গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর বগুড়ার শিবগঞ্জে ১৭ বছর বয়সী মারুফাকে প্রথমে ধর্ষণ করে একই গ্রামের যুবক সাইফুর। এক পর্যায়ে মেয়েটি অজ্ঞান হয়ে পড়লে চটের বস্তা ও কাপড় দিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যায় সাইফুর। এরপর মারুফাকে উদ্ধার করে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, অবস্থার অবনতি হলে একইদিন রাতে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন চিকিৎসকরা।
মেয়েটির ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর একটা অংশ কেটে ফেলতে হয়েছিলো, সবমিলিয়ে ৩টি অস্ত্রোপচার ও ৪২ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৮ই অক্টোবর হার মানে মেয়েটি। সেদিন তার শরীরে চামড়া প্রতিস্থাপন করতে ৪র্থ অস্ত্রোপচারের পর আর জ্ঞান ফেরেনি, চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে মারা যায় মেয়েটি।
১৯ অক্টোবর গ্রামের বাড়িতে মারুফাকে দাফন করেন এবং একইদিন সন্ধ্যায় সবকিছু নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান তার অসহায় বাবা-মা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মেয়েটির বাবা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি পড়াশোনা জানি না, বুদ্ধিশুদ্ধিও কম। বড় মেয়েটিকে নিয়ে হাসপাতালে কাটানো প্রতিটা দিন আমার কেটেছিলো তাকে ফিরে পাওয়ার প্রার্থনায়। আমার নিজ ঘরে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এখন ছোট মেয়েকে নিয়ে সেই বাড়িতে কীভাবে থাকি। ভয় আর আতঙ্ক থেকেই শ্বশুর বাড়ি থাকছি। আমার মেয়ের অপরাধীদের বিচার না হলে আমি নিজ বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছি না।
এ সময় তিনি হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, আমার চাচাতো ভাই কামরুজ্জামান পরিকল্পনা করে সাইফুরকে নিয়ে আসে এবং আমার মেয়ের সর্বনাশ করায়। ঘটনার দিন ছিলো শুক্রবার, আর সময়টা জুম্মার নামাজের। সেদিন আমি ও আমার স্ত্রী বাড়িতে ছিলাম না। আমার বৃদ্ধ মা পাশের ঘরে নামাজ পড়তেছিলেন। বাড়ির সব পুরুষরা মসজিদে ছিলেন। বাড়িতে কেবল কামরুজ্জামান ছিল, এ সুযোগে সে সাইফুলকে নিয়ে আসে এবং আমার ঘরে পাঠায়।
জানা যায়, সাইফুর পালিয়ে যাওয়ার পর আগুনের আঁচে মেয়েটির জ্ঞান ফিরলে সে আগুন শরীরে নিয়ে দৌড়ে কামরুজ্জামানের বাড়িতে যায়। এ সময় কামরুজ্জামান তার ঘরেই ছিলেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেয়েটির বাবা মাসুদুর রহমানের দুই চাচার পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এক চাচার ছেলে রঞ্জু ও নাইমের সঙ্গে আরেক চাচাতো ভাই কামরুজ্জামানের বিরোধ চলছিলো। ঘটনার পর মাসুদুর রহমান সাইফুল, রঞ্জু ও নাইমকে আসামি করে মামলা করেন।
মেয়েটির বাবা মাসুদুর রহমান অভিযোগ করেন, যেহেতু আমার মেয়ে আগুন শরীরে নিয়ে প্রথমে আমার চাচাতো ভাই কামরুজ্জামানের ঘরে গিয়ে ওঠে। এরপর কামরুজ্জামান আমাকে যা করতে বলেন তাই করি। কামরুজ্জামান শিক্ষিত হওয়ায় আমাকে মামলার বিষয়ে বুদ্ধি দেন। তার পরামর্শেই আমি রঞ্জু ও নাইমের নামে মামলা করি। কিন্তু দিনে দিনে কামরুজ্জামানের আচার আচরণ সন্দেহ জনক হয়ে ওঠে। একদিন তার সঙ্গে ঝামেলা হলে, আমাকে উল্টো ভয় দেখায়, বড় মেয়েটাকে হারাইছিস, ছোটটাকে হারাতে না চাইলে চুপ করে থাক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কামরুজ্জামান বলেন, ঘটনার দিন আমার বাড়িতে অনুষ্ঠান চলছিল, তাই নামাজে যাওয়া হয়নি। আমার চাচাতো ভাই আসামিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এখন উল্টো আমাকে ফাঁসাতে চেষ্টা করছে। অথচ মামলা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই আমিই তাকে সহযোগিতা করেছি।
শিবগঞ্জ থানা পুলিশের পরিদর্শক জিল্লুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি সাইফুর ঘটনাটি একাই ঘটিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। মেয়েটির ডিএনএ প্রতিবেদন এখনও হাতে আসে নাই, তাই আমরা চার্জশিট দিতে পারছি না।