ্দেশ্য ছিল। আসল উদ্দেশ্য সব মানুষের চিন্তা, মনন এবং আচরণে যুক্তি-বুদ্ধির সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করা। সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করা। এই সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে যত পথ রয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের সেই সংস্কৃতি, যা প্রক্রিয়াগতভাবে জ্ঞানের আদর্শকে সামাজিক মূল্যবোধ আকারে সংরক্ষণ করে অব্যাহত রাখে উন্নয়নের ধারা। তখন সেই শিক্ষা মানুষের প্রচ্ছন্ন সম্ভাবনাকে বিকশিত করে ভবিষ্যৎ সমাজ ও সংস্কৃতির কাছে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কি মানুষের জীবনের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের সুযোগ রয়েছে? নাকি কোনোভাবে একটা ডিগ্রি নিয়ে ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনধারণই আসল কথা? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অন্তরের বিকাশের কোনো কথা নেই। বর্তমান শিক্ষায় মানুষের সঙ্গে মানুষের কোনো আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলে না। ‘মনুষ্যত্ববোধ জাগরণের কোনো সক্ষমতা’ যদি না-ই তৈরি হলো, তাহলে সেই বিবেকবর্জিত শিক্ষায় কী লাভ? আনন্দের সঙ্গে শিক্ষা লাভের কোনো সুযোগ আমাদের নেই। এই না থাকার সুযোগে নিরানন্দকে পুঁজি করে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। নতুন সরকারি তথা রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংকট না হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংকটে পড়ছে। নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্মার্ট অবকাঠামো, শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি, মানসম্মত শিক্ষক এবং অনেক কিছু নিয়ে হাজির হলেও তারা শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এই না পাওয়ার কারণ হচ্ছে  দেশের অধিকাংশ জনগণের আর্থিক কাঠামোর মধ্যে ব্যবধান এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ।

এ বিষয়ে বুধবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ‘উচ্চশিক্ষায় দেশি র‌্যাংকিং’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে ইউজিসি বলছে, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানের র‌্যাংকিংয়ের মানদ-ে বিদেশি ও দেশি শিক্ষার্থীর অনুপাতসহ বেশ কিছু বিষয় থাকে। সেখানেই পিছিয়ে পড়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। এসব র‌্যাংকিং পুরোই কাগজপত্রনির্ভর হওয়ায় বাস্তব অবস্থার সঙ্গে তা মেলে না। ফলে অংশগ্রহণকারী দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সামনে আসতে পারে না। অথচ দেশের বেশ কিছু সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে।’ ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ  বলেন, ‘৪৯তম বার্ষিক প্রতিবেদনে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য দেশীয় র‌্যাংকিংব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করেছি। এটা জাতীয় বা অভ্যন্তরীণভাবে হতে পারে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটা সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্রেও হতে পারে, আবার আলাদাভাবেও হতে পারে। হয়তো এ কাজের সমন্বয় করবে ইউজিসি। কিন্তু এ জন্য শিক্ষক, শিক্ষাবিদদের নিয়ে একটি নিরপেক্ষ প্যানেল থাকবে। তারাই মূল কাজটা করবে।’

বিশ্বজিৎ চন্দ বলেন, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানের করা র‌্যাংকিংয়ে আমরা মানদ-ের কারণে পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত অবস্থা বোঝা সম্ভব হচ্ছে না। র‌্যাংকিং থাকলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের ভালোমানের কারণে এগিয়ে আসতে পারে। সব বিশ্ববিদ্যালয় মান বাড়ানোর জন্য তৎপর হতে পারে। আমাদের অভ্যন্তরীণ র‌্যাংকিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, প্রকাশনা, গবেষণা প্রকল্প, শিক্ষক, শিক্ষার্থী প্রভৃতিবিষয়ক মানদ- থাকতে পারে। র‌্যাংকিং থাকলে আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে পারব।’ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানদ-বিষয়ক জটিলতা রয়েছে। ফলে তারা র‌্যাংকিংয়ে খুব বেশি এগোতে পারে না। ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বনিম্ন সুদে শিক্ষাঋণের সুপারিশ করা হয়েছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) র‌্যাংকিং’ ও ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন র‌্যাংকিং’ বেশি পরিচিত। তবে এ দুই র‌্যাংকিংয়ে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা খুব কম। যারা এসব সিস্টেমে অংশ নেয় না, তারা কোনো র‌্যাংকিংয়েই থাকে না। এর ফলে কি মূল সমস্যায় সমাধান আসবে? ছাত্রছাত্রীর পরিবার সত্যিকারভাবেই কি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মুখী হবে? শুধু ছাত্রছাত্রীদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করলে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগ্রহণে ছাত্রছাত্রী সংকট কাটবে না। এটা তখনই সম্ভব, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি মধ্যবিত্তের আর্থিক আয়ের নাগালের মধ্যে আসবে। একই সঙ্গে এ কথা বলা যায়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যত জীবনঘনিষ্ঠ হবে, ততই গবেষণায় নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে যাবে দেশ। তখন দেশি-বিদেশি মানদন্ডে পিছিয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই।