বিদেশ যেতে দিবো না দেখে অনেকদিন বাড়ীতে খাবার খায়নি মামুন; আর এখন যেতে দিয়ে আজীবনের জন্য খাবার বন্ধ হয়ে গেল আমার সন্তানের। এভাবেই বিলাপ করতে করতে কিছুক্ষণ পরপর মুর্ছা যাচ্ছেন অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার পথে মারা যাওয়া মাদারীপুরের যুবক মামুনের মা হাফিজা বেগম।
তিনি বলেন, আমরা কেউই মামুনকে ইতালি পাঠাতে চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম সে পড়াশোনা করে দেশেই একটি চাকরি করুক। কিন্তু, বন্ধু-বান্ধব ও আশপাশের বেশীর ভাগ মানুষ ইতালিতে পাড়ি জমানোর কারণে আমার ছেলেও যাওয়ার জন্য বায়না ধরে। আমাদের অমত থাকলেও তার চাপে টাকা দিতে রাজি হতে হয় আমাদের। অবৈধপথে ইতালি যেতে গিয়ে জীবনটাই শেষ করে দিলো।
তিনি আরও বলেন, ওর বাবা (মামুন) ২০ বছর যাবত গ্রীসে থাকে। তাই সে কখনো চায়নি ছেলে প্রবাসে থাকুক। নিহত মামুন শেখ (২০) মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের ইউসুফ আলী শেখের ছেলে ।
নিহত মামুন শেখের বড় ভাই সজিব শেখ বলেন, ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার সুন্দরদী গ্রামের বাদশা কাজীর ছেলে মোশারফ কাজী প্রত্যেকের কাছ থেকে ১৩-১৫ লাখ টাকা নেয়। পরে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তাদের ইতালি পাঠালে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, সরকারীভাবে তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাচ্ছি। আমার ভাইয়ের মুখটা শেষ বারের মত দেখা সুযোগ করে দেয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।
জানা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার খালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম স্বরমঙ্গল গ্রামের ইউসুফ আলী শেখের ছেলে মামুন শেখ (২০) ও সেনদিয়া গ্রামের সুনীল বৈরাগীর ছেলে সজল বৈরাগীসহ (২৫) বেশ কয়েকজন যুবক ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়। পরে গত বুধবার লিবিয়া থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় রওয়ানা দেয় তারা। ৩২ জন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন নৌকায় ৫২জন অভিবাসন প্রত্যাশীকে নিয়ে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার ভূমধ্যসাগরে নৌকার ইঞ্জিন ফেটে যায়। এতে মামুন ও সজলসহ মারা যায় ১২ জন। পরে খবর পেয়ে বেশ কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করে স্থানীয় কোস্টগার্ড। এছাড়া এখনো নিখোঁজ পাশের গোহালা ইউনিয়নের পান্নু শেখের ছেলে আপন শেখ।
অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাবার সময় মাদারীপুরের রাজৈরের দুই যুবকের মৃত্যু হয় এবং এই ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছে আরও একজন। গত শুক্রবার দুই যুবকদের মৃত্যুর খবর আসলে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। আদরের সন্তানদের হারিয়ে দিশেহারা পরিবার। আদরের সন্তান আর কোনদিন ঘরে ফিরবে না, এই শোক কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজনরা। আজাহারীতে ভারী চারপাশের পরিবেশ। এই ঘটনায় দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। পুলিশ বলছে, লিখিত অভিযোগ পেলে নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা।
রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান হাওলাদার আসাদ এ ব্যাপারে অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।