বয়স নিয়ে ঝামেলায় বাইডেন

স্মৃতিশক্তি নিয়ে সমস্যায় আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তারপরও তিনি লড়ছেন নির্বাচনে। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আছেন জটিল সমস্যায়। নিজের ছেলের মৃত্যুর সময় নাকি তিনি মনে করতে পারছেন না। এ নিয়ে প্রশ্ন করলে আবার ক্ষেপেও যাচ্ছেন। বলছেন তার স্মৃতিশক্তি ঠিক আছে। তবে কয়েকবার এ ধরনের সমস্যায় পড়েন তিনি। আসছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এ বিষয়টিও প্রভাবক ভূমিকা রাখতে পারে। এখন পর্যন্ত তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়সও কম নয়। তবে তিনি বাইডেনের চেয়ে প্রাণবন্ত। তাকে এ ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি এখনো।

যত ভুল

এ বিষয়ে দ্য আটলান্টিকে হেলেন লুইস লিখেছেন, মার্কিন  প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী একজন বহিরাগত হিসেবে আমি কয়েক মাস ধরে ভাবছিলাম, জো বাইডেনের বয়স কখন একটি সমস্যা হয়ে উঠবে। বাইডেন ইতিমধ্যে হোয়াইট হাউজ দখল করা সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি এবং আরও চার বছর সেখানে থাকতে চাইছেন। বাইডেন জর্জ ডব্লিউ বুশ বা বিল ক্লিনটনের চেয়েও বয়সে বড়, যারা অনেক আগেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে অবসরে চলে যান। তার সম্ভাব্য রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্প (৭৭) পৈশাচিক শক্তির অধিকারী, যাতে তাকে জীবন্ত দেখায়। পক্ষান্তরে বাইডেনকে দেখে মনে হয় তিনি এখনই তার মূর্তিতে পরিণত হয়েছেন।

একই সপ্তাহে পলিটিকো ডট ইইউ জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিউ ইয়র্কে একটি তহবিল সংগ্রহের বক্তৃতায় সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের সঙ্গে হেলমুট কোহলকে গুলিয়ে ফেলেন। কোহল ১৯৮২ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি মারা যান। তবে বাইডেন তার বক্তৃতায় বলেন, ২০২১ সালের জি-৭ সম্মেলনে কোহল তার সঙ্গে কথা বলেছেন। আসলে কথা বলেছিলেন মেরকেল। পলিটিকো জানায়, বাইডেন তার আগে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর স্থলে প্রয়াত ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর নাম বলেন। মিতেরাঁ ১৯৮১ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত ফ্রান্সের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি ১৯৯৬ সালে মারা যান। এ ছাড়া ২০২৩ সালের জুলাইয়ে বাইডেন বলেছিলেন যে, ১০০-এর বেশি আমেরিকান কভিড-১৯ রোগে মারা গেছেন। হোয়াইট হাউজ পরে যা সংশোধন করে দিয়েছিল ‘১ মিলিয়নেরও বেশি’। জুন মাসে তিনি ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয়ে বলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরাক যুদ্ধে হেরে যাচ্ছেন।

গাজায় সাম্প্রতিক ইসরায়েলের যুদ্ধ বিষয়ে মন্তব্য করতে বললে তিনি বলেন, আমি মনে করি আপনারা এরই মধ্যে জানেন যে, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট, সিসি, মানবিক সহায়তা প্রবেশের জন্য দ্বার খুলতে চান না। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তাকে মানিয়েছি। এখানে আসলে বাইডেন বলতে চেয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্টের কথা।

প্রতিবেদন

বিবিসি বাংলা জানায়, অতি গোপনীয় নথি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে তদন্তের মুখে পড়েন জো বাইডেন। এ সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের স্মৃতিশক্তিতে ‘উল্লেখজনক সীমাবদ্ধতা’ রয়েছে।

