বই প্রকাশের সময় মনে হয় নতুন শিশুর জন্ম দিচ্ছি

গত বইমেলায় শিশুদের বই নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে কিন্ডারবুকস। শিশুদের উপযোগী বিষয় নির্বাচন, দৃষ্টিনন্দন ইলাস্ট্রেশনের উপস্থাপনা ও চমৎকার প্রকাশনার জন্য ছোট-বড় সবার প্রশংসা লাভ করেছে বইগুলো। বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘সাড়ে তিন দিনের পত্রিকা’ও সাড়া ফেলেছিল দর্শনার্থীদের মধ্যে। এবারের বইমেলা, কিন্ডারবুকস-এর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, শিশুদের বইয়ের প্রকাশনা শিল্প নিয়ে মিঠাইয়ের মুখোমুখি হয়েছেন কিন্ডারবুকসের প্রকল্প প্রধান আজহার ফরহাদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনাম-উজ-জামান

কোন স্বপ্ন নিয়ে কিন্ডারবুকস নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন?

শিশুদের বই প্রকাশের জন্য একটু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান করার জন্য একটি দীর্ঘ প্রস্তুতি লাগে। এর পেছনে একটি দীর্ঘ গল্পও আছে। আমি শিশু ছিলাম। কৈশোর পেরিয়ে এখন ধীরে ধীরে প্রবীণ হচ্ছি। শৈশবে যার অভাববোধ করতাম তা হলো, একটি পূর্ণাঙ্গ বই। বইয়ের কাগজ, তার ছাপা এবং তার ইলাস্ট্রেশন-সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে একটা পূর্ণাঙ্গ বই কেন এত বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের শিশুদের হাতে পৌঁছায় না। এর পেছনে দায় আসলে কার? সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আমার কিন্ডারবুকস করার স্বপ্নটা। বই একটি আলাদা সত্তা। এই সত্তাকে পরিপূর্ণভাবে অস্তিত্বশীল করতে অনেক কিছুই লাগে। কাগজ যেমন লাগে, ছাপাও তেমন লাগে। কালির একটা ব্যাপার আছে, ইলাস্ট্রেশনের একটা ব্যাপার আছে। সবচেয়ে বড় কথা কনটেন্ট। শিশুদের কল্পনার জগতে শিশু হয়ে যেতে হয়। আমরা যখন ছোটবেলায় বই পড়েছি, আমরা আসলে শুধু সাহিত্যপাঠ করিনি। আমরা আমাদের জীবনের প্রতিফলন দেখতে চেয়েছিলাম। সেটি লেখায়, চিত্রে, প্রডাকশনে। সব মিলিয়ে অস্তিত্ব দেওয়া একটি পূর্ণাঙ্গ বইকে, যে বইটি শিশু হাতে নেবে এবং হারিয়ে যাবে কল্পনার জগতে। এটিই আমার ভিশন, একটি এমন পাবলিকেশন হাউজ তৈরি করা, যেটি শিশুদের আশাহত করবে না।

এখনকার বাচ্চারা কী ধরনের বই পছন্দ করছে? কী ধরনের চিন্তা মাথায় রেখে এখনকার প্রকাশকদের বই করতে হবে বলে মনে করেন?

একেকজন বাচ্চার পছন্দ একেক রকম। এখনকার বাচ্চারা কী গেম খেলছে সেটা দেখলে বোঝা যাবে এখনকার বাচ্চাদের পছন্দ। শিশুদের মনস্তত্ত্ব হয় না। শিশুদের হয় কল্পনাশক্তি। আমার বড় মেয়েটা যে গেম খেলে, সেটাতে রয়েছে বৌদ্ধিক ব্যাপারের প্রাধান্য, আমার ছোট মেয়েটা যে গেম খেলে, সেটাতে মানবিকতা, প্রকৃতি ইত্যাদির প্রাধান্য থাকে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারগুলো বোঝা খুব জরুরি। এখন আমি বাচ্চারা কোন ধরনের গেমস খেলতে পছন্দ করছে তা দেখে কিন্তু তাদের উপযোগী এবং পছন্দের কনটেন্ট তৈরি করতে পারব। এখন প্রকাশকরা যদি চিন্তা করেন কী ধরনের বই শিশুরা আগামীতে পছন্দ করবে তাহলে তাদের (প্রকাশকদের) নিজেদের আগে ভিডিও গেমসগুলো দেখতে হবে। কোন ধরনের ডিভাইসে কোন বয়সের শিশু কোন ধরনের ভিডিও গেমস খেলছে। আমরা কার্টুন দেখেছি। সে সময়ের কার্টুন তো এখনকার বাচ্চাদের আনন্দ দেবে না। কারণ সময় বদলেছে। এখন কার্টুন নেই। এখন আছে ভিডিও গেমস। তারা ভিডিও গেমস খেলছে। এবং সঙ্গে সঙ্গে শিখছেও। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে আমেরিকার একজন শিশুর, ইউক্রেনের একটি শিশুর, জাপানের একটি শিশুর। তাদের মধ্যে যে মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা কিন্তু তারা তাদের কল্পনাশক্তি দিয়ে গড়ে তুলেছে, উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এটা আশাবাদের একটি ব্যাপার।

