পাকিস্তানের ১৬তম সাধারণ নির্বাচন ঘিরে কয়েক মাস ধরে যে অনিশ্চয়তা ছিল, ভোটের পর তা আরও বেড়েছে। ক্ষমতাচ্যুত ও কারাবন্দি ইমরান খানকে বাইরে রাখার চেষ্টাও জনগণের রায়ে ভেস্তে গেছে; বরং এখন সরকার গঠনে নওয়াজ শরিফ ও বিলাওয়াল ভুট্টোর দৌড়ঝাঁপের মধ্যেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ইমরান খানই রয়েছেন।
শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ৯ মে-এর সহিংসতার ঘটনায় করা ১২টি মামলায় জামিন দেওয়া হয়েছে।
যদিও সরকারপ্রধান হওয়ার সুযোগ নেই। তবু এ বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে যে তাহলে কি সেনাবাহিনী নরম হতে বাধ্য হচ্ছে। একই ঘটনায় করা ১৩ মামলায় জামিন পেয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি। গতকাল রাওয়ালপিন্ডির সন্ত্রাসবিরোধী আদালত (এটিসি) তাদের জামিন দেয়।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর চাওয়া বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন এমন একটি নির্বাচন জাতিকে উপহার দিয়েছে, যাতে করে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ভোটের বাইরে রেখে দেশটির রাজনীতিতে আজীবন নিষিদ্ধ হওয়া নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতায় ফেরানোর যে সহজ হিসাব পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র করেছিল, ভোটের ফলে তা উল্টে গেছে। শেষ পর্যন্ত ইমরানের দলকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি তারা। সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) বা পিএমএল-এন ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে আছে স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়ে ভোটে লড়াই করা পিটিআই। এখন পর্যন্ত যে ফলাফল মিলেছে, তা একদিকে যেমন পরিষ্কার, আবার জটিলও বটে।
কারাবন্দি ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের ব্যানারে ভোটে দাঁড়াতে যাদের পথে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই সবচেয়ে বেশি আসন জিতে নিয়েছেন। তবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন জেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের দল এখন নিজেদের ‘একক বৃহত্তম দল’ হিসেবে দাবি করেছে। অন্যদিকে নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছে থাকায় এখনো কোনো পক্ষের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলাপ হয়নি বলে দাবি করেছেন বিলাওয়াল ভুট্টো। আর পিটিআই চেয়ারম্যান গহর আলি খান বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত দেবেন ইমরান খান। ইমরান জেলে থাকুন আর না থাকুন তিনিই আমাদের নেতা।’
গতকাল শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত জাতীয় পরিষদের (পার্লামেন্ট) ২৬৫ আসনের মধ্যে ২৫৪টির ফল প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন (ইসিপি)। এর মধ্যে পিটিআই সমর্থিত ও অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন ১০০টি আসন। নওয়াজ শরিফের দল পিএমএল-এন জিতেছে ৭৩টি আসনে আর বিলাওয়াল ভুট্টোর পিপিপি জিতেছে ৫৪ আসনে। মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট (এমকিউএম) জয়ী হয়েছে ১৭টি আসনে। এ ছাড়া পাকিস্তান মুসলিম লিগ (পিএমএল-কিউ) ৩টি, জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম (জেইউআই) ৩ ও ইমরান খানের দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠিত দল আইপিপি জিতেছে ২টি আসনে। পাকিস্তান মুসলিম লিগ-জে পেয়েছে ১টি আসন। এখনো ১০ আসনে ফলাফল আসার বাকি। আর একটি আসনের ভোট স্থগিত করা হয়েছে এক প্রার্থী নিহতের ঘটনায়।
পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য একটি দলকে অন্তত ১৩৩টি আসনে জয় পেতে হবে। এর সঙ্গে সংরক্ষিত ৬০ নারী ও ১০ সংখ্যালঘু থেকে আসন অনুপাতে যোগ হবেন সংসদ সদস্যরা। কিন্তু ফলাফল যা বলছে, তাতে এবারের ভোটে কোনো দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। এ অবস্থায় ভোটের ফলাফল মোটামুটি পরিষ্কার হলেও আসল জটিলতা রয়েছে পরবর্তী ধাপে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জে ফলাফল পাল্টেও যেতে পারে। কিন্তু এটিই শেষ নয়। সরকার গঠন করতে হলে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কোনো একটি দলে যোগ দিতে হবে। আর সেটি করতে হবে প্রার্থীদের অফিশিয়ালি বিজয়ী ঘোষণা করার পর থেকে তিন দিনের মধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই পিটিআইকে এখন দ্রুত সমাধানের পথ বের করতে হবে।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলো এরই মধ্যে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে নজর দিতে শুরু করেছে; প্রতিটি দলই আশাবাদী তাদের দলে ভেড়ানোর ব্যাপারে। একই সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পার্লামেন্টে যেতে নওয়াজের দল পিএমএল-এনের জোট গঠন করতে হবে। অন্যদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ধরেই নেওয়া যায়, শিগগিরই কারাগার থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না ইমরান খান। ফলে পিটিআইকেও ঠিক করতে হবে, কে তাদের নেতৃত্ব দেবেন। নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের রাজনীতিকে আরেকটি বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষক অনেকটাই নিশ্চিত, বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীর বিরোধিতা করলেও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও পিএমএল-এন নেতা নওয়াজ শরিফ তাদের সমর্থন পাচ্ছেন। তারপরও ইমরানের দল সমর্থিত প্রার্থীরা জিতেছেন। এ অবস্থায় পাকিস্তানের রাজনীতিতে সব সময় প্রভাব বিস্তার করে আসা সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে?
গতকাল দেশটির সেনাপ্রধান জেনারেল সৈয়দ আসিম মুনির বলেন, পাকিস্তানের বৈচিত্র্যময় রাজনীতি ও বহুত্ববাদ সব গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ সরকারের মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। আইএসপিআরের মাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে সৈয়দ আসিম মুনির আরও বলেন, ‘নির্বাচন জয়-পরাজয়ের শূন্য-সমষ্টি নয় বরং গণরায় নির্ধারণের একটি মহড়া। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তাদের কর্মীদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের শাসন ও সেবা করার প্রচেষ্টাকে একত্র করা উচিত, যা গণতন্ত্রকে কার্যকর ও উদ্দেশ্যমূলক করার একমাত্র উপায় হতে পারে।
কিন্তু সেটা কীভাবে হবে তা নিয়েই দেখা দিয়েছে সংকট। যেহেতু ইমরান খানের দল পিটিআই এবার একক দল হিসেবে ভোটে লড়েনি, তাই সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে ধরা যাচ্ছে না তাদের। এদিকে, নওয়াজ শরিফ বিজয়ের ঘোষণা করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় সরকার গঠন করতে পারবে না তার দল। তাই জোট গঠনের জন্য ইতিমধ্যেই অন্যান্য রাজনৈতিক দলের শরণাপন্ন হচ্ছেন তিনি। জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতিতে জোট সরকার গড়তে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে পিএমএল-এন ও বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারির দল পিপিপি। এর আগে ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পিপিপি ও পিএমএল-এন একসঙ্গে জোট গড়েছিল।
তবে গতকাল পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো বলেছেন, সরকার গঠনে সম্ভাব্য জোট নিয়ে তার দল পিএমএল-এন, পিটিআই বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা করেননি।
পিএমএল-এন প্রেসিডেন্ট শেহবাজ শরিফের সঙ্গে তার বা তার বাবা আসিফ জারদারির কোনো বৈঠক হয়েছে কি না জিও নিউজ জানতে চাইলে বিলাওয়াল বলেন, ‘আমি এ ধরনের কোনো বৈঠক নিশ্চিত করার মতো অবস্থানে নেই। যখন সব ফলাফল প্রকাশ হবে, তখন আমরা অন্য কারও সঙ্গে জোট বাঁধব কি না ভাবব।’
বিলাওয়াল বলেছেন, পিটিআইয়ের কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী এখনো পর্যন্ত তার সঙ্গে বা কোনো পিপিপি নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এমনকি জোট বাঁধার কথাও জানাননি।
এদিকে ডন-এর খবরে বলা হয়েছে, ভোটে পিটিআইয়ের সাফল্যের পরও বেশ কিছু প্রতিকূলতা রয়েছে দলটির। নির্বাচন কমিশন কর্র্তৃক দলটির প্রতীক কেড়ে নেওয়া এবং শীর্ষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতাদের কারাগারে পাঠানো ও মামলা রয়েছে। তবে পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন দলটির নির্বাচনী প্রতীক কেড়ে নিলেও পিটিআইয়ের নিবন্ধন বাতিল করেনি। আইনত পিটিআই এখনো একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিদ্যমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, পিটিআই সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যদি পার্লামেন্টের বৃহত্তম গোষ্ঠী হয়ে যান, তাহলে তাদের একটি বিদ্যমান রাজনৈতিক দলে যোগদান করতে হবে। শোনা যাচ্ছে, মজলিশ ওয়াহদাত-ই-মুসলিমিন (এমডব্লিউএম) দলের সঙ্গে জয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যোগ দিতে পারেন। এই দলে যোগ দিলে তারা সংরক্ষিত আসনের ভাগও পেয়ে যাবেন। এরপর তারা পার্লামেন্টের নেতা হওয়ার জন্য নিজেদের একজন প্রার্থী দিতে পারবেন।
১২ মামলায় ইমরানের জামিন : ইমরান যে ১২ মামলায় জামিন পেয়েছেন, এর মধ্যে পাকিস্তানের সেনা সদর দপ্তর এবং সেনা জাদুঘরে হামলার মামলাও আছে। এসব মামলায় তাকে ১ লাখ পাকিস্তানি রুপির মুচলেকায় স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে।
রাওয়ালপিন্ডির সন্ত্রাসবিরোধী আদালতের বিচারপতি মালিক ইজাজ আসিফ জামিন আবেদনের শুনানি করেন। তিনি বলেন, পিটিআই প্রতিষ্ঠাতাকে গ্রেপ্তার করে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ৯ মে-এর ঘটনায় অভিযুক্ত সবাই জামিনে আছেন।
নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ : নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র ভোটের সময় নির্বাচনী স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, অবাধ তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগের মতো মৌলিক মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য যুক্তরাজ্য পাকিস্তানের কর্র্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছে। এক বিবৃতিতে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এই নির্বাচনে সব দলকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার পাকিস্তানের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ‘মতপ্রকাশ, সংগঠন ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর অযৌক্তিক বিধিনিষেধ’ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার কথা এবং ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধের বিষয়েও বলেছেন। তিনি মনে করেন, নির্বাচনে হস্তক্ষেপের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার পেছনে এগুলো কারণ।