জুতসই শব্দ পাওয়ার তৃপ্তি দশ পুত্র সন্তানের আনন্দের সমান!

প্রাচীন যুগে ভারতীয় পণ্ডিতরা নাকি লেখায় একটা জুতসই শব্দ পেলে যে তৃপ্তি পেতেন, তা দশবার পুত্রসন্তান হওয়ার আনন্দের সমান। এ আলাপের আদৌ কোনো ভিত্তি আছে কি না, নিশ্চিত না হলেও, আমাদের এ যুগে আমরা যখন লাখো লাখো শব্দ প্রতিদিন বলছি, পড়ছি, লিখছি তখন এ গল্পটা বিস্ময় জাগাতে পারে।

জনসংখ্যা বিস্ফোরণের এ যুগে দশপুত্রের জনক হওয়া তৃপ্তিদায়কের বদলে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মতো মনে হলেও প্রাচীন গল্পটার সঙ্গে আমরা একমত হতেই পারি। কারণ, আমরা যারা লেখালেখি করি, তারা জীবনে বহুবার টের পেয়েছি একটা জুতসই শব্দ ব্যবহার করতে পারার আনন্দ কী তীব্র! ভদ্রমহোদয়দের অনুমতি নিয়েই বলি, লেখায় জুতসই শব্দ, অনুভূতিকে কথায় প্রকাশ করতে পারার আনন্দ রাগমোচনের মতো। মানুষের অনুভূতি যতটা তীব্র, এর বিবর্তন যতটা পুরনো, ভাষা ততটা পুরনো না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে, ভাষাই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। কল্পনা আর অনুভূতিকে অক্ষরের অসীম বিন্যাসে সাজাতে পারার সক্ষমতা অকিঞ্চিৎকর প্রাণীটিকে দিয়েছে দুনিয়া তছনছ করে ফেলার শক্তি। ফলে ভাষার বিকাশ এবং মানুষের সভ্যতার বিকাশ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। শুরুতে সঠিক শব্দ খুঁজে বেড়ানোর যে আলাপ তা এ কারণে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বোঝাপড়া, দুনিয়ার নানা বিষয়ের সঙ্গে তার যোগসাজশেই শব্দের জন্ম হয় আর এর চর্চা একে শানিত করে। নানা এলাকার মানুষ যেমন বৈচিত্র্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যর অধিকারী হয়, ভাষাও সেভাবেই গড়ে ওঠে।

যেমন বলা হয়, এস্কিমোরা নাকি নানা ধরনের বরফ ব্যবহারে অন্তত ৪০ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেন। বরফের গড়ন, রঙ, ধারণক্ষমতাসহ নানা বৈশিষ্ট্যে এ ভাগ হয়। আমরা যারা জীবনে বরফই দেখিনি, তাদের কাছে এ ব্যাপারটা কল্পনা করাও কঠিন। অন্যদিকে, এস্কিমোরা এত এত শব্দ ব্যবহার করলেও শুধু ‘বরফ’ বলার জন্য কোনো আলাদা শব্দ ব্যবহার করে না। কারণ বরফ তাদের জীবনের এতটাই অবিচ্ছেদ্য অংশ যে, সে আলাদা করে এর নাম না দিয়ে এর নানা বৈচিত্র্যকে নাম দিয়ে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছে। এ শুধু লেখকের তৃপ্তি নয়, বাস্তবিক জীবনে, এমনকি টিকে থাকার জন্যও জরুরি।

ঠিক একইরকম ব্যাপার আমরা দেখতে পাই বৃক্ষের বেলায়, প্রাণীর বেলায়। আমরা যারা বৃক্ষ বিশারদ নই, তারা শয়ে শয়ে পদের বট কিংবা তালজাতীয় গাছের পার্থক্য বুঝব না। আমাদের চোখে যেখানে সব কুকুরই শুধু কুকুর, যারা চেনে-জানে তারা ডোবারম্যান, শেফার্ড, বুলডগ, রিট্রিভিয়ার, টেরিয়ার এরকম শয়ে শয়ে প্রকার আলাদা করে চিনতে পারেন।

আদতে প্রজাতির নামকরণের যে শাখা তা আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভিত্তি। এর ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞান এগিয়ে যায়। ব্যাপারটি যে আধুনিক তাও নয়। আমরা যদি আদিম মানুষের জীবন চিন্তা করি, তবে দেখব, তাদের কাছে এ ব্যাপারটি ছিল একদমই জীবনমরণের।

কোন ফলটি সুস্বাদু, কোন ফলটি বিষাক্ত, কোনটি কোন মৌসুমে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়, এসবের ওপর ভিত্তি করে তারা খাবার সংগ্রহ করতেন। এর সঙ্গে যদি যুক্ত করি বিভিন্ন প্রাণীর নাম, কোনটি বিপজ্জনক, কোনটি শিকারযোগ্য আর জায়গার নাম সেসব জায়গায় বৈশিষ্ট্যর নাম। এ শ্রেণিবিভাগ আদিম মানুষের একদম প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা ছিল। এ জ্ঞান ছিল জীবনধারণের জন্য সবচেয়ে জরুরি। বিজ্ঞানীরা বলেন, আদিম মানুষের যে মেন্টাল ম্যাপিং, তা আধুনিক যুগের মানুষের চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। এ চর্চা তার মস্তিষ্ককে সমৃদ্ধ করেছে। মস্তিস্ক নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখান যে, বহুভাষাবিদদের বুড়ো বয়সে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। বহুভাষার চর্চা মানুষের মস্তিষ্ককে উদ্দীপ্ত ও ক্ষুরধার করে। প্রকৃতির কথা তো বলাই হলো। মানুষ তো দিনশেষে প্রকৃতিরই অংশ। আর ক্রমেই দুনিয়া দখলের নেশায় আমরা যে আমাদের জানামতে একমাত্র বাসযোগ্য দুনিয়াকে ক্রমেই ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, তা ঠেকাতে নিজেদের পরিবেশের অংশ ভাবা জরুরি। পরিবেশকে দূরের কিছু ভাবলে ধ্বংস অনিবার্য। এ কারণে প্রকৃতির উপাদানগুলোকে চিনতে হবে, জানতে হবে। ভাষার গুরুত্ব এখানে অপরিসীম। সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক সিনেমায় আমরা দেখি, প্রোটাগনিস্ট মনোমোহন মিত্র এক তর্কে উত্তেজিত হয়ে বলেন, আদিবাসীদের ভাষা আর সংস্কৃতি সুরক্ষা করা কেবল আমাদের জন্য কোনো রোমান্টিক বিষয় না। আমরা যাদের ‘অসভ্য’ বলি, তাদের ভাষায় কেবল যে প্রাচীন জ্ঞান লুকানো তাই না, এতে আছে আধুনিক বিজ্ঞানেরও সূত্র। একেকটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে আমাদের বিজ্ঞানের একটা অংশ খসে যাওয়া।

শুধু পরিবেশ নয়, এমনকি প্রযুক্তির উৎকর্ষের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষায়। কারণটা সহজেই বোঝা যায়। একেক এলাকায় প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যর কারণে একেক এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ভাষা গড়ে উঠেছে। এস্কিমোদের উদাহরণ থেকেই বলা যায়, প্রকৃতিকে ঠিকঠাকভাবে বুঝতে, ভূমির অভ্যন্তরে ও ওপরে থাকা লুকিয়ে থাকা অসীম শক্তি ব্যবহার করতে স্থানীয় ভাষা হাজারে হাজারে শব্দ তৈরি করেছে। এ ভাষাগুলোর হারিয়ে যাওয়া আমাদের ভবিষ্যতের জন্য বিপদ। মুশকিল হচ্ছে, বিশ্বায়নের দুনিয়ায় আমরা যোগাযোগের সুবিধার্থে একক ভাষার দিকে ঝুঁকে যাচ্ছি। ক্রমেই ইংরেজি হয়ে উঠছে একমাত্র ভাষা। ইংরেজি ভাষা নিয়ে লেখা পণ্ডিত ডেভিড ক্রিস্টাল নিজেও এ ব্যাপারটি মানুষের সভ্যতার জন্য বিপজ্জনক ভাবেন। আবার একই সঙ্গে তিনি দেখান নামে ইংরেজি হলেও এ ভাষাটি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কীভাবে বিবর্তিত হয়েছে। দিনশেষে যতই প্রতাপ থাক, ভাষা যদি নমনীয় না হয়, তবে তার জন্য টিকে থাকা কঠিন। এর বড় উদাহরণ লাতিন, সংস্কৃত। শুধু কি তাই, ইংরেজির নিজের যাত্রাটাই দারুণ। একসময় শাসকগোষ্ঠীর ভাষার চাপে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ভাষাই এখন পৃথিবীর লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা হয়ে উঠেছে। মেলভিন ব্র্যাগের দি অ্যাডভেঞ্চার অব ইংলিশ ডকুমেন্টারি এবং একই নামের বইটিতে এ ইতিহাসের দারুণ বিবরণ পাওয়া যায়।

একক ভাষা হয়ে ওঠার পেছনে আছে ভাষা নিয়ে রাজনীতি। ভাষাকে ব্যবহার করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাটা অনেক পুরনো। লোকরঞ্জনবাদের এ সময়ে আমরা দেখি এই চেষ্টাটা আরও বিপজ্জনক হতে। এর প্রতিরোধ নিয়ে সবচেয়ে গর্বের ব্যাপারটা তো আমাদেরই। আমরা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি। ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার যে আধিপত্যবাদ তা রুখে দিয়েছি। এ আন্দোলন ছিল আমাদের মুক্তির, নিজেদের দেশ পাওয়ার মূল ভিত্তি। ডেভিড বিভার আর জেসন স্ট্যানলির সুলিখিত বই দ্য পলিটিকস অব ল্যাঙ্গুয়েজে এ নিয়ে বিশদে জানা যায়। আর এ শতকে এসে আমরা এ আন্দোলনকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি বৈশ্বিকভাবে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ব্যাপারটা শুধুই একটি দিবস নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের জন্য জরুরি। অন্য ভাষাকে দমন করে, নির্দিষ্ট একটা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা শুধুই যে ওই ভাষাটিকে হত্যা করে, আমাদের জ্ঞানের আধার ধ্বংস করে তাই না; এর অন্য একটা ভয়াবহ দিক আছে।

ভাষাকে দমনের মাধ্যমে, ভাষাকে অবজ্ঞা করার মাধ্যমে আমরা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকেও ‘আদার’ করে রাখি। তাদের প্রকারান্তরের নিচু শ্রেণির বলে সূক্ষ্ম ও স্থূলচর্চা করি। পাকিস্তানিদের ঠিক এ উদ্দেশ্যই ছিল। শুধু তাই নয়, অন্য ভাষা না বুঝলে আমরা সেসব মানুষকেও বুঝব না। লোকরঞ্জনবাদী শাসকরা ঠিক তাই চায়। তারা চায় এক জাতি, এক বিশ্বাসের মানুষ অন্যদের ওপর আধিপত্য করুক। এ রাজনীতি ঠেকাতে আমাদের ভাষার বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে।

আমাদের ভাষা আন্দোলনের শিক্ষা হচ্ছে, আমরা অন্য ভাষার ওপর আধিপত্য করব না। আমরা দেখছি পাশের দেশে বিপজ্জনকভাবে হিন্দিকরণ করার চেষ্টা হচ্ছে। এর ঢেউ আমাদের ওপরও পড়ছে। সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যের বিপুল আগ্রাসনের এ ঢেউ ঠেকানো কঠিন। সন্দেহ নেই, লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা হয়ে ওঠা ইংরেজি আমাদের জন্য জরুরি। এমনকি হিন্দিও শিখতে হবে। ক্রমেই আবারও দুই মেরুতে বিভক্ত হওয়া দুনিয়ায় মান্দারিনের গুরুত্ব বাড়ছে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে, বৈশ্বিক ভাষা আরবিও খুব জরুরি। আমাদের কোনো ভাষার সঙ্গে সংঘাত নেই, লড়াই ভাষাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে। সংখ্যালঘুদের কোণঠাসা করার ব্যাপারে।

ঠিক একইরকমভাবে খেয়াল রাখতে হবে, বাংলার চাপে যেন আমাদের দেশে থাকা অসংখ্য ভাষা যাতে বিলীন হয়ে না যায়। ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা লাখো লাখো বছরের সভ্যতার যাত্রা শুধু নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করার জন্যও জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক