বসন্তে নগরজুড়ে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস 

‘আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধন ছেঁড়া প্রাণ’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের পঙ্কতিগুলোর মতই তরুণরা আজ বাধভাঙ্গা উল্লাসে মেতে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলা, টিএসসি, শাহবাগ, বইমেলা, ধানমন্ডি লেকসহ পুরো রাজধানীতে এমন চিত্র দেখা গেছে। কারণ একটাই আজ ভালোবাসা দিবস ও ঋতুরাজ বসন্ত। এ দিনটিকে ঘিরে প্রকৃতি যেমন নিজস্ব রূপে হাজির হয়, তেমনি নারীরা ভিন্ন রূপে সাজতে পছন্দ করে। এদিন নারীরা সকাল হতেই পরনে বাসন্তী শাড়ি, হাতে কাঁচের চুড়ি, কপালে লাল টিপ ও মাথায় ফুলের মালা নিয়ে বকুলতলায় হাজির হয়। পুরুষরাও কম যান না, তাদের মনেও লাগে বসন্তের রঙ। হলুদ পাঞ্জাবীতে কেউ প্রিয়তমা, কেউ স্ত্রী, কেউবা সন্তানের হাত ধরে বেরিয়ে পড়েন। কেননা বাতাসে যে বসন্তের গন্ধ। অনুপম রায়ের গানের মতে, বাতাসে বহিছে প্রেম/ নয়নে লাগিলো নেশা/ কারা যে ডাকিলো পিছে/ বসন্ত এসে গেছে...। 
 
এদিকে নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের ঋতুভিত্তিক উৎসব ছড়িয়ে দিতে প্রতিবছরই বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষৎ। বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বকুলতলায় সকাল সোয়া সাতটায় শিল্পী জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় সেতারে রাগ বসন্তমুখারী বাদন দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। এরপর ‘এসো মিলি প্রাণের উৎসব’ শিরোনামে সমবেত গান, নৃত্য পরিবেশনা, একক পরিবেশনা, শিশু-কিশোর ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এসব পরিবেশনায় অংশ নেন ভাবনা, ধৃতি, নৃত্যম, বহ্নিশিখা, নৃত্যাক্ষ্য, স্পন্দন, কত্থক নৃত্য সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন নাচের দলের শিল্পীরা। এবারের ১৪৩০ বঙ্গাব্দের বসন্ত উৎসবটি ৩০তম।

সকাল ১০টার বসন্ত-আনন্দ শোভাযাত্রাটি চারুকলা থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ঘুরে আবার চারুকলায় ফিরে আসে। জাঁকজমকপূর্ণ এ আয়োজনে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে শিল্পীরা অংশ নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মারজিয়া আক্তার। এখন পুরোদস্তুর সংসারী। দুই সন্তানকে নিয়ে এসেছেন বকুলতলায় বসন্ত বরণ উৎসবে। নিজে পরেছেন বাসন্তী রঙের শাড়ি। দুই ছেলেকেও বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবিতে সাজিয়ে নিয়ে এসেছেন। জানতে চাইলে মারজিয়া আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইট-পাথরের নগরীতে প্রাকৃতিক আবহের দেখা মিলে কালেভদ্রে। কিন্তু ভিন্নচিত্রের দেখা মিলে গ্রামে। এসময় গ্রামের মেঠোপথে পড়ে থাকে রঙজবা পলাশ ফুল। রাস্তার দু’ধারে ফুটে থাকে নাম না জানা হরেক ফুল। ছোটবেলায় যা নিয়ে আমরা আনন্দ করতাম। কিন্তু শৈশবের সেসব দিন এখন কেবলই স্মৃতি। চাকরি আর সাংসারিক বাস্তবতায় এখন গ্রামে যাওয়া হয় না। সন্তানদের পলাশ-শিমুল দেখানোর সময়ও হয়না। তবে ঋতুরাজ বসন্তের সঙ্গে পরিচয় করাতে চারুকলায় নিয়ে এসেছি। যাতে তারা বাঙালীর প্রাণের উচ্ছ্বাসের সঙ্গে পরিচিত হয়।’

এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিএসসি ও বইমেলায় বাড়তে থাকে তরুণ-তরুণীদের ভিড়। বইমেলায় ঘুরতে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহেল রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একই দিনে বসন্ত উৎসব ও ভালোবাসা দিবস। পাশাপাশি অমর একুশে বইমেলা। সবমিলে বাঙালীর প্রাণের উচ্ছ্বাস এ মাসটিকে ঘিরে। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বন্ধুরা মিলে বইমেলায় এসেছি। ঘুরে দেখেছি চারুকলা, টিএসসটি। চারিদিকে ‘বসন্ত এসে গেছে’ গানটি শুনে ভালই লেগেছে।’