ভাইরাল কিংবা জনপ্রিয়দের পেছনে ছোটে না জাগৃতি

পেশায় তিনি চিকিৎসক। বইমেলা এলে সবসময় প্রকাশক স্বামী ফয়সল আরেফিন দীপনের জাগৃতির স্টল সামলানোর দায়িত্ব নিতেন হাসিমুখে। নিজের পেশাগত দায়িত্বের বাইরে মেলায় তাকে দেখা যেত হাসিমুখে সামলাচ্ছেন জাগৃতির স্টল। মেলা চলার সময় প্রকাশনা নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাতেন দীপন, স্টলে পরিবেশনার দায়িত্ব নিতেন জলি।

দুজনে মিলেই বইমেলা সামাল দিতেন। ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবরের হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন। তবে জাগৃতির প্রকাশক চলে গেলেও থামেনি জাগৃতি। দীপনের মৃত্যুর পর থেকে জাগৃতিকে নিয়ে একাই লড়াই করে যাচ্ছেন রাজিয়া রহমান জলি।

প্রকাশক হিসেবে যাত্রা শুরুর কথা জানতে চাইলে বলছিলেন, ‘জাগৃতির প্রতিষ্ঠাতা ফয়সল আরেফিন দীপনকে তার নিজ কার্যালয়ে হত্যা করে জঙ্গিবাদীরা। এরপর পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি ওনার জীবনসঙ্গিনী হিসেবে জাগৃতির হাল ধরি। আমার ব্যক্তিগত প্রতিবাদের জায়গা থেকে চিন্তা করেছি এই প্রতিষ্ঠান বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।’ 

প্রকাশক হিসেবে জাগৃতির অর্জনের কথা জানতে চাইলে জলি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দীপন হত্যাকান্ড খুব গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। ২০১৬ সালে International Publishers Association (IPA) থেকে Freedom of speech  সেক্টরে Prix Voltaire Award-টি প্রদান করা হয় দীপনকে (মরণোত্তর)। এমন ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার

স্বীকৃতি স্বরূপ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে American Publishers Association  জাগৃতিকে সম্মানজনক Jerry Labber’s Award-এ ভূষিত করে। এর বাইরে প্রকাশনা হিসেবে আমাদের বড় অর্জন হচ্ছে বাংলা সাহিত্যে মিথোলজিকে জনপ্রিয় করা। ২০১৭ সাল থেকে আমরা মিথোলজির দারুণ সব সংগ্রহ মলাটবন্দি করছি।

আমাদের  ‘আদি থেকে অন্ত’ সিরিজে এ পর্যন্ত গ্রিক, মিসর, ওলমেক, মায়া ও অ্যাজটেক মিথোলজি প্রকাশিত হয়েছে। এই বছর এসেছে নরওয়েজিয়ান মিথোলজির এনসাইক্লোপিডিয়া।

মিথোলজি নিয়ে এবার আমরা একটা ফিকশন সংকলনও প্রকাশ করেছি যেটাতে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের মোট ২৬ জন লেখকের লেখা স্থান পেয়েছে। এসব জনপ্রিয় হওয়ার পর অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোও ইদানীং মিথোলজির বই করতে সচেষ্ট হচ্ছে।’ 

কেমন বই প্রকাশ করতে চান প্রশ্নের জবাবে জলি বলেন, ‘মানসম্মত পান্ডুলিপি আমাদের প্রধান বিবেচ্য বিষয়। বিষয় বৈচিত্র্যের ব্যাপারেও আমরা খুব সিলেকটিভ থাকার চেষ্টা করি।’ তিনি আরও জানান এবারের মেলাতে জাগৃতি ৪০টি নতুন বই এনেছে।

বইয়ের প্রচারণা প্রসঙ্গে জলি বলেন, ‘প্রচারণার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ আমরা নিই না। ফেসবুকে লেখকরা নিজ নিজ বইয়ের প্রচার করেন। প্রতিষ্ঠানের পেইজেও রিভিউ দেওয়া হয়।

সৃজনশীল বইয়ের প্রকাশক হিসেবে আমি সৃজনশীল থাকারই চেষ্টা করি। ভাইরাল হওয়া কিংবা জনপ্রিয় সেলিব্রিটিদের পেছনে ছুটি না। নিজের কাজটুকু দায়িত্বের সঙ্গে পালন করতে চেষ্টা করি। মানসম্মত বই নির্মাণ করাই আমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এতে সমস্যা হচ্ছে বাজারে আমাদের বইয়ের কাটতি কম, যার দরুন ব্যবসায় লোকসান বেশি, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালানো দুরূহ কাজ হয়ে পড়ে। আশার বাতিঘর হচ্ছেন পাঠকরাই। সবাই প্রচলিত স্রোতে গা ভাসান না। অনেকেই খুঁজে খুঁজে ভালো বই কেনেন।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘জাগৃতি লেখকের কাছে মানসম্মত পা-ুলিপি প্রত্যাশা করে। লেখার ভাষাগত দিক সুন্দর হলে বই প্রকাশে তাদের আপত্তি থাকে না। গবেষণাধর্মী লেখা, ভ্রমণ, মননশীল রচনা নিঃসংকোচে প্রকাশ করে জাগৃতি।’  বাংলা একাডেমির ভূমিকা নিয়ে প্রকাশকরা সন্তুষ্ট নন বলে জানান জলি। মেলার ব্যবস্থাপনার অরাজকতা ও টয়লেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।