দেশপ্রেম, সাধনা, নিষ্ঠা আর পেশাদারিত্ব কাকে বলে তা কথায় নয়, কাজে বাস্তবায়ন করেছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এবং রাষ্ট্রীয় কোনো আনুকূল্য ছাড়াই তিনি ইউপিএলকে দাঁড় করিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মানের একটা প্রকাশনা হিসেবে। বইয়ের প্রকাশনায়, পরিবেশনায়, রপ্তানিতে, পরিবেশক হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে সবার কাছে ছিলেন এ দেশের প্রকাশনা শিল্পের পুরোধা। তিনিই প্রতিষ্ঠাতা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল)। তার প্রয়াণের পর বাংলাদেশের এই ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থাটির হাল ধরেছেন তার কন্যা মাহরুখ মহিউদ্দিন।
তার কাছে প্রথম প্রশ্ন ছিল কী কী বিবেচনায় আপনারা কোন বই প্রকাশ করেন? মাহরুখ বলেন, “ইউপিএলের প্রকাশনার তালিকা মূলত গবেষণাভিত্তিক অ্যাকাডেমিক বই দিয়ে সমৃদ্ধ। আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ হলো ‘রোড টু বাংলাদেশ’ সিরিজ। গবেষণাভিত্তিক বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রথমেই গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয় মৌলিকতা। যেকোনো বিশ্বমানের প্রকাশনায় প্লেজিয়ারিজম কোনো গবেষণাপত্র বা বই বাতিলের প্রথম কারণ হিসেবে আসে। এ ছাড়া পা-ুলিপির মান, ভাষা, প্রয়োজনীয় সম্পাদনার অনুপাত ইত্যাদিও বিবেচনার বিষয় হিসেবে থাকে। অন্যান্য বইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়বস্তুর গুরুত্ব বা লেখকের বিষয়বস্তুর ওপর দখল, লেখকের অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা এবং তাৎপর্য, পাঠকপ্রিয়তা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করা হয়।”
পরের প্রশ্ন ছিল আসন্ন বইমেলা নিয়ে ইউপিএলের প্রস্তুতি কেমন? মাহরুখ বলেন, ‘আমরা সাধারণত বইমেলা উপলক্ষ করে বই প্রকাশ করি না। মার্চ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত সব বই-ই আমরা বইমেলায় নতুন বই হিসেবে নিয়ে আসি। সে অর্থে এ বছর ইতিমধ্যে আমাদের প্রকাশনার তালিকায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই যুক্ত হয়েছে।’
বইয়ের প্রচারণা নিয়ে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে ইউপিএল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বইয়ের প্রচারণার ক্ষেত্রে আমরা আশা করি যে, গণমাধ্যম প্রধান ভূমিকা পালন করবে। তবে পত্রিকার প্রচারণা যথেষ্ট সহায়ক না হওয়ায় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা বইয়ের প্রচার নিয়মিতভাবেই করে থাকি, বই আড্ডা অথবা আলোচনার আয়োজন করি। আমরা মনে করি পাঠককে মানসম্মত বইয়ের সন্ধান দেওয়া, উৎসাহিত করা, পথ দেখানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা থাকবে। সত্যিকার গ্রন্থ প্রকাশনার অর্থনীতি বিবেচনায় নিলে বইয়ের জন্য বইয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে বই বিক্রি করে তার খরচ তুলে আনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বইকে অন্য যেকোনো পণ্যের মতো বিবেচনা না করে ভালো বই নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন ও প্রিন্ট মিডিয়ার দিক থেকে প্রচারণা এবং রিভিউ প্রকাশে আরও উদ্যোগী ভূমিকায় দেখতে চাই।’
অ্যাকাডেমিক ও জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের প্রকাশক হিসেবে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে মাহরুখ বলেন, “আমি সবসময়ই আশাবাদী। আমরা যেহেতু অ্যাকাডেমিক বই-ই বেশি প্রকাশ করি, সে ক্ষেত্রে মানসম্মত পান্ডুলিপি পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা তো আছেই। এ ছাড়া এ ধরনের বইয়ের জন্য যে ধরনের সম্পাদনা প্রয়োজন হয়, তার ব্যয়ভার এবং সময় কখনো কখনো প্রকাশক ও লেখক উভয়পক্ষের জন্যই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পাঠকের কাছে পৌঁছানো অথবা বিশেষায়িত বইয়ের যথেষ্ট বিক্রি নিশ্চিত করাও একটা চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রকাশনা শিল্প এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘প্রকাশনা শিল্প’ হিসেবে স্বীকৃত নয়। এটি সার্বিকভাবে প্রকাশনা শিল্পের জন্য একটি বড় সীমাবদ্ধতা। এখনকার সময়ের আরও একটি বড় সমস্যা সরকারি ক্রয়ের বিভিন্ন প্রকল্পে বই বাছাইয়ে দুর্নীতি। এ ধরনের বাস্তবতা সৎ লেখক এবং সৎ প্রকাশকদের নিরুৎসাহিত করে। আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের কথা বলি, কিন্তু অনেক সময়ই আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানবিমুখ বা সততার বিপরীতে অবস্থান নেয়। ভবিষ্যতের কথা ভাবলে এটা বরং অনেক বড় একটা ক্রাইসিস, কারণ এসব অপকর্ম অত্যন্ত ক্ষতিকর দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তবে এসব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইউপিএল গত মাসে ৪৮ বছরে পদার্পণ করেছে। চোখ ঝলসানো আলো না থাকলেও, আশার জায়গা আছে নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও লুকিয়ে।”
বই প্রকাশে আগ্রহী লেখকদের কাছে ইউপিএলের প্রত্যাশা নিয়ে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘ইউপিএল থেকে প্রকাশিত সব বই-ই সম্পাদনার ধাপগুলো পার করে যায়। তবে যেমনটা আগেও বলেছি, বই প্রকাশের ক্ষেত্রে লেখকদের পঠন-পাঠনের ব্যাপ্তি, গবেষণাকাজের প্রতি তার বিশ্বস্ততা এবং বিষয়বস্তুর ওপর তার দক্ষতা বা জ্ঞানের গ্রহণযোগ্যতা এসব বিষয়ই প্রকাশনার ক্ষেত্রে আমাদের বিবেচনায় থাকে।’