উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। কৃষি বিকাশে নদ-নদীর অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি শিল্প স্থাপনেও এর বিকল্প নেই। বর্তমানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এ সমস্যার অনেকটাই বিকল্প তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ নদ-নদীবহুল হওয়ায় স্বভাবতই বাংলার মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকা আর বাণিজ্যের জন্য জাহাজ। পারস্য উপসাগর, আরব সাগর হয়ে সুমেরীয়, কেলডীয়, আক্কাদীয়, ব্যবিলনীয় ও মিসরীয় সভ্যতার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বাংলার বণিকদের ছিল পণ্য আদান-প্রদান সম্পর্ক। মোগল আমলের কিছু আগে থেকেই ব্যবসাবাণিজ্য উপলক্ষে বাংলার মাটিতে বিদেশি বণিকদের আনাগোনা শুরু হয়। মূলত ওলন্দাজ, ইংরেজ, ফরাসি বণিকরা এ ভূখন্ডে ব্যবসার সূত্রপাত ঘটায়।
রাজশাহী থেকে ১৯৬০-এর দশকে নৌপথে পণ্য যাতায়াত করত ভারতে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রয়েছে এ রুটের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি থানার ময়া নামক এলাকা থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ পর্যন্ত আনা-নেওয়া হতো পণ্য। নৌ-রুটে হারানো বাণিজ্যের সেই সোনালি দিন আবারও ফিরল ৬ দশক পর। সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘ব্যবসায় নতুন দুয়ার খোলার প্রত্যাশা’ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশের রাজশাহীর গোদাগাড়ী পর্যন্ত নৌপথ চালু হয়েছে। এজন্য গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জে নৌবন্দর উদ্বোধন হয়েছে গতকাল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, ব্যবসাবাণিজ্যের মাধ্যমেই দেশকে স্বনির্ভর করতে হবে। তাই এর গুরুত্ব বিবেচনা করে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নিজ দায়িত্বে রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালে ভারতের সঙ্গে প্রথম স্বাক্ষরিত অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল ও বাণিজ্য প্রটোকল অনুযায়ী, নদীপথে বাণিজ্য ও যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। রাজশাহী থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার একটি নৌপথের অনুমোদন থাকলেও পদ্মার নাব্য সংকটের কারণে কার্যকর করা হয়নি। ফলে রুটটি সংক্ষিপ্ত করে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সুলতানগঞ্জ থেকে ভারতের মুর্শিদাবাদের ময়া নৌবন্দর পর্যন্ত আড়াআড়িভাবে ২০ কিলোমিটার পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া হবে। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর চালু হলে এ পথে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সাগরদীঘি থানার ময়া নৌবন্দরের সঙ্গে শুরু হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য।
প্রাথমিক পর্যায়ে এই পথে ভারত থেকে সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল, পাথর, মার্বেল, খনিজ বালু ছাড়াও খাদ্যসামগ্রী আসবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে বস্ত্র, মাছ, পাট ও পাটজাত পণ্য ছাড়াও কৃষিপণ্য ভারতে যাবে। এসব পণ্য মূলত বিভিন্ন স্থলবন্দরের মাধ্যমে সড়ক ও রেলপথে আমদানি করা হয়। তবে সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরের মাধ্যমে এসব পণ্য ভারত থেকে আমদানিতে সময় ও খরচ বহুলাংশে কমে যাবে। এতে উপকৃত হবেন দুই দেশের ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। নদীপথে দুই দেশের মধ্যে কম খরচে বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। রাজশাহীর সুলতানগঞ্জে নৌবন্দরের কার্যক্রম চালু হলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ময়া নৌবন্দরের সঙ্গে নদীপথে বাণিজ্য পুরোদমে শুরু হবে। এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের ব্যবসায়ীরাই উপকৃত হবেন।
ভারত নিজেদের পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য, প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে নৌপথে নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য চালাতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। যেটির আওতায় এ অঞ্চলে পাঁচ হাজার কিলোমিটারের নৌ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা দেশটির। নৌপথে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় নেটওয়ার্কের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের নদীগুলোকেও ব্যবহার করতে চায়। এতে বিশাল এক বাণিজ্যের সম্ভাবনা তৈরি হবে, যার একটি বড় অংশ বাংলাদেশ পাবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও বহির্মুখী করে তোলা জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেওয়া।