আমাদের সময়ের কল্পনার জগৎ আর এখনকার শিশুদের কল্পনার জগৎ এক নয়। এখনকার বাচ্চারা এত বেশি পাচ্ছে বাচ্চাদের পক্ষে ভালো বই বেছে নেওয়াটাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সময়ে টেলিভিশন ছাড়া উপায় ছিল না। আমরা বইও পেতাম খুবই সীমিত। কিন্তু সে বইগুলোতে প্রাণ ছিল। মায়া ছিল। বইগুলো ছিল জীবন্ত। এ কর্মযজ্ঞের ভেতরে একটা ভালোবাসা ছিল। এখন যে এত বই, কিন্তু দেখে মনে হয় এগুলো ভেতরে প্রাণশক্তি নেই। হয়তো ভালো কনটেন্ট, কিন্তু প্রডাকশনটা বাজে, ইলাস্ট্রেশনটা বাজে। ব্যাটে-বলে যেন মিলছে না। বই নির্মাণে সেই মনোযোগটা নেই। বই হচ্ছে, কিন্তু বই শিশু নিচ্ছে না। তাদের কল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বই পেলে তারা তুলে নেবে। নতুন কল্পনা, নতুন আইডিয়া, নতুন চিন্তার সঙ্গে মিশেল ঘটিয়ে সেই বই শিশুদের দিতে হবে।

বাচ্চাদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমরা বাচ্চাদের নিয়ে ভাবি না। আমাদের এটিই কাল হয়েছে যে, আমাদের জীবনে বাচ্চারা উপেক্ষিত। এ কারণে আমাদের এত এত বাচ্চাদের বই হচ্ছে কিন্তু বই বিক্রি হয় না। শিশুদের আমরা স্বাধীনসত্তা হিসেবে মনে করি না। খেলনা হিসেবে মনে করি। মনে চাইল আদর করলাম। মনে চাইল রেখে দিলাম-এমন মনোভাবের পরিবর্তন জরুরি।

শিশুসাহিত্য-কিশোর সাহিত্যের মধ্যে পার্থক্য কী কী?

শিশুসাহিত্য ও কিশোরসাহিত্য দুই ভিন্ন জগৎ। কৈশোরেই শুরু হয় মানুষের মনস্তত্ত্ব। শিশুদের থাকে কল্পনাশক্তি। শিশুদের মনস্তত্ত্ব থাকে না। শিশুদের মনস্তত্ত্ব নির্মাণ করেন শিশুদের মা-বাবা ও সমাজ। কিশোরের মনস্তত্ত্ব কিশোর নিজেই তৈরি করে। চিন্তার জগৎ কিশোর নিজেই তৈরি করে, তার বোঝাপড়ার জগৎ তৈরি করে। তার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, ভালোলাগা, মন্দলাগা ইত্যাদির প্রকাশ ঘটানো মুখ্য হয়ে ওঠে। কিশোর সাহিত্যের মূলে থাকে বন্ধুত্ব, ভালোবাসার অনুভূতি। যেগুলোর সঙ্গে সে পরিচিত না। মাত্র বোঝাপড়ার চেষ্টা করছে। এ অবস্থাটি কিশোর সাহিত্যের জন্ম দেয়। এ প্রবণতাটি শিশু সাহিত্যের নয়। এটিই মোটা দাগের পার্থক্য। শিশু সাহিত্য মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্য না কিন্তু কিশোর সাহিত্য মনস্তাত্ত্বিক সাহিত্য।

গত বছর যখন আমরা কিন্ডারবুকস শুরু করলাম তখন অনেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কিশোরদের জন্য আমরা কিছু করছি কি না। বেঙ্গল বুকসের যে সাব উইং সেটা কিশোর সাহিত্যের জন্যই নির্ধারিত থাকবে। সেজন্য আমরা বে ব্র্যান্ড থেকে কিশোরদের জন্য কিছু বই প্রকাশ করছি। বে ওয়েস্টার্ন, বে রোমান্স, বে-জুভেনাইল ইত্যাদি।

বর্তমান শিশু সাহিত্যে ইলাস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কী কী পরিবর্তন এসেছে?

