ফেনীর ১১৩ হাসপাতাল-ক্লিনিকের ৮১টির অনুমোদন নেই

রোগী পুঁজি করে ফেনী জেলার অলিগলিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। জেলার ১১৩টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ৮১টিরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। অথচ অনুমোদনহীন এসব হাসপাতালে জটিল অস্ত্রোপচারও করা হচ্ছে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে রোগীরা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি ভুল চিকিৎসায় ঘটছে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে এসব অনুমোদনহীন হাসপাতাল চলছে বছরের পর বছর।

জেলা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্যমতে, ফেনীতে ৫১টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১১টির অনুমোদন (লাইসেন্স) রয়েছে। অন্যদিকে ৬২টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে ১৯টির লাইসেন্স আপডেট রয়েছে। ২৫টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। আবেদন করেছে আরও ২৭টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন অবৈধভাবে পরিচালিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক চলতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দেওয়ার পর তড়িঘড়ি করে হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো অনলাইনে আবেদন করে। যারা গত পাঁচ থেকে ছয় বছর লাইসেন্স নবায়ন করেনি, তারাও আবেদন করেছে। লাইসেন্স নবায়নের শর্তাবলি পরিপূর্ণ না থাকায় প্রায় ৪০টি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেনি। প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান অনলাইনে আবেদন করলেও কাগজপত্রে ত্রুটি থাকায় অর্ধেকের নবায়ন হবে না বলে সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি এমন কিছু প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে চিঠি এসেছে। কিন্তু সময় ও জনবল সংকটে শতভাগ পরিদর্শন শেষ করা যায়নি। ইতিমধ্যে নিবন্ধন ও লাইসেন্স না থাকায় ফেনীর বায়েজীদ সাইকিয়াট্রিক হাসপাতাল ও ছাগলনাইয়া চক্ষু হাসপাতাল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও নবায়ন না করেই চলছে জেলার অনেক সুপরিচিত হাসপাতাল। এরমধ্যে রয়েছে ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতাল, ফেনী হার্ট ফাউন্ডেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, ফেনী প্রাইভেট হাসপাতাল, ডক্টরস ল্যাব অ্যান্ড শাহিন ক্লিনিক, আল আহাদ চক্ষু হাসপাতাল, বায়েজিদ হেলথ কেয়ার, শতাব্দী ডায়াগনস্টিক সেন্টার, জনতা ক্লিনিক, সোনালী ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মেডিনোভা ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ উপজেলা শহরের কয়েকটি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালের সামনে ও আশপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বেতনভুক্ত দালালরা সরকারি হাসপাতালের রোগীদের ভুলভাল বুঝিয়ে এবং শহর ও গ্রামের ওষুধের দোকানদারসহ পল্লী চিকিৎসকদের কমিশন দিয়ে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে তাদের প্রতিষ্ঠানে। সহজ সরল রোগীরা দালালদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সহায় সম্বল বিক্রি করেও সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কিছু কিছু হাসপাতাল ও ক্লিনিকে অপ্রশিক্ষিত নার্স কিংবা আয়া দিয়েই দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে অপ্রশিক্ষিত ইন্টার্নি চিকিৎসক দিয়েও করা হচ্ছে বড় ধরনের চিকিৎসা। ফলে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। অনেক প্রতিষ্ঠানের তথ্যও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিংবা সিভিল সার্জন অফিসে। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতাল-ক্লিনিক করার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি ও জনবল থাকতে হয়, তার কিছুই নেই এসব অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিকে। চিকিৎসক-নার্স-টেকনোলজিস্ট তো দূরের কথা, ভুয়া ডিগ্রির লোকজন দিয়ে অবাধে চলছে প্রশাসনের নাকের ডগায়।

ফেনীর টাংক রোডের বায়েজিদ হেলথ কেয়ারের মালিক ডা. তাবারক উল্লা বায়েজিদ বলেন, ‘আমরা প্রতিবছরই ডিজি অফিসে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। সিভিল সার্জন অফিস থেকে পরিদর্শন করা হলেও আর লাইসেন্স হাতে আসে না।’

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘হাসপাতাল-ক্লিনিক মালিক আবেদন করলেই হবে না, নবায়নের শর্তাবলি ঠিক থাকলে, কাগজপত্র ত্রুটি না থাকলে ছাড়পত্র পাওয়া যাবে। যে সমস্ত হাসপাতাল ক্লিনিকের ছাড়পত্র নবায়ন নেই, সেগুলোকে আমরা নোটিস করেছি।’