ভালো বইয়ের খোঁজ কোনো না কোনোভাবে পাঠক পেয়ে যায়

আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ছোট কাগজ সংবেদ করতেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেন। নয়টি সংখ্যা বের হওয়ার পর কাগজটি বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রায় ১০ বছর পর তিনি তখন রামেন্দু মজুমদারের বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠানের চাকরি ছেড়ে জড়িয়েছেন প্রিন্টিং ব্যবসার সঙ্গে। একদিন লেখক বেনজিন খান একটা পা-ুলিপি তাকে দেখিয়ে পরামর্শ চান সেটা কীভাবে প্রকাশ করা যায়! পান্ডুলিপিটি ছিল তার সম্পাদনায় এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদকে নিয়ে একটি সংকলন, ‘এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাঈদ : আ বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর’। পান্ডুলিপিটি দেখেই মুগ্ধ পারভেজ হোসেন লেখককে বলেন, ‘চিন্তা করবেন না, এটা আমিই ছাপব। আমার ছাপাখানার নামও কিন্তু ‘সংবেদ’। এভাবেই কোনোরকম পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ করে একটি বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে ২০০৬ সালে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সংবেদের যাত্রা শুরুর কথা বলছিলেন প্রকাশক পারভেজ হোসেন।

১৮ বছরে সংবেদের বড় অর্জন কী আর কেমন বই প্রকাশ করেন জানতে চাইলে পারভেজ হোসেন বলেন, ‘বড় অর্জন অনেক বড় ব্যাপার। ওসব কিছু নেই আমাদের। কোনো পুঁজি ছাড়াই বই ছাপতে নেমে একটা একটা করে বই করেছি সৃজন-নন্দন-মননের দিকে তাকিয়ে। আমাদের স্লোগানও তাই সৃজনে-নন্দনে-মননে। আমি যেভাবে এগিয়েছি, সেটাকে বইয়ের ব্যবসা বলে না। এটা হলো লিটল ম্যাগাজিন থেকে উদ্ভূত লিটল প্রকাশনা। আমার ছাপাখানার লোকজনকে দিয়ে কিছু কাজ করিয়ে নিই। বাকি যা কিছু আমি একাই করি। সংবেদ প্রকাশনার কোনো কর্মী নেই। অনেক বন্ধুজন আছেন পা-ুলিপি দেখে দেন। কয়েকজন প্রুফ রিডার আছেন অনেক কম পারিশ্রমিকে প্রুফ দেখেন, প্রয়োজন হলে কেউ কেউ কম্পোজ করেন। আমার বিশেষ পছন্দ মননশীল বই। দেশের এবং বিদেশের। সব সময় ভালো পান্ডুলিপির অপেক্ষায় থাকি। যারা সংবেদকে ভালোবেসে পান্ডুলিপি নিয়ে আসেন মনমতো হলে বাজারের কথা বিবেচনা না করেই ছাপি। এই করতে করতে একটা ধারা হয়তো তৈরি হয়ে থাকবে।’

এবারের বইমেলায় সংবেদের প্রস্তুতি কেমন, উল্লেখযোগ কতগুলো বই প্রকাশ করতে পারবেন এমন প্রশ্নের জবাবে পারভেজ হোসেন বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক কারণ বিবেচনায় এবং কাগজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রস্তুতি তেমন ছিল না বলা যায়। তারপরও বেশ কয়েকটা বই প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি লেখক ঘাসান কানাফানির উপন্যাস-গল্প-সাক্ষাৎকারের একটি সংকলন “মেন ইন দ্য সান”, আকিমুন রহমানের প্রবন্ধের বই “নিরন্তর পুরুষভাবনা”, দ্রবির সৈকতের “ফ্রয়েডীয় লিবিডো তত্ত্ব এবং তান্ত্রিক দেহাত্মবাদ : সমীক্ষণ ও তুলনামূলক বিচার”, গুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর “ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড” উল্লেখযোগ্য। আরও কয়েকটি বই এক সপ্তাহের মধ্যে প্রকাশ পাবে।’

