মোনেম মুন্না, একজন ক্ষণজন্মা ফুটবলযোদ্ধা

দীর্ঘকায় এবং মজবুত দেহের অধিকারী মোনেম মুন্নার রক্ষণে উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের কাজটা কঠিন হয়ে পড়া। অবয়বে একটা কাঠিন্য, মাঠে সবাইকে একাট্টা করে রাখার সহজাত ক্ষমতাই মুন্নাকে অনেকের চেয়ে আলাদা করে চিনিয়েছে। ১৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে  ক্ষণজন্মা ফুটবলারকে স্মরণ করছে দেশ রূপান্তর


ফুটবল গোলের খেলা। বিশ্বজুড়ে ৮ ফুট লম্বা ও ২৪ ফুট চওড়া পোস্টে লক্ষ্যভেদকারী স্ট্রাইকারদের নিয়েই যত উন্মাদনা। এর ব্যতিক্রম যে নেই, তা বলা যাবে না। সে রকম এক ব্যতিক্রম ফুটবলারের ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল বাংলাদেশের ফুটবল আকাশে। যাকে নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক জার্মান কোচ অটো ফিস্টারের বলা কথাটা আজও কানে বাজে। বাংলাদেশ পাট চুকানোর অনেক পরে ঘানা এবং টোগোর মতো দেশকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া সফল এই কোচ বলেছিলেন, ‘হি ওয়াজ মিসটেকেনলি বর্ন ইন বাংলাদেশ’। যাকে নিয়ে তিনি এই উক্তিটি করেছিলেন তিনি আর কেউ নন। বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মোনেম মুন্না। ২০০৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অমোঘ মৃত্যু তাকে গ্রাস করলেও লাখো ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ে বেঁচে আছেন মুন্না।
একজন ডিফেন্ডার হয়েও যে আকাশছোঁয়া তারকাখ্যাতি লাভ করা যায়, মুন্না সেটা দেখিয়েছিলেন। দেখিয়েছিলেন শুধু ফুটবল খেলেই জয় করে নেওয়া যায় কোটি মানুষের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ফুটবলারদের তালিকার ওপরের দিকেই থাকবে তার নাম। কেবল তার খেলা দেখতেই আবাহনী ম্যাচের দিন উপচে পড়ত গ্যালারি। তাই তো তার এক সময়ের সতীর্থ, দেশের ফুটবলের আরেক নক্ষত্র শেখ মোহাম্মদ আসলাম নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারেন, ‘আরেকটি মুন্নার আগমন এদেশের ফুটবলে ঘটবে কীনা তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে।’
মুন্নার উত্থানটা আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। জন্ম হয়েছিল এক সময় দেশের ফুটবলের আঁতুড়ঘরখ্যাত নারায়ণগঞ্জে ১৯৬৮ সালের ৯ জুন। বেড়ে ওঠা আর ফুটবলের হাতেখড়িও নিজ শহরে। আশির দশকের গোড়ার দিকে পোস্ট অফিস দলের হয়ে পাইওনিয়র লিগ দিয়ে ঢাকার ফুটবলে পা রাখেন মুন্না। ১৯৮২ সালে দ্বিতীয় বিভাগ লিগে খেলেন শান্তিনগরের হয়ে। পরের বছর মুক্তিযোদ্ধাকে দ্বিতীয় বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে নিয়ে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও তখনো মুন্না সত্যিকারের মুন্না হয়ে জ্বলে উঠতে পারেননি। প্রথম বিভাগে দুই মৌসুম মুক্তিযোদ্ধায় খেলার পর ১৯৮৬ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নে নাম লেখান তিনি। আর সে মৌসুমেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের সুবাদে আবাহনীর কর্তাদের নজর কাড়েন। ১৯৮৭ সালে সেই যে আবাহনীতে এলেন, এরপর থেকে আবাহনীই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। আকাশি-হলুদ জার্সিতে খেলেছেন টানা ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে মুন্নার তারকাখ্যাতি ছিল আকাশছোঁয়া। এমন তারকাকে যোগ্য সম্মান দিতে কুণ্ঠা করেনি আবাহনী। ১৯৯১ সালে আবাহনীর সঙ্গে রেকর্ড ২০ লাখ টাকার চুক্তির মধ্য দিয়ে ঢাকার ফুটবলে নতুন ইতিহাস গড়েন মুন্না। সে সময়ের আর্তসামাজিক পরিস্থিতিতে যা ছিল চিন্তারও বাইরে। তার এই রেকর্ড দীর্ঘদিন কেবল বাংলাদেশে নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় অক্ষুণ্ন থেকেছে। আবাহনীতে অভাবনীয় পারফরম্যান্সের ফলেই মুন্নার দিকে চোখ পড়ে যায় কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলের। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩Ñ তিন মৌসুম ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলে ওপার বাংলার মানুষের হৃদয়ে পাকাপাকি জায়গা পেয়ে যান মুন্না। 
জাতীয় দলে এই ডিফেন্ডারের অভিষেক ১৯৮৬ সালে। সিউল এশিয়াডে বাংলাদেশ দলের হয়ে অভিষেকের পর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। খেলেছেন ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। এর মধ্যে একাধিকবার দলকে নেতৃত্বও দিয়েছেন মুন্না। তার নেতৃত্বেই ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ ইতিহাসে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপার স্বাদ পায় (মিয়ানমারে চারজাতি আসর)।
দীর্ঘকায় এবং মজবুত দেহের অধিকারী ছিলেন মুন্না। রক্ষণে তার উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের কাজটা কঠিন হয়ে পড়া। অবয়বে একটা কাঠিন্য, মাঠে সবাইকে একাট্টা করে রাখার সহজাত ক্ষমতাই মুন্নাকে অনেকের চেয়ে আলাদা করে চিনিয়েছে। মুন্না ছিলেন সেলিব্রেটি ফুটবলারদের একজন। কাজী সালাউদ্দিনের পর তাকেই ধরা হয় এদেশের সবচেয়ে স্টাইলিশ ফুটবলার। সে সময় মুন্না কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে গেলে রীতিমতো ভিড় জমে যেত। তার এই জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করেই একটা সময় তাকে শুভেচ্ছাদূত করেছিল জনপ্রিয় কনজ্যুমার ব্র্যান্ড ইউনিলিভার বাংলাদেশের লাইফবয়। সে সময় তাকে নিয়ে করা বিজ্ঞাপনগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। নিজের সহজাত প্রতিভা দিয়েই মুন্না পরিণত হয়েছিলেন বাংলাদেশ ফুটবলের ‘পোস্টার বয়’।
তার আবাহনী, জাতীয় দল এবং ইস্ট বেঙ্গলের সতীর্থ শেখ মোহাম্মদ আসলাম মুন্নার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘মুন্নার সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন খেলেছি। ও আমার অনেক স্নেহের ছোট ভাই ছিল। তাই তার সম্পর্কে বলতে গেলেই আমি আবেগতাড়িত হয়ে পড়ি। বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে যে কজন ডিফেন্ডারের নাম সবার আগে আসবে তাদের মধ্যে একজন ছিল মুন্না। মনোয়ার হোসেন নান্নু ভাই তার সময়ে ছিলেন দেশসেরা ডিফেন্ডার। আর মুন্না যখন তারকাখ্যাতি পায়, তখন দেশের ফুটবলে তারকার ছড়াছড়ি। আমরা তখন তারকা হয়েছিলাম প্রচুর গোল করে। কিন্তু ও তারকা হয়েছে রক্ষণভাগে নিজের দৃঢ়তার ছাপ রেখে। ছিপছিপে গড়নের কারণে ও ছিল একজন দক্ষ হেডার। মাঠে ওর উপস্থিতিই গোটা দলকে অন্যভাবে উজ্জীবিত করে তুলত। আমার সঙ্গে ওর সম্পর্ক ছিল অনেক নিবিড়। বোঝাপড়াও খুব ভালো ছিল। নিজেদের অর্ধ থেকে লম্বা বল ফেলেই ও চেঁচিয়ে বলত, আসলাম ভাই গোল করেন। মাঠে ওর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল সবাইকে উজ্জীবিত করে রাখা। নেতৃত্ব গুণাবলিতে ও ছিল অনন্য। আর মাঠের বাইরের মুন্নাও ছিল আলাদা। সবার সঙ্গে ছিল তার সুসম্পর্ক। সিনিয়র-জুনিয়র সবাইকে সবসময় মাতিয়ে রাখত। ওর আরেকটা ব্যাপার আমার খুব ভালো লাগত। ও ছিল খুব স্পষ্টভাষী। কারও ভালোটা যেমন সে সরাসরি বলত, খারাপটাও সরাসরি ধরিয়ে দিত। ও ছিল সত্যিকারের তারকা। তাই তো ওকে কখনো মিডিয়ার পেছনে দৌড়াতে হয়নি। বরং ওর পেছনেই মিডিয়া দৌড়াত।’
জাতীয় দলে দীর্ঘদিন একসঙ্গে মুন্নার সঙ্গে খেলেছেন ঢাকার মাঠের সর্বকালের সেরা প্লে-মেকার খেতাব পাওয়া রুম্মান বিন ওয়ালি সাব্বির। ঘরোয়া ফুটবলে অবশ্য দুজন খেলতেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল আবাহনী ও মোহামেডানে।