লক্ষ্য বিরাট অর্জনে বিভ্রাট

গত ১৪ বছরে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে হয়েছে ৫ গুণ। বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে শতভাগ মানুষ। কিছু বিতর্ক সত্ত্বেও বিদ্যুৎ খাতে নেওয়া সরকারের নানা পদক্ষেপের কারণে সাফল্য এসেছে। টানা চতুর্থ মেয়াদে থাকা ক্ষমতাসীন সরকারের হাত ধরে এই সফলতা এসেছে মূলত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভর করে। কিন্তু পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল তা অর্জন হয়নি।

২০১৬ সালের পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার অন্তত ১০ শতাংশ (২৪৭০ মেগাওয়াট) নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর, বায়ু, জল ইত্যাদি) থেকে উৎপাদন করার কথা ছিল। এরপরও পেরিয়ে গেছে আরও দুই বছর। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ১২ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে হতে হবে।

সরকারের এখনকার পরিকল্পনা হলো, ২০৪১ সাল নাগাদ অন্তত ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করা। ওই সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ধরা হয়েছে ৬০ হাজার মেগাওয়াট; অর্থাৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ১ হাজার মেগাওয়াটও অর্জন হয়নি। নির্মাণাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতিও হতাশাজনক।

বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবের পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়েই মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার খুব একটা হয়নি। আর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রবল সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশে

অকৃষি জমির স্বল্পতা, প্রযুক্তিগত নানা সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাবেই এমন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রমতে, ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ ২৩০ মেগাওয়াট। সে হিসাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৮১ মেগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস সৌরশক্তি থেকে মাত্র ৪৫৯ মেগাওয়াট এবং জলবিদ্যুৎ (২০০৯-এর আগে স্থাপিত) ২৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন হচ্ছে। এর বাইরে অফগ্রিড সৌরবিদ্যুতের পরিমাণ প্রায় ৪৫০ মেগাওয়াট। যদিও অফগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ৭০-৮০ শতাংশ অকেজো হয়ে রয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, সরকার কার্বন দূষণ প্রতিরোধে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এ জন্য ইতিমধ্যে ১০টি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের নির্দেশনা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য উৎস থেকে প্রায় ১২ হাজার ৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যক্রম বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বাস্তবসম্মত বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রচলিত জ্বালানির সঙ্গে সঙ্গে হাইড্রোজেন, অ্যামোনিয়াকেও জ্বালানি হিসেবে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ কাজ করছে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে অকৃষি জমির প্রাপ্যতা অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনশোর ও অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ নিয়েও আমরা এগোচ্ছি।’

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল নাগাদ আরও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মাত্র ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।

বর্তমানে নির্মাণাধীন জীবাশ্ম জ্বালানির ১৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৯ হাজার ৮৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ১৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ চলছে। এগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র ৬৪৫ মেগাওয়াট। এসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজের যে অগ্রগতি তাতে বেশিরভাগই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে আসতে পারবে না। এর বাইরে চুক্তি স্বাক্ষর প্রক্রিয়াধীন ২৩টি প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ হাজার ৪০৪ মেগাওয়াট।

গত ১৪ বছরে দেশে জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থেকে মোট ৩১ হাজার ৩২ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১৬১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি সই হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। যার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২১ হাজার ৩০৪ মেগাওয়াট। চালু হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বেশিরভাগই জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক (গ্যাস, ফার্নেস অয়েল, ডিজেল ও কয়লা)।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৯ সাল থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ২৯ হাজার ৯২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি সই করা হয়। এর মধ্যে ১২৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। যার মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার ৮৪৫ মেগাওয়াট। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক ১ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি সই হয়। এর মধ্যে মাত্র ১০টি কেন্দ্র চালু হয়েছে। যেগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা মাত্র ৪৫৯ মেগাওয়াট।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও সরকার সেদিকে যাচ্ছে না। বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে। সরকার বিদেশি দাতাদের স্বার্থ দেখতে গিয়েই নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্থবিরতা তৈরি করেছে।’ তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ অনেক আগেই নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এগিয়ে যেতে পারত। যে সীমাবদ্ধতা দেখানো হয়, তা অনেকটাই কৃত্রিম।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যতটুকু উৎপাদন, ততটুকু বিল এ শর্তে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর চুক্তি হওয়ায় শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই তারা বিল পাবে। কিন্তু তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ হিসেবে অর্থ পরিশোধ করতে হয় সরকারকে। বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ১৪ বছরে ৩ লাখ ২২ হাজার ২৫১ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে সরকারের। এর মধ্যে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ গুনতে হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকারও ওপরে। গত বছরের জুলাইয়ে বিদ্যুৎ খাতের প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এক গবেষণায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জকে একটি ‘লুটেরা মডেল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

সৌরবিদ্যুতে কোনো জ্বালানি লাগে না; অর্থাৎ জ্বালানি আমদানির জন্য ডলার প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের দাম ক্রমে বাড়ছে। ১৪ বছরে দেশে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে চার গুণের বেশি। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ব্যয় কমে অর্ধেকের নিচে নামলেও এ খাতের অগ্রগতি খুবই হতাশাজনক।

জীবাশ্ম জ্বালানি ক্রমেই শেষ হয়ে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিচ্ছে বিভিন্ন দেশ। বর্তমানে চীন বিশে^ সর্বোচ্চ ৩ লাখ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন করছে অন্তত ১ লাখ মেগাওয়াট। সর্বোচ্চ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় আরও আছে যথাক্রমে জাপান, জার্মানি, ভারত, ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া। অন্যদিকে, বায়ুবিদ্যুতে চীন ও ভারতের পাশাপাশি নরওয়ে, ফিনল্যান্ডসহ অনেক ইউরোপীয় দেশও এগিয়ে আছে। বাংলাদেশে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এর বাস্তবায়ন তেমন একটা হয়নি।

পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মোহাম্মদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্বের অনেক দেশই বিশাল মরুভূমি ও বিস্তীর্ণ অকৃষিজমি থাকার সুবিধা নিয়ে বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করছে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে অকৃষি জমি খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। তার পরও আমরা সৌরবিদ্যুতে অনেক এগিয়েছি।’

বাংলাদেশে জমির সংকটের যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে তা একধরনের অজুহাত বলে মনে করছেন এ খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞ। কারণ ভিয়েতনাম মাত্র দুই বছরে ১৬ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে দেখিয়েছে। এর একটি বড় অংশ স্থাপন করা হয়েছে সেখানকার ছাদ ব্যবহার করে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম বাংলাদেশ। আর সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের জন্য স্থাপিত প্রতিষ্ঠান স্রেডার এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শুধু ঢাকা শহরের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে এবং সবুজ জ্বালানির সঠিক ব্যবহার করা হলে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে।