একসময় প্রায় সব এলাকাতেই পাড়া-মহল্লাভিত্তিক হাতেগোনা কিছু তরুণ-যুবক মারামারি, ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে থাকত। তাদের বেশিরভাগ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া। গলির মোড়ে আড্ডা দেওয়া ছিল তাদের স্বভাব। আর পাড়ায় পাড়ায় মারামারি করে বেড়ানো ছিল তাদের কাজ। তাদের পেছনে খুঁটির জোর বলতে যা বোঝায় তা ছিল না। মারামারি শেষে মাথা নিচু করে এলাকার মুরব্বিদের সামনে দাঁড়াতে হতো। মুরব্বিদের বিচার মাথা পেতে নিত। কখনো দুই পাড়ার মারামারি শেষে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হতো। তৎকালীন এই বখে যাওয়া তরুণদের বেশিরভাগই একটা সময়ে মাস্তানি ছেড়ে ফিরে গেছেন পরিবারে। কর্মসংস্থানে নিযুক্ত হয়েছেন। যারা পারেননি তারা হারিয়েছেন মাদক ও সন্ত্রাসের অন্ধকার জগতে।
সময়টা খুব বেশি আগের নয়। ৯০-এর দশক পর্যন্ত আমাদের নগরকেন্দ্রিক তরুণ সমাজের একটি অংশ ছিল ছিল এই ‘বখাটেরা’। আধুনিকতার ছোঁয়া, বিশ্বায়ন, পুঁজির প্রভাব, নগরায়ণের বিস্তৃতি ইত্যাদি নানা কারণে পাড়ার মোড়ের সেই তরুণরা বিদায় নিয়েছে। তাদের স্থানে এসেছে আরও দুর্ধর্ষ তুর্কি। যাদের পরিচয় কিশোর গ্যাং নামে। নগরীর অলিগলি, স্কুল গেট কিংবা সড়ক দাপিয়ে বেড়ানো এই কিশোরদের বয়ন ১৫ থেকে ১৭ বছর। তাদের কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার অনমনীয়, দুর্বিনীত। সকাল, দুপুর কিংবা গভীর রাত, গলিমুখে চিৎকার চেঁচামেচি চলে তাদের। কখনো মোটরসাইকেল নিয়ে দল বেঁধে বের হয়, উচ্চ শব্দে হর্ন বাজিয়ে মাথায় তোলে গোটা মহল্লা। চলাচলের পথ আগলে চলে তাদের অনিয়ন্ত্রিত আড্ডা, এরা কাউকে তোয়াক্কা করতে চায় না। মেয়েরা শিকার হয় বাজে মন্তব্যের। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সমাজে নিজেদের পরিচয় করায় বাহারি নামে। যেমন ইয়াং স্টার, ডিসকো বয়েজ, বিগবস ইত্যাদি। কখনো রাজু গ্রুপ, রকি গ্রুপ, রোমান্টিক গ্রুপ, মুসা-হারুন গ্রুপ, সোহেল গ্রুপ। এরা শুধু আড্ডাবাজি করেই খান্ত থাকে না। তাদের চলার পথে কেউ বাধা দিলে তাকে দিতে হয় চরম মাশুল। কখনো গুলি ছুড়ে, কখনো কুপিয়ে হত্যা করতেও তারা দ্বিধা করে না।
আইনে ওরা শিশু। কারণ ওদের বেশিরভাগেরই বয়স ১৮ এর নিচে। এতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও পড়তে হয় বিপদে। বড় অপরাধে তাদের আটক করলেও সাজার আওতায় আনা যায় না। নিতে হয় সংশোধন কেন্দ্রে। জামিন নিয়ে খুব সহজেই তারা ফিরে আসে পুরনো সঙ্গীদের কাছে। সেখান থেকে বেরিয়ে সংশোধন তো দূরের কথা তারা যেন হিরো বনে যায়। বেড়ে যায় তাদের দুর্বৃত্তায়নের মেজাজ।
এই কিশোর গ্যাংয়ের ত্রাস সৃষ্টিকারী চলাচল, ইভটিজিং, ছিনতাই থেকে শুরু করে খুন, ধর্ষণের মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। এই কিশোর গ্যাং আসলে কারা? কী তাদের পরিচয়? পরিবারের কাছেও তারা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাদের এসব কর্মকান্ডের দায় পরিবার ও সমাজ যেমন এড়াতে পারে না, তেমনি তাদের জন্য পরিবারকেও পড়তে হয় লজ্জায়। অপরাধ জগতে তাদের শক্তির উৎসই বা কী? কারা তাদের মদদদাতা? এমন অসংখ্য প্রশ্ন সামনে চলে আসে।
সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় এক হত্যাকা-ের ঘটনায় আবার আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার কাজী ফজলুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান ছিল। বিদ্যালয়ের ফটকের সামনে কয়েকজন মেয়েকে উত্ত্যক্ত করছিল মাগডাল গ্রামের তরুণ আরেফিনসহ আরও কয়েকজন। বিষয়টি দেখে নীরব, কাজী ওহিদুলসহ তিনজন প্রতিবাদ করে। তখন দুপক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। স্থানীয় লোকজন তাদের ঝগড়া থামিয়ে যার