গণতন্ত্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বরাবরই তিক্ত। দেশটি স্বাধীন হওয়ার তেইশ বছরের মধ্যে সেখানে সাধারণ নির্বাচন হয়নি। অথচ একই সঙ্গে স্বাধীন হওয়ার পর ভারত প্রথম লোকসভার জন্য ২৫ অক্টোবর ১৯৫১ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালের মধ্যে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করে। পাকিস্তান পঞ্চাশের দশক শেষ হওয়ার আগেই নির্বাচনের পথে হাঁটতে চেয়েছিল। কিন্তু একজন জেনারেলের নেতৃত্বে প্রথম সংঘটিত অভ্যুত্থানের কারণে সেই পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। আইয়ুব খান নামের সেই জেনারেল পাকিস্তানের আবহাওয়াকে গণতন্ত্রের জন্য অনুপযুক্ত বলে মনে করতেন। আইয়ুব খান ক্ষমতাচ্যুত না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানকে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও জুলফিকার আলী ভুট্টোর যোগসাজশে সামরিক শাসকরা ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ম্যাকিয়াভেলিয়ান কায়দায় ছলচাতুরী করে হলেও, ভুট্টো প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। যদিও তিনি উচ্চ প্রত্যাশার খুব সামান্যই পূরণ করতে পেরেছিলেন।
পাকিস্তানে সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনকে জনগণের রায়সূচক নির্বাচন হিসেবে নেওয়া প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। দেখা যাচ্ছে, ২০১৮ সালে যে ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান ইমরান খানকে গদিতে বসতে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠান এখন সাইফার মামলা, তোষাখানা মামলা এবং ইদ্দত মামলা দিয়ে তাকে শুধু শায়েস্তা করতেই চাচ্ছে না, বরং তার দলকে পুরোপুরি ধ্বংস করার এবং দলটির যাবতীয় নির্বাচনী সম্ভাবনাকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখানেই শেষ নয়। সেই পর্দার আড়ালের শক্তি একসময় যে ব্যক্তির রাজনৈতিক পদে থাকার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তাকেই এখন চতুর্থ মেয়াদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বানানোর নিশ্চয়তা দিচ্ছে। নওয়াজ শরিফের আরেক দফা পতনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে এ বিষয়টি তিনি নিজে বুঝতে পারছেন কি না তা যে কাউকে ভাবাতে পারে।
১৯৭৭ সালের নির্বাচন ভুট্টোর ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করেছিল। সরকার ও বিরোধী দলের বাদানুবাদের মুখে সামরিক বাহিনী পরিস্থিতি সামলাতে হস্তক্ষেপ করে এবং বিতর্কিত নির্বাচনের পুনরায় নির্বাচন দিতে চেয়েছিল। জাতির সামনে তখন সবচেয়ে অন্ধকার সময় ঘনিয়ে আসছিল। এরপর কালো মেঘ জাতিকে ছেয়ে ফেলল। ১৯৮৮ সালে বিমান দুর্ঘটনায় জেনারেল জিয়াউল হক মারা না যাওয়া পর্যন্ত সেই কালো মেঘ কাটেনি। আসলে সেই কালো মেঘের ছায়া কখনোই পাকিস্তানের মাথা থেকে সরেনি। এবং সরবে বলেও মনে হচ্ছে না।
যাই হোক, চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি হয়ে গেল পাকিস্তানের ১৬তম জাতীয় নির্বাচন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আর দমন-পীড়নের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এই নির্বাচন। আশা ছিল, এই ভোটের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে সামনের দিকে যেতে পারবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। ভোট জালিয়াতি এবং অনিয়মের অভিযোগের মধ্যে দুটি নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক দল নিজেদের জয়ী বলে দাবি করছে।
ভোটের ফলাফল যা দাঁড়িয়েছে, তাতে কোনো দলই নিজের মতো করে সরকার গঠন করার মতো অবস্থায় নেই। ২৬৫ আসনের পার্লামেন্টে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। পিটিআই সরকার গঠনের জন্য এখনো পর্যাপ্তসংখ্যক আসন পায়নি। তাই ফেডারেল পর্যায়ে একটি জোট সরকার গঠন অনিবার্য হয়ে পড়েছে। কারাগারে আটক অবস্থায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পিটিআই জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। আদালতে দলীয় প্রতীক বাতিল হওয়ায় তার দলের প্রার্থীরাও লড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে। তার দলের প্রায় ৯৩ জন প্রার্থী ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
নওয়াজ শরিফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ বা পিএলএম-এন ৭৮টি আসন পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরও কিছু স্বতন্ত্র এমপিকে নিয়ে তারা শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে পিএমএল-এনের প্রতি শক্তিধর সেনাবাহিনীর সমর্থন রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে দলটি সেনাবাহিনীর প্রত্যাশামতো নির্বাচনে ফল পায়নি। পাকিস্তান পিপলস পার্টি বা পিপিপি ৫৪টি আসন পেয়ে তৃতীয় হয়েছে। এ দলটি এমন অবস্থানে রয়েছে, যে কি না আরেকটি দলের সরকার গঠনে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারবে।
পিএমএল-এনের নেতৃত্বে অন্য দলগুলোর মধ্যে একটা জোট হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। কিন্তু পিটিআই ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে, তারা নিজেরাই সরকার গঠন করতে চায় এবং তারা বিশ্বাস করে, তাদের ভোট চুরি করা হয়েছে। দলটি ইতিমধ্যেই নির্বাচনের ফলকে চ্যালেঞ্জ করেছে। তারা দাবি করেছে, কমপক্ষে ১৮টি আসনে কারচুপি হয়েছে এবং তাদের ফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে। তারা এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পাকিস্তান এখন একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির ভেতরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পরবর্তী সরকারে যে বা যারাই থাকুন না কেন, পুরো বিষয়ে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলেই মনে হয়। পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান তো বটেই, এমনকি সরকারের গঠন কিংবা পতনের মতো বিষয়গুলোতেও অতীতে দেশটির সামরিক বাহিনীর ভূমিকা দেখা গেছে। কিন্তু দেশটির রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর এমন শক্তিশালী হয়ে ওঠার কারণ কী? আর নির্বাচনের বাইরে থাকা ইমরান খানের ভবিষ্যৎই বা এখন কোন দিকে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। এটার উত্তর লুকিয়ে আছে দেশটির ইতিহাসে।
আরও পরিষ্কার করে বললে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পরবর্তী কয়েক বছরে। এখানে কয়েকটি ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক বছরের মাথায় দেশটির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু। তার মৃত্যুর তিন বছরের মাথায় দেশটির আরেক শীর্ষ নেতা এবং তখনকার প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের গুলিতে নিহত হওয়া। এই দুই মৃত্যু পাকিস্তানের রাজনীতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি করেছিল। এই একই সময়ে কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ দেশটিতে নিরাপত্তা সংকটও তৈরি করে। দেশটির সেনাবাহিনী নিরাপত্তা এবং বিদেশনীতিতে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। কারণ, তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের গৃহীত পদক্ষেপে সন্তুষ্ট ছিল না। অন্যদিকে, দেশটির রাজনৈতিক নেতারা এমনকি জিন্নাহ নিজেও শুরু থেকেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে না নিয়ে এক ধরনের কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। যেটা পরে দেশে অনৈক্য তৈরি করে। এসব কিছু মিলেই পাকিস্তানে এমন একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, যেটা দেশটির সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
পাকিস্তানে রাষ্ট্রকাঠামোয় সেনাশক্তি প্রথম আসে ১৯৫৪ সালে। তখন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বানানো হয়েছিল, সেনাপ্রধান আইয়ুব খানকে। এই আইয়ুব খানই ১৯৫৮ সালে দেশটির ক্ষমতা দখল করে নেন। আইয়ুব খানের পর পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছে আরও দুটি। সব মিলিয়ে দেশটির প্রায় ৭৭ বছরের ইতিহাসে সামরিক শাসন চলেছে ৩৩ বছরেরও বেশি। পাকিস্তানে সরাসরি এই সেনাশাসন দেশটির সব ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর প্রভাববলয় তৈরি করে দিয়েছে।
কিন্তু এটাও সত্য, নিকট অতীতে, বিশেষত: ২০০৭ সালের পারভেজ মোশাররফের বিদায়ের পর গত ১৬ বছরে দেশটিতে আর কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হয়নি। দেশটির ইতিহাসে সেনা অভ্যুত্থান ছাড়া একটানা দীর্ঘ বেসামরিক শাসন এটাই। কিন্তু এরপরও দেশটিতে সেনাবাহিনীর প্রভাব কমেনি। কারণ বন্দুকের শক্তি ছাড়াও সেনাবাহিনীর দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। আর আছে জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা। বিশ্লেষকদের মতে, ‘পাকিস্তানে একটা ন্যারেটিভ আছে যে, আর্মি ছাড়া পাকিস্তানের অস্তিত্ব থাকবে না। কারণ দেশটিতে বহু জাতি, বহু বিভক্তি এবং নিরাপত্তার বহু সংকট আছে। ফলে সেখানে আর্মি পাকিস্তানকে টিকিয়ে রেখেছে।’ আর্মি বাণিজ্যিকভাবেও শক্তিশালী এবং জনগণের মধ্যেও তার জনপ্রিয়তা আছে। তার চেয়ে বড় কথা রাজনৈতিক দলগুলোই সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করার অজুহাত তৈরি করে দিচ্ছে।
গত ১৬ বছর দেশ চালিয়েছে মূলত বেসামরিক প্রশাসন। কিন্তু দেশটিতে অস্থিরতা আগের মতোই চলতে থাকে। অতীতের মতো এ সময়েও কোনো প্রধানমন্ত্রী তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। নওয়াজ শরিফ রাজনীতিতে ফিরে ক্ষমতায় এলেও আবারও তাকে বিদায় নিতে হয়। একইভাবে ইমরান খান ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসীন হলেও মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। পাকিস্তানে এমনসব ঘটনার পেছনে সামরিক বাহিনীই কলকাঠি নেড়েছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু ১৬ বছরের বেসামরিক শাসন সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক দলগুলো সেনানিয়ন্ত্রণ থেকে কেন বের হতে পারছে না?
সামরিক বাহিনী আগে রাজনীতিতে যেভাবে হস্তক্ষেপ করত, সেটাতে এখন তারা পরিবর্তন এনেছে। এখন তারা প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করে। এটাকে বলা যায় সামরিক আইন ছাড়াই সামরিক শাসন। পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্টই মূলত রাজনীতিতে নানা অস্থিরতা তৈরি করে রেখেছে। তারা এক দলকে অন্য দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পেরেছে। এ ছাড়া প্রতি দশ থেকে পনেরো বছর পরপর নতুন কোনো নেতাকে তারা সামনে নিয়ে আসছে। ওখানে রাজনৈতিক নেতারাও শর্টকাটে ক্ষমতায় যেতে আগ্রহী। এজন্য তারা সামরিক শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এভাবেই সামরিক বাহিনী এখানে শক্তির ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হওয়ায় এই ভরকেন্দ্রের বাইরে যেতে পারছে না।
এদিকে এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে সশস্ত্র বাহিনী। তবে বারবার ইন্টারনেট-ব্যবস্থা কেন কাজ করছে না, সে বিষয়ে কোনো তরফে কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সিকান্দার সুলতান রাজা এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় স্ববিরোধী নানা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মানুষ অবশ্য ভাবছেন, এসবই ঘটছে সেনাবাহিনীর ইঙ্গিতে, যারা মুসলিম লিগ নেতা নওয়াজ শরিফকে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছিল বলে নির্বাচনের আগে ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এখন সেটা দুরূহ হয়ে গেল। আপাতত যা স্পষ্ট, তা হলো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নেতা হিসেবে ইমরান খানকেই পছন্দ করছেন। আন্তর্জাতিকভাবে এটা আমেরিকার জন্য কিছুটা বিব্রতকর হয়েছে। ইমরানের পদচ্যুতি ও বন্দিত্বের ঘটনাবলিতে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে তারা গত কয়েক মাসজুড়ে নীরবে সমর্থন দিয়েছে বলেই মনে হয়েছে। এর ফলে এ রকম একটা সরকারকে টিকে থাকার শর্ত হিসেবে পুরোপুরি সেনা সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে।
লেখকঃ গবেষক ও কলাম লেখক
raihan567@yahoo.com