বইয়ের প্রচারণা প্রসঙ্গে এই প্রকাশক ও কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘আমার মতো প্রকাশকের পক্ষে টাকা খরচ করে বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া তো সম্ভব নয়। আবার আমার লেখকরাও তেমন নন। যার যার ফেসবুকে যতটুকু সম্ভব প্রচার দিচ্ছেন। বইমেলা শুরু হলে বইয়ের প্রচার নিয়ে যে উন্মাদনা চলে, আমি কিছুটা এড়িয়ে চলি। মেলায় অংশ নিয়েছি, প্রচারের জন্য এটা তো কম নয়। মিডিয়া প্রতিদিন ভালো ভালো বইয়ের তালাশ দিচ্ছে, প্রচ্ছদ ছাপছে। ভালো বইয়ের খোঁজ কোনো না কোনো প্রক্রিয়ায় পাঠক পেয়ে যায়।’

সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক হিসেবে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন প্রশ্নের জবাবে পাঠক না থাকার সমস্যাকেই বড় করে তুলে ধরলেন পারভেজ হোসেন। বলছিলেন, ‘বই বিক্রি কম হওয়া, কোনো কোনো বই একেবারেই বিক্রি না হওয়া প্রকাশকের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। ১৮-১৯ কোটি মানুষের দেশ। একটা ভালো বই যদি ১২ থেকে ২ হাজার কপি বিক্রি হয়, লেখক প্রকাশক উভয়ের জন্য তা আনন্দের। কিন্তু মানুষের জীবন এখন এতটাই বহুমুখী, নিঃশ্বাস ফেলারও ফুরসত নেই কারও। সময় নিয়ে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার সময় কই? বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা উদ্বেগ আছে আমার মধ্যে। বই যদি কেনা হয়, পড়া হয় কতখানি নিজেকে দিয়েই তো অনেকটা বুঝতে পারি। পড়ার অভ্যাস থেকে ক্রমান্বয়ে ছিটকে পড়ছে মানুষ। বহুমুখিতা মানুষকে এতটাই অস্থির করে তুলেছে সময় নিয়ে সুস্থির হয়ে পড়তে পারাটা বুঝি দিনে দিনে খোয়া যাচ্ছে।’

পরের প্রশ্নটি ছিল বই প্রকাশে আগ্রহী লেখকদের কাছে প্রকাশক হিসেবে কী প্রত্যাশা থাকে! কেমন লেখা হলেই বা নিঃসংকোচে বই প্রকাশ করেন! প্রায় ৬ দশক লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত পারভেজ হোসেন বলেন, ‘একজন লেখক যখন তার পান্ডুলিপিটি দেবেন যেন সময় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ করেই দেন। এলোমেলো অসম্পূর্ণ পান্ডুলিপি প্রকাশককে বিড়ম্বনায় ফেলে। সম্পাদনা করে প্রুফ দেখে গোছানো পান্ডুলিপিকে প্রকাশযোগ্য করার দায়িত্ব প্রকাশকের। বিচিত্র বিষয়ের পান্ডুলিপি হলে বই প্রকাশের আনন্দ বেড়ে যায়। নানা রকম বইয়ের সমাহারের অভাব রয়েছে আমাদের প্রকাশনা শিল্পে। কিন্তু গল্প-কবিতা-উপন্যাসের ভিড়ে আর সবকিছু হারিয়ে যাচ্ছে।’

অমর একুশে বইমেলার আয়োজন ও বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে এই কথাসাহিত্যিক প্রকাশক বলেন, ‘বাংলা একাডেমি এই মেলার আয়োজন করে যাচ্ছে দীর্ঘদিন। একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে মেলা বৃহৎ পরিসরে এসে যে নান্দনিকতা পেয়েছে, লেখক-পাঠক-প্রকাশকের এই মিলনমেলা সবার জন্যই গৌরবের, আনন্দের। কিন্তু যথেষ্ট সমন্বয়হীনতা আগেও ছিল এখন আরও বেড়েছে। বাংলা একাডেমি প্রকাশকদের পাশ কাটিয়ে একাই যদি সব সিদ্ধান্ত নেয়, সব দায়িত্ব পালন করতে চায়, ভবিষ্যতে মেলার উন্নতি না ঘটে নিম্নগামী হবে এবারের আয়োজনে তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। অন্য অনেক কিছু বাদ দিয়ে শুধু লিটল ম্যাগাজিন চত্বরটায় গেলে টয়লেট ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে আর কিছু