ক্রিকেটের অনন্য প্রাণ আবদুল মমিন চৌধুরী চলে গেলেন নিভৃতেই

বিশিষ্ট ক্রিকেটানুরাগী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী আর নেই। গতকাল রাজধানীর নিজ বাসায় ৮৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিশিষ্ট এই ব্যক্তিত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান ও সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য ছিলেন। তবে দেশের ক্রীড়াঙ্গণের সঙ্গে তার সম্পর্কটি পুরোটাই ভালোবাসায় বন্ধনে আবদ্ধ।

দেশের ক্রিকেটে আশি-নব্বইয়ের দশক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়জয়কার। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের প্রায় সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। জাতীয় ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় নিয়মিত ফাইনাল খেলা সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের ম্যানেজার ছিলেন আবদুল মমিন চৌধুরী।

সেই সময়ে ক্রিকেটের চেয়ে জনপ্রিয়তায় বহু গুণে এগিয়ে ছিল হকি ও ফুটবল। ওই ক্রান্তিকালীন সময়ে ক্রিকেটে নিবিড়যত্নে লেগে ছিলেন তিনি। ১৯৭৬-৮৯ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটের ম্যানেজার হিসেবে ঘুরেছেন দেশের বিভিন্ন মাঠে। একই দায়িত্ব পালন করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলেও। গিয়েছিলেন পাকিস্তান সফরে। বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের প্রথম অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় দল উভয় ক্ষেত্রে ম্যানেজার হিসেবে আব্দুল মমিন চৌধুরীকে পেয়েছিলেন তিনি। স্মৃতিচারণ করতে হিয়ে জানান, ‘এশিয়া কাপ খেলার আগে বা পরপর আমরা পাকিস্তান সফর করেছিলাম। স্যার আমাদের ম্যানেজার ছিলেন। শৃঙ্খলা ও আন্তরিকার অসাধারণ সমন্বয় ছিল স্যারের। ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা ছিল অনন্য পর্যায়ের।’

মমিন চৌধুরীর পরিবারও ছিল ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত। নিজের ছেলে রনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেটার ছিলেন। তার শ্যালক চার্চিল জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটার। মমিন চৌধুরী নিজেও ক্রিকেট খেলতেন। আজকের বিপিএল ম্যাচের রেফারি ও সাবেক ক্রিকেটার শওকতুর রহমান চিনুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এনেছিলেন তিনি। বলেন, ‘আমি তখন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে চাকরি শুরু করেছি। হঠাৎ স্যার রাস্তায় আমাকে দেখে গাড়িতে উঠতে বললেন। গাড়িতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগে যোগ দিতে বললেন। স্যারের প্রস্তাব এবং নিজের ক্যাম্পাস সব কিছু বিবেচনা করে যোগদান করি। স্যার বলেছিলেন, ‘একদিন পরিচালক হবে’। শেষ পর্যন্ত পরিচালক হয়ে অবসর নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেটের প্রাণই ছিলেন মমিন চৌধুরী। ক্রিকেট অন্তঃপ্রাণ মমিন আকস্মিকভাবেই সম্পর্কচ্ছেদ করেন ক্রিকেটের সঙ্গে। সেই ঘটনা জানান চিনু, ‘নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে আন্তঃবিভাগ ক্রিকেট চলছে বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে। সেই ম্যাচের এক ঘটনায় বিক্ষুব্ধরা স্যারের প্রিয় গাড়ি পুড়িয়ে ফেলে। স্যার এতটাই ব্যথিত হন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত হননি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত আর না থাকলেও পরবর্তীতে ধারাভাষ্যকার হিসেবে কাজ করেছেন। ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে ছুটতেন স্টেডিয়ামে। তার ছাত্রদের সংকটে দিতেন পরামর্শ। পরোক্ষভাবে ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের সঙ্গেই ছিলেন। জাতীয় দলের সাবেক তারকা ক্রিকেটার সেলিম শাহেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় না দেশের ক্রিকেটে মমিন চৌধুরীর অবদান ও প্রভাব অনেক বলে মন্তব্য করেন,‘আমরা যখন ক্রিকেট খেলেছি তেমন কিছুই পাইনি। শুধু সিঙ্গারা ও কাসার গ্লাসে পানি খেয়ে খেলেছি শুধু ভালোবাসার টানেই। সেই সময় স্যার আমাদের ক্রিকেট খেলতে যেমন উদ্বুদ্ধ করতেন তেমনি সততার শিক্ষাও দিতেন। স্যারের জন্য আমরা আরও ক্রিকেটের প্রতি নিবেদন পেয়েছিলাম। স্যার শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয় বাংলাদেশের ক্রিকেটেও অবদান রেখেছেন।’

ক্রিকেটের এই অন্তপ্রাণ মানুষটির প্রয়াণে শোকাতুর হওয়ার কথা দেশের ক্রিকেটাঙ্গণকে। অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরীদের আন্তুরিকতায় ক্রিকেট এসেছে এতোদূর। তবুও তারা থেকে যান লোকচক্ষুর আড়ালে। চেনা-জানারাই কেবল শোক জানান এমন গুণীর বিদায়ে।