আমি বই প্রকাশ, বুক ডিজাইন, প্রেস ইত্যাদির সঙ্গে বহুদিন ধরে যুক্ত আছি। আমাদের এখানে যারা বই প্রকাশ করছেন তাদের সঙ্গে ছাপাখানার, কালির সম্পর্কটা কম, নাই বললেই চলে। সে কারণে ভালো ইলাস্ট্রেশন হচ্ছে কিন্তু ছাপা হচ্ছে বাজে। গত আট-দশ বছরে কমপক্ষে বিশ থেকে ত্রিশজন ভালো ইলাস্ট্রেটর আমরা পেয়েছি। কয়েক বছর আগেও এটি ছিল না। এটা আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য ভালো। দশ বছর আগেও দুই-তিনজন ছাড়া এমন কোনো তরুণ ইলাস্ট্রেটর পাওয়ায় যেত না যারা শিশুদের জন্য আঁকছেন বা আঁকতে ইচ্ছুক। এখন যে বেশ বেশ কয়েকজন তরুণ ইলাস্ট্রেটর পাওয়া যাচ্ছে সেটা আনন্দের খবর কিন্তু ট্রেইনআপ করার একটা বড় ধাপ বাকি রয়েছে। তাতে তারা প্রফেশনাল হয়ে উঠবেন। অপেশাদারি মনোভাব আমাদের ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যায়, সারা বছর খুব ঢিলেঢালাভাবে কাজ হচ্ছে, বইমেলার সময় এলে তাড়াহুড়ো শুরু হয়ে যায়। আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র লেখকও দেখা যায় বইমেলা শুরু হয়ে যাওয়ার পর পাণ্ডূলিপি জমা দেন, প্রকাশকদের চাপ দেন বইটি বের করার জন্য। এটা একটি খুব খারাপ অভ্যাস। সার্বিকভাবে বুক কালচার গড়ে না ওঠার ফলাফল এটি। বুক কালচার গড়ে ওঠা খুব জরুরি। নইলে এসব সমস্যা থেকে যায়।

যেহেতু তরুণরা উঠে আসছে, বিশ-ত্রিশজন তরুণ আর্টিস্ট বাচ্চাদের জন্য আঁকছেন, আমি মনে করি তাদের ট্রেইনআপ করা, প্রশিক্ষণের জন্য দেশের বাইরে পাঠানো উচিত এবং এটি জরুরি। তারা প্রতিভাবান কিন্তু দেখা যায় ডেডলাইনে কাজ দিতে পারছেন না। আবার দেখা যায় কল্পনার সঙ্গে অঙ্কন দক্ষতার সমন্বয় করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। এটিও একটা দুর্বলতা। এগুলো প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কারণ এটি তো একটি টেকনিক। পাবলিকেশনের সবকিছুই তো টেকনিক। ভালো আর্টিস্টও হয়তো ভালো ইলাস্ট্রেশন আঁকতে পারবেন না যদি না টেকনিকটা জানেন। জাপান ইলাস্ট্রেশনকে কোথায় নিয়ে গেছে! ওরা একটা ফর্মুলা দাঁড় করিয়েছে। যতটুকু দরকার ততটুকুই আঁকতে হবে, তার বেশি নয়। আমি বাংলাদেশে কিছু বই দেখেছি। এতে লেখার চেয়ে ইলাস্ট্রেশন এত বেশি যে, লেখাটা হারিয়ে গেল। লেখা ও আঁকার একটি সমন্বয় দরকার। এটি নেই। আমি মনে করি এটি একটি বড় দুর্বলতা। এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারলে, আমি মনে করি, বাংলা প্রকাশনা শিশুদের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে এবং এখন সেই সুযোগ এসেছে। আমরা সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারব বলে আমার বিশ্বাস।

শিশু সাহিত্য রচনার জন্য কি একইভাবে লেখকদের আগ্রহও দেখছেন?

শিশুদের জন্য লেখকের একটা বড় ধরনের অভাব রয়েছে। শিশুদের জন্য লেখক নেই বললেই চলে। আমাদের যারা সিরিয়াস লেখক আছেন তারা কখনো আগ্রহী হননি বা সময় দেননি বললেই চলে। শিশু সাহিত্যিক বললে অনেকে অপমানিতবোধ করেন। শিশুরা উপেক্ষিত। এই উপেক্ষা পরিবারে, সমাজে এবং বইপত্রেও। বড় লেখকরা তাদের জন্য ভাবেন না। যারা ভাবেন তারা আবার সুযোগ পান না। প্রকাশকরা সেই সুযোগ তাকে দেন না।

স্মার্টফোন আর স্ক্রিনের যুগে কি বইয়ের যুগ শেষ হয়ে এলো?

একটা শোরগোল শোনা যায়, বইয়ের যুগ শেষ হয়ে এলো। আমি তা মনে করি না। গত বিশ বছর ধরে আমরা এটা শুনছি। এটা জোরেশোরে শুরু হয়েছিল কিন্ডেল আসার পর। আর বই থাকবে না। মজার ব্যাপার হলো, কিন্ডেল আসার পর আরও বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়ে গেল। একটা কম্পিউটারে বা ডিভাইস অনেক অনেক বইয়ের পিডিএফ থাকে, ই-বুক থাকে। হাজার হাজার। লাখের অঙ্কে দেখা যায়। এর মধ্যে একটি বই তো প্রায় অদৃশ্য। আর যখন আপনার কাছে দৃশ্যমান বস্তু আছে তখন আপনি কেন অদৃশ্য বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হবেন? এজন্য মানুষ ডিভাইসে (স্মার্টফোন, ট্যাব) আগ্রহী হলেও ই-বুক বা পিডিএফে আগ্রহী হয় না। ফলে বই থাকবে।

অমর একুশে বইমেলার শিশু চত্বর কতটুকু শিশুবান্ধব?

শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় মেলা হলো বোলোনিয়ার বইমেলা। সেখানে বই বিক্রিটা মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। লেখক-পাঠক-পাবলিকেশন এজেন্সির বাইরে বোলোনিয়ার বইমেলা হলো একটি উৎসব। একটি শিশু এই মেলায় আসবে। লাখ লাখ বই, লাখ লাখ কালার, লাখ লাখ কারেক্টারের সঙ্গে সে পরিচিত হবে। একটা উৎসবে, একটা আমেজের মধ্যে তার সময়টা পার করবে। এই ফেস্টিভ্যালটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে আমার কাছে। আমাদের এখানে অমর একুশে বইমেলায় শিশু চত্বরে যে মেলাটা হচ্ছে এবং আমরা শুক্র ও শনিবার সকালের সময়টা বলছি শিশুপ্রহর, এটা আমার মনে হচ্ছে নামমাত্র, করতে হয় বলে করা হচ্ছে এমন ব্যবস্থা। এটা এমন অব্যবস্থাপনায় চলছে, সে কারণে মনে হচ্ছে নামমাত্র। এটা যেখানে হচ্ছে সেটা বাচ্চাদের জন্য একদমই অনুপযোগী। শিশু চত্বর করতে হলে শিশুর খেলার জায়গা থাকতে থাকবে, বড় জায়গা। যেখানে শিশু খেলবে। খেলতে খেলতে সে পড়বে। সেটার জন্য আমাদের সব পাবলিশারকে আরও বেশি শিশুবান্ধব হতে হবে। শিশুদের স্টলের ভেতরে ঢোকাতে হবে। স্টলটি উন্মুক্ত করতে হবে। বড়দের বইমেলার স্টলের যেরূপ সেটি যদি শিশুদের স্টলেও থেকে যায় তাহলে আসলে আমরা তো শিশুদের জন্য ভাবলাম না, শিশুদের জন্য কিছুই করলাম না। শিশুদের জন্য পূর্ণাঙ্গ বইমেলা করতে হবে। প্রকাশকদের এগিয়ে আসতে হবে আলাদা এনটিটি নিয়ে। শিশুদের যদি আমরা বইমুখী না করতে পারি, তাহলে পাঠক তৈরি হবে কীভাবে?  আজকের শিশুই তো আগামী দিনের পাঠক।

শিশুদের বই প্রকাশের সময় প্রথম কোন বিষয়টি মাথায় আসে?

খুবই চমৎকার প্রশ্ন করেছেন। এ প্রশ্নের অপেক্ষায় আমি ছিলাম। শিশুদের বই প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরুর প্রথমে আমার মাথায় আসে আমি একজন নতুন শিশুর জন্ম দিচ্ছি। আর কিছু না, আমার মনে হয় আমি একটি নতুন শিশুর জন্ম দিচ্ছি।

মেলা উপলক্ষে প্রকাশিত সাড়ে তিন দিনের পত্রিকাটি ব্যাপক প্রশংসা লাভ করেছে। শিশুদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পত্রিকার কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

হ্যাঁ, শিশুদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ পত্রিকার অভাব আমিও অনুভব করছি। কিন্তু এটি শুরু করার আগে আমি নিশ্চিত হতে চাই, আমি প্রয়োজনীয় রিসোর্স পাব। লেখকরা কনটেন্ট দিতে পারবেন সেই নিশ্চয়তা আমি পেতে চাই। কারণ শিশুদের জন্য কনটেন্ট তৈরি খুবই কঠিন। আমি বললাম, আমি যখন শিশুদের জন্য বই তৈরি করি তখন মনে করি একটি নতুন শিশুর জন্ম দিচ্ছি। একজন লেখককেও কিন্তু একটি শিশুর জন্ম দিতে হবে। একটি শিশুর জন্ম দেওয়ার বেদনা যেমন একজন মা জানেন, তেমনি শিশুদের জন্য একটি বইয়ের জন্ম দেওয়ার বেদনা লেখক ও প্রকাশককেও জানতে হবে। আমাদের সময়ে নেই নেই করেও বেশ কিছু পত্রিকা ছিল। যেগুলো বেঁচেই ছিল লেখকদের জন্য। আমাদের (কিন্ডারবুকস) পত্রিকার জন্য পরিকল্পনা আছে। কিন্তু লেখক ও শিল্পী উভয়পক্ষ থেকে আমি যতক্ষণ না নিশ্চিত হব, ততক্ষণ আমি পত্রিকা নিয়ে আসতে চাই না, কারণ একটি দুর্বল পত্রিকা আমি করব না।

এবারের বইমেলায় কিন্ডারবুকসের কী কী বই আসছে?

এবারের বইমেলায় বিশ থেকে পঁচিশটি বই প্রস্তুত থাকলেও আমরা ততগুলো আনব না। কারণ গত বছর যে বইগুলো প্রকাশ পেয়েছে এবং ’২৩ ও ’২৪ সালের বইমেলার মাঝের সময়েও যে বইগুলো প্রকাশিত হয়েছে সে বইগুলোর প্রচার দরকার। তাই আমরা অল্প কিছু বই এবার প্রকাশ করছি। বাকিগুলো সারা বছর ধরে বের হতে থাকবে। আমাদের এখানে বিজ্ঞানের বই নেই। আবদুল আল মুতী সরফুদ্দিনের একটি বই ছিল আবিষ্কারের কাহিনী। সেই বইটি থেকে বিভিন্ন আবিষ্কারক- ডারউইন, নিউটন, লুই পাস্তুর, গ্যালভিনোর আবিষ্কারের গল্প নিয়ে আলাদা আলাদা স্টোরি বুক করছি। সামনের সপ্তাহেই এ বইগুলো চলে আসবে। এ সিরিজটি নিয়ে আমি আশাবাদী। সম্পূর্ণ অলংকরণসমৃদ্ধ। আরেকটি বই আসছে লুৎফর রহমান রিটনের। নাম আধখানা ভূত। এটিও খুব সুন্দর একটা বই হবে। আরেকটি বই আসছে, বন তো ভালো মানুষের জন্য। এটি একটি অনুবাদ বই। অনুবাদক মুম রহমান। আমাদের একটা কমিক বই আসছে, মোল্লা নাসিরুদ্দিন। দুই খণ্ডের কমিক বুক। সদ্য কিশোরদের জন্য একটা কমিক বই করছি, এটা আমাদের নিজস্ব কমিক, বাহরাম জাং। একটু থ্রিলার ও একটু ভৌতিক। আরও কিছু বই আসবে।

বই প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনটি প্রাধান্য দেন, অনুবাদ নাকি মৌলিক বই?

দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ভাষায় অনুবাদ এতই কম হয়েছে যে, প্রচুর অনুবাদ দরকার। বিগত বছরে অনুবাদের একটা জোয়ার দেখা গেলেও সেগুলো মানসম্মত নয়। এখন বিশ্বসাহিত্যের একটা চাহিদা যেহেতু তৈরি হয়েছে তাই গুণগত অনুবাদ প্রকাশ করতে হবে। কারণ অনুবাদ না হলে সাহিত্যের ভাষা বিবর্তিত হয় না। অনুবাদ না হলে ভাষার মধ্যে মিথস্ক্রিয়া হয় না। সাহিত্যের ভাষা সমৃদ্ধ হয় না। আর মৌলিক লেখা সমৃদ্ধ না হলে আমাদের সাহিত্যই দাঁড়াবে না। আবার মৌলিক লেখা সমৃদ্ধ হবে না যদি বিশ্বসাহিত্য পড়া না থাকে। ফলে আমরা দুটোকেই গুরুত্ব দিই।