প্রতিবেদনের একটি অংশে স্পেশাল কাউন্সেল বাইডেনের বইয়ের ছায়ালেখক মার্ক জোনিৎজারের সঙ্গে দীর্ঘসময়ের একটি সাক্ষাৎকার তুলে ধরা হয়। যেখানে দেখা যায়, বারাক ওবামার সঙ্গে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে করতে বেগ পেতে হয় বাইডেনকে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর ছয় বছর পর তার স্মৃতিশক্তি আরও বেশি খারাপ হয়। স্পেশাল কাউন্সেলের দপ্তরে বাইডেনের সাক্ষাৎকার বিষয়ে বলা হয়, বাইডেন মনে করতে পারছিলেন না যে, তিনি কখন ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সাক্ষাৎকারের প্রথম দিন তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে, তার দায়িত্বের শেষ দিন কবে ছিল। এ ছাড়া দ্বিতীয় দিনে তিনি মনে করতে পারছিলেন না যে, তিনি কবে থেকে তার দায়িত্বে যোগ দিয়েছিলেন। অন্য আরেক জায়গায় বলা হয়, বাইডেন এমন সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মনে করতে পারছিলেন না যেগুলোর কারণে শুরুর দিকে ওবামা প্রশাসনে বিভক্তি দেখা দিয়েছিল। যেমন, তিনি ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে সেনা বৃদ্ধি নিয়ে যে বিতর্ক এবং জটিলতা দেখা দিয়েছিল, তা মনে করতে পারছিলেন না। প্রতিবেদনের অন্য জায়গায় লেখা হয়, ছেলের মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর পর তিনি মনে করতে পারছিলেন না যে, সে কবে মারা গেছে।

লুইস লেখেন, বাইডেনের সঙ্গীরা অবশ্য ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে খারিজ করবে এ প্রতিবেদন। গত বছর এক জরিপে  ৬৯ শতাংশ ডেমোক্র্যাটসহ  ৭৭ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পক্ষে খুব বেশি বয়সী। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এ আপত্তি জানান ৫১ শতাংশ। তবে এখন পর্যন্ত বাইডেনের বয়স চিন্তিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কারণ প্রেসিডেন্টের মনোনয়নের জন্য তাকে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। তার পরিবারের সদস্যরাও এ বিষয়ে তাকে বাঁচাতে সাহায্য করেনি। তার দলের ভেতরও তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পক্ষে খুব বেশি বয়সী কি না সে সম্পর্কে কথোপকথন থেমে গেছে। অবশ্য বাইডেনের বয়স নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেডিডেন্ট হ্যারিসের স্পষ্ট উত্তর, ‘আমি দেশের সেবা করতে প্রস্তুত। এই নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’ কমলা হ্যারিসও এসব তথ্য নস্যাৎ করে দিয়ে বলেছেন এ প্রতিবেদন ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’

তবে...

হেলেন লুইস লেখেন, আমি এক বছর ধরে অনেককে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘কেন বামরা বাইডেনের বয়স উপেক্ষা করছে?’ ট্রাম্পের সমর্থকরা যেমন তার বিরুদ্ধে আনা যৌন-অপরাধের অভিযোগ, অযোগ্যতা, কর্র্তৃত্ববাদ এসব বিষয়ে নীরব থাকে। এ প্রসঙ্গে তিনি একটি ঘটনার কথা জানান, ২০১৬  সালের নির্বাচনে একটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছিল হিলারি ক্লিনটন মস্তিষ্কের টিউমারে মারা যাচ্ছেন। তখন ৯/১১ নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অসুস্থ অবস্থায় হিলারি যোগ দেওয়ার পর থেকে ওই গুজবটি জোরদার হয়। আসলে তখন তার নিউমোনিয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে হিলারি প্রাণবন্ত অবস্থায় আছেন। আর এ কারণে বামপন্থি অনেকে ভাবছেন, বাইডেনকে নিয়ে তৈরি হওয়া আলাপগুলো ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি আরও লেখেন, এবারের বাইডেন ২০১৬ সালের মতো উদ্যমী না। এখন তাকে প্রায়ই অলস এবং বিভ্রান্ত দেখায়। বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে, বাইডেন তাকে ক্লান্ত না করতে প্রেস দলকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ সময় সীমিত কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। গত আগস্ট পর্যন্ত তিনি রোনাল্ড রিগানের পর সবচেয়ে কমসংখ্যক প্রেস কনফারেন্স করেছেন। ২০২০ সালে কভিড সতর্কতা তাকে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমাবেশ থেকে দূরে রাখে। তিনি বেশিরভাগ প্রচারণা চালিয়েছেন ভিডিওর মাধ্যমে।

