মেট্রোরেলে বাসাবাড়ির কদর

মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলাকালে ভোগান্তি এড়াতে রাজধানীর মিরপুরের বাসা বদল করে আজিমপুরে চলে যান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মো. রাকিব হাসান। মেট্রোরেল চালুর পর সম্প্রতি ফের বাসা বদল করে মিরপুরে ফিরে এসেছেন তিনি। মিরপুর-১২ নাম্বার এলাকার বাসিন্দা রাকিব হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই বছর আগে মিরপুর এলাকা থেকে বাসা আজিমপুর এলাকায় নিই। মেট্রোরেল নির্মাণের জন্য মিরপুরের রাস্তার খুব খারাপ অবস্থা ছিল। মিরপুর থেকে শাহবাগ আসতে দুই ঘণ্টাও লেগে যেত। অফিসে যাতায়াত করতে খুব সমস্যা হতো। কিন্তু মিরপুর এলাকায় অনেক বছর ছিলাম। তাই এই এলাকার প্রতি একটা মায়া কাজ করে। যে কারণে মেট্রোরেল চালুর পর আবারও চলে আসলাম মিরপুরে। কারণ মেট্রোরেলে চড়ে এখন খুব সহজেই শাহবাগে যাওয়া যায়।’

রাকিব হাসানের মতো অনেককেই যানজটের শহর ঢাকায় যোগাযোগে আশার অলো দেখাচ্ছে মেট্রোরেল। দেশের অন্যতম বড় অবকাঠামো মেট্রোরেল। ছয়টি রুটের মধ্যে প্রথম রুটটি উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচল শুরু করেছে। যার প্রভাবে এরই মধ্যে মিরপুর ও উত্তরা এলাকার জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ির দাম বেড়ে চলেছে। দুয়েক বছর আগেও একেবারে বাধ্য না হলে অনেকেই যেতে চাইতেন না মিরপুর এলাকায়। মেট্রোরেল চালুর পর এখন সেই মিরপুরের বাসাবাড়ির বেশ কদর বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে বাসাভাড়াও বেড়ে গেছে।

মিরপুর এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ চলার সময় পুরো মিরপুর এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র যানজট লেগে থাকত। অন্য এলাকার মানুষ খুব একটা মিরপুরে বাসা ভাড়া নিতে আগ্রহী হতেন না। কিন্তু মেট্রোরেল চালুর পর ফের মিরপুর এলাকায় বসবাস করতে আগ্রহীর সংখ্যা বাড়ছে। মেট্রোরেলে যাতায়াত করা বেশিরভাগ মানুষ মিরপুর ও উত্তরার বাসিন্দা।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা পল্লবী এলাকার বাসিন্দা আয়েশা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিরপুরে বাসা নিয়ে খুব সমস্যায় ছিলাম। অফিস করে বাংলা মোটর থেকে গণপরিবহনে বাসায় ফেরা ছিল বড় ভোগান্তির। আমার আশপাশের অনেকেই তখন বাসা ছেড়ে দিয়ে অন্য এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর তাদের অনেকেই আবার মিরপুরে বাসা নিতে চাচ্ছেন।’

মিরপুর-১০ নাম্বার এলাকার একটি বাড়ির মালিক আবু সাইদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বাসা যে দিনের পর দিন ফাঁকা পড়ে ছিল তা নয়। কিন্তু দেখা যেত অনেক ভাড়াটিয়ার কাছে মিরপুরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। তাই অনেকেই বাধ্য হয়ে এই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা নিয়েছে। তবে এখন আবার কদর বাড়তে শুরু করেছে মিরপুরের। অনেক পুরনো ভাড়াটিয়া দেখছি এই এলাকায় এখন আবার বাসা নিতে চাচ্ছে। যার কারণ মূলত মেট্রোরেল চালু।’

একই এলাকার আরেকটি বাড়ির মালিক মমতাজ উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের তো নিজেদের বাড়ি। আমরা তো চাইলেই অন্য এলাকায় যেতে পারি না। অনেক স্মৃতি আছে এই এলাকা নিয়ে। তাই কষ্ট করে হলেও নিজের বাড়িতে ছিলাম বছরের পর বছর। কিন্তু মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর মিরপুরে এত সুন্দর যোগাযোগব্যবস্থা হবে সেটি আগে কখনো চিন্তা করিনি। এখন যানজট না থাকায় এবং সেই সঙ্গে আধুনিক গণপরিবহন থাকায় বেশ কদর বাড়ছে মিরপুরের বাসাবাড়ির।’

সার্বিক বিষয়ে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মেট্রোরেল হওয়ার পর মিরপুর এলাকা যোগাযোগ উপযোগী হিসেবে রূপান্তর হচ্ছে। কারণ আগে আমরা দেখেছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকতে হতো মিরপুরে। তাছাড়া একটি এলাকার আদর্শ এলাকা হতে হলে সেই এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হতে হয়। সেখান থেকে মানুষ যেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় দ্রুত যেতে পারে। মেট্রোরেল হওয়ায় এখন মিরপুর সে সুবিধা পাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিরপুর আগামীতে আরও নানা সুবিধা পেতে থাকবে মেট্রোরেলের জন্য। তবে কোনো বাড়ির মালিক যেন এগুলোকে কেন্দ্র করে ইচ্ছেমতো ভাড়া না ভাড়ায়, সেদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নজর দিতে হবে।’