যার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। পরদিন বিকেলে কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে বসেছিল নীরব ও ওহিদুল। এ সময় আরেফিনসহ ১০-১২ জন তাদের ওপর হামলা করে। ওহিদুল পালাতে পারলেও নীরব পালাতে পারেননি। হামলাকারীরা নীরবকে ছুরিকাঘাত করে পাশের একটি খালে ফেলে দেয়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। এ ঘটনায় পুলিশ ৯ কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে তিনজনের বয়স ১৪, একজনের ১৬ ও পাঁচজনের বয়স ১৭ বছর। এর আগে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গত ফেব্রুয়ারিতে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্বের জেরে জামাল হোসেন (১৮) নামের একজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহত জামাল জুনিয়র গ্রুপের। ঢাকার উত্তরায় ২০১৭ সালে দুই কিশোর গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে খুন হয়েছিল স্কুলছাত্র আদনান কবির। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনানকে উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ১৭ নম্বর সড়কের খেলার মাঠে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত বছর ২২ মে রাজধানীর দারুস সালাম থানার লালকুঠি এলাকায় খুন হয় স্কুলছাত্র সিয়াম খান। এর আগে জুনিয়ার সিনিয়র দ্বন্দ্বে খুন হয় তাজুল ইসলাম। এমন অসংখ্যা ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।
ডিএমপি বলছে, ২০২৩ সালে রাজধানীতে যত খুন হয়েছে তার ২৫টি কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট। রাজধানীতে সক্রিয় ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ তালিকা করছে পুলিশ। এখন পর্যন্ত এই তালিকায় ৫২টি চক্রের নাম এসেছে। ডিএমপির আটটি অপরাধ বিভাগের অধীন ৩৩ থানা এলাকায় এসব চক্রের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৬৮২। একটি দৈনিক পত্রিকার সূত্র মতে, সারা দেশের ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ে ২০২২ সালের শেষ দিকে পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল। এতে বলা হয়েছে, সারা দেশে অন্তত ১৭৩টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। বিভিন্ন অপরাধে এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে ৭৮০টি। এসব মামলায় আসামি প্রায় ৯০০ জন। চট্টগ্রাম শহরে আছে ৫৭টি। মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে রয়েছে ২৪টি গ্যাং। বেশির ভাগ বাহিনীর সদস্য ১০ থেকে ৫০ জন।
গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ‘কিশোর গ্যাং’ ও তাদের প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মুজিবুল হক। তিনি বলেন, এসব বাহিনীর যারা চাঁদাবাজি, লুটপাট করছে, মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, তারা পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের এবং কমিশনারদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব করছে। সারা দেশের মানুষ বিশেষ করে ঢাকা শহরের মানুষকে শান্তিতে বসবাস করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এদের বিরুদ্ধে একটা ‘ড্রাস্টিক অ্যাকশন’ নেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য তিনি পরিকল্পনা করে এদের ধরপাকড় করে আইনের আওতায় আনতে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
গত বছর র্যাবের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, কিশোর গ্যাং অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে বাবা-মা, শিক্ষক ও জনপ্রতিনিধিদেরও দায়িত্ব আছে। তিনি যথার্থই বলেছেন। আমাদের সমাজের একজন সন্তান বয়স ১৮ পেরুবার আগেই যখন অপরাধ জগতে চলে যায়, তখন সেটা শুধু পরিবার না, গোটা সমাজের দুর্ভাবনার কারণই বটে। এই কিশোররা এই জগতে যায় কীভাবে? অপরাধ প্রবণতার ধরন ও ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায় এদের শক্ত ব্যাকআপ থাকে। যেটা তাদের অপরাধ করতে সাহস জোগায়। দেখা যায়, কিশোর বয়সের এসব ছেলেদের বেশিরভাগই পাড়া-মহল্লার মোড়ে দেখতে পাওয়া যায়। অথচ তাদের সে সময় থাকার কথা স্কুলে বা কলেজে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলের দেয়ালের বাইরে সিগারেট থেকে মাদকের চক্রে জড়িয়ে যায় তারা। এসব চক্র ও সঙ্ঘের কোনো না কোনো সূত্র থাকে রাজনৈতিক পরিচয়ে থাকা ব্যক্তির। রাজনৈতিক নেতারা তাদের মদদ দেয় এবং অপরাধে সংশ্লিষ্ট করে তোলে। কিশোরদের অপরাধে সংশ্লিষ্ট করার ফায়দা আছে, একে তো তাদের উদ্দীপনা বেশি তারা যেকোনো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যদিকে আইনে তারা শিশু। ফলে কোনো অপরাধ, মাদককাণ্ডে জড়িয়ে পড়লেও আইনের ফাঁক দিয়ে তারা সহজেই বেরিয়ে আসে।
পুলিশের একটি প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অন্তত ২১ জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ‘গ্যাং’ প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ এসেছে। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক কারণে অনেক এলাকায় কিশোর অপরাধীদের তৎপরতা থাকে। সেটা নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে বেগ পেতে হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীর চর থেকে মিলন হোসেন (২৭) নামের যুবকের ৯ টুকরা লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হন জেলা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহ-সভাপতি এস কে সজীব। পুলিশ বলছে, তিনি একটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতা। ফলে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার সূত্রটি প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়। নেতারা এসব কিশোরকে দিয়ে মিটিং-মিছিল ছাড়াও চাঁদাবাজির কাজ করিয়ে থাকেন।
রাজনৈতিক নেতাদের মদদে থাকে বলে অসচ্ছল পরিবার থেকে আসা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সমাজে হিরোইজম দেখাতে পারে। কেউ কেউ তাদের এই হিরোইজমকে কাজে লাগায়। এতে তারা আরও উৎসাহিত হয়। মূলত হিরোইজম, ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণ, পারিবারিক বন্ধনে শিথিলতা ও প্রযুক্তির অপব্যবহার কিশোরদের অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া বিদেশি টেলিভিশনে অপরাধ সংক্রান্ত প্রতিবেদনমূলক অনুষ্ঠান অপরাধের কৌশলকে ফুটিয়ে তোলা হয়। যা কিশোররা রপ্ত করে।
কিশোর গ্যাং আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের ফসল। এর দায় শুধু কিশোরদের না, এর দায় পরিবার, সমাজ, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। সমাজ তাকে মুক্ত স্থান দিতে পারেনি খেলাধুলার। পরিবার সহযোগিতা করেনি সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার। রাজনৈতিক নেতারা নিজের ফায়দায় কিশোরদের ব্যবহার করছে। আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শুধু হিসাব করছেন কতটি গ্যাং আছে, এদের সদস্য কত, কতজনকে গ্রেপ্তার করা গেল। ১৮৯০ এর দশক ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে তরুণদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল। তখন তাদের জন্য ফুটবল খেলার মাঠ করে দেওয়া হলো। পরবর্তী সময়ে ওই মাঠে খেলাধুলা করতে যেতে শুরু করল তরুণরা। মাস্তানির বদলে তারা একসময় মেতে উঠল ফুটবল উন্মাদনায়। ওই সময়ই প্রতিষ্ঠিত হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও ম্যানচেস্টার সিটি ক্লাব। আজ বিশ্বে ক্লাব দুটি দাপট দেখাচ্ছে।
লেখক: সাংবাদিক
zakpol74@gmail.com