হেলেন লুইস লেখেন, আমার সহকর্মী ম্যাককে কপিনস সম্প্রতি পরামর্শ দিয়েছেন যে, যারা রাজনীতির বিষয়ে চিন্তা করেন তাদের উচিত ট্রাম্পের সমাবেশে যাওয়া। তারা কাকে ভোট দিতে যাচ্ছে তা দেখতে। আমি পরামর্শ দেব, সবাই বাইডেনের বক্তৃতাও দেখতে যান এবং নিজেকে সততার সঙ্গে জিজ্ঞাসা করুন, আপনি যাকে দেখছেন সামনে, সে ব্যক্তি আদৌ প্রেসিডেন্ট হিসেবে আরও চার বছর দায়িত্ব পালন করতে পারবে? যদি তা মনে না হয়, তাহলে মেনে নিন আপনি কমলা হ্যারিসকে ভোট দিচ্ছেন বা হোয়াইট হাউজে রিগ্যানের মেয়াদের শেষ বছরগুলোর মতো কোনো কোনো রাজপ্রতিনিধির জন্য ভোট দিচ্ছেন।

সবশেষে তিনি লেখেন, আমি অবশ্য দুই দৃশ্যপট কল্পনায় ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফিরে আসাটাকে বেশি অস্বস্তিকর বলব। আমি বিশেষভাবে একজন ইউরোপীয় হিসেবে বলছি, যে জানে ট্রাম্প ইউক্রেনকে সমর্থন করবে না। যার ফলাফল হিসেবে আমার দেশ এবং অন্যদের ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে লড়াইয়ে নামতে হবে। কিন্তু আমি নিজের কাছে নীরবে এটাও বলব যে, যুক্তরাষ্ট্র ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের একটি দেশ। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রতিভাবান। তাহলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কীভাবে দুই বৃদ্ধের কাছে আসতে পারে, যেখানে একজন হাঙরের আক্রমণের কথা বলছে এবং অন্যজন মৃতদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে? নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরও ভালো প্রার্থী পছন্দের সময় পার হয়ে যায়নি। উল্লেখ্য, সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রমি ড্যানিয়েলে দাবি করেন, কয়েক বছর আগে তিনি ও ট্রাম্প ডিসকভারি চ্যানেলে ‘শার্ক উইক’ দেখার পর ট্রাম্প বলেন, আমি সব ধরনের দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করেছি, কিন্তু হাঙরকে সহায়তা করে এমন কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে আমি কখনোই দান করিনি। এ সময় ট্রাম্প নাকি বলে ওঠেন, আমি চাই সব হাঙর মরে যাক।

বাইডেনকে নিয়ে ওই তদন্ত প্রতিবেদনের প্রধান অবশ্য ছিলেন ট্রাম্প প্রশাসনের সময় নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা রবার্ট হার বাইডেনকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বাইডেন ন্যাশনাল আর্কাইভ এবং বিচার বিভাগের কাছে গোপনীয় নথিগুলো ফিরিয়ে দিয়েছেন। তার বাড়িসহ একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানোর বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন এবং স্বেচ্ছায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্যান্য উপায়েও তিনি তদন্তে সহযোগিতা করেছেন। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিপরীত আচরণ করেছিলেন। তিনি তার বিরুদ্ধে ফ্লোরিডার বাড়িতে বিভিন্ন ফাইল রাখার বিষয়ে তদন্ত প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করেন এবং এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন।

বিবিসি বাংলা জানায়, প্রতিবেদনে বলা হয়, আট বছর ধরে বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় নিয়মিত তার নোটবুকে গোপন বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য লিখে রাখতেন। যার মধ্যে রয়েছে প্রেসিডেন্টের দৈনিক সংবাদ সম্মেলন এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠক। পরে ওই নোটবইগুলো হোয়াইট হাউজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয় এবং এগুলো বিভিন্ন তালাহীন ড্রয়ার এবং তার ডিলাওয়ার ও ভার্জিনিয়ার বাড়ির বেজমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়।