রোজানির্ভর পণ্যের এলসি খুলতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ঋণ যেমন সরবরাহ ঋণ, ট্রেড ক্রেডিট বা বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় রোজানির্ভর পণ্য আমদানির এলসি খোলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আগামী মার্চ পর্যন্ত সময় দিয়েছে। ওই সময়ের মধ্যে এসব পণ্য আমদানিতে ঋণনির্ভর এলসি খোলা যাবে। এছাড়া যেসব নিত্য বা রোজানির্ভর পণ্য ইতিমধ্যে আমদানি হয়েছে বা এলসির দায় পরিশোধের সময় এসেছে সেগুলোর দেনা ব্যাংক বা উদ্যোক্তারা পরিশোধের জন্য ডলারের সংস্থান করতে না পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে জোগান দিচ্ছে। আমদানি ও এলসি খোলার তথ্য বিশ্লেষণের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, গত এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে দু-একটি ছাড়া অনেক পণ্যের দামই কমেছে। যে কারণে ডলারের হিসাবে এলসি কমলেও দাম কমায় পণ্যের আমদানি বেড়েছে । তাই আসন্ন রোজায় বাজারে নিত্যপণ্যের কোনো সংকট হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে পেঁয়াজের এলসি বেড়েছে ১১২ দশমিক ৪০ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে ১০৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ। কারণ, ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় এলসি খোলা বেড়েছে। গত বছরের ওই সময়ে ভারতে পেঁয়াজের দাম কম ছিল। গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি চিনির দাম ছিল ৪০ সেন্ট, এখন তা বেড়ে হয়েছে ৫৭ সেন্ট। ওই সময়ে এর দাম বেড়েছে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। যে কারণে চিনি আমদানির এলসি খোলা বেড়েছে ২৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ ও আমদানি বেড়েছে ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। রোজায় এর চাহিদা বেশি থাকে। ফলে আমদানিও বেশি হয়েছে।
রোজায় সয়াবিন তেলের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু আমদানি কমেছে। তবে গত এক বছরের ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কমেছে ২৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। গত বছরের নভেম্বরে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের প্রতি টনের দাম ছিল ১৫৬০ ডলার। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১১২৫ ডলারে। একই সময়ে পাম অয়েলের প্রতি টনের দাম ৯৯৭ ডলার থেকে কমে ৮৫৬ ডলারে নেমেছে। আলোচ্য সময়ে দাম কমেছে ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। যে কারণে এলসি ও আমদানি কমেছে ডলারের হিসাবে। তবে বাজারে চাহিদা অনুযায়ী আমদানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। রোজায় বিভিন্ন ধরনের ফলের চাহিদা থাকে বেশি। এবার দেশি ফলের মধ্যে বরই, কমলা, পেয়ারা, পেঁপে, বারোমাসি তরমুজ, ডালিম, কলার সরবরাহ থাকবে। তারপরও আমদানি ফলের চাহিদাও রয়েছে। এর মধ্যে খেজুরের চাহিদা বেশি। ডলার সংকটে খেজুরের এলসি খোলা আগে কমলেও এখন বাড়ছে। এছাড়া সার্বিকভাবে ফলের এলসি খোলা বেড়েছে ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ। নতুন এলসিতে ফল দেশে আসা শুরু করলে আমদানি বেড়ে যাবে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি করা হচ্ছে। রমজান টার্গেট করে এখন থেকেই মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বসে সবকিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনিয়ম পেলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
এদিকে দায়িত্ব পেয়ে দপ্তরে আসার প্রথম দিনই ভোক্তাবান্ধব দ্রব্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনার’ একগুচ্ছ পরিকল্পনা সামনে আনলেন নতুন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী আহসানুল ইসলাম টিটু। বললেন কোনো ভয়ভীতি দেখিয়ে নয়; সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই সরকার দ্রবমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তেল, চিনি, লবণ, কৃষিপণ্য, ডাল এসব নিয়ে যারা কাজ করে, তারা যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে কাজ করে সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবে। পণ্য আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো কারসাজি করতে না পারে, সে জন্য কঠোর তদারকি করা হবে। কেউ কারসাজি করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজারমূল্য ঠিক রাখতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নিয়ে সমন্বয় কমিটি গঠন করার পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি। ব্যবসায়ীদের মজুদদারি শক্ত হাতে দমন করা হবে। যারা এসব করে, তাদের ব্যবসায়ী বলা যায় না। তারা অসাধু কিছু গোষ্ঠী। কোথাও মজুদদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট দেখলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা ভালোভাবে ব্যবসা করবে, তাদের সহযোগিতা করা হবে। সরকার চায় নিত্যপণ্যগুলো যেন মানুষের জন্য সহজলভ্য থাকে।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে সচিবালয়ে সম্প্রতি (১৫.১.২৪) বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি নেওয়া হলে ‘৩৩৩’ নম্বরে ফোন করে অভিযোগ জানানো যাবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে এই সুবিধা চালু করার পরকিল্পনা করা হয়েছে বলে জানা যায়। বাজার দরে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং এ বিষয়ে ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে উদ্ভাবনী পরিবর্তন আনা সংক্রান্ত এই সভার আয়োজন করে ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য ও যোাগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। টিসিবি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, দোকান মালিক সমিতি, সুপারশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশেন, ভোগ্যপণ্যের বিভিন্ন করপোরেট গ্রুপের প্রতিনিধিরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
২০২০ সালে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর দুস্থ মানুষের ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে ও রোগী শনাক্ত করতে ‘৩৩৩’ এর ব্যবহার বাড়ানো হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে ‘৩৩৩’-কে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হলো। বর্তমানে ‘৩৩৩’ নম্বরে যেসব সেবা আছে, সেগুলো চালু থাকবে। পাশাপাশি ‘৩৩৩’ নম্বরে ফোন করার পর আর একটি ডিজিটে চেপে নতুন সেবাটি পাওয়া যাবে। নতুন একটি ওয়েবসাইট খোলা হবে; যেখানে পণ্যের দাম, মজুদসহ বিভিন্ন তথ্য থাকবে। যেকোনো পণ্য উৎপাদন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, বিপণন ও আমদানি পর্যায়ে সঠিক তথ্যউপাত্ত সংরক্ষণ করা ও নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন
netairoy18